Guru Purnima 2026
Bengal Liberty
গুরু পূর্ণিমা হলো আধ্যাত্মিক ও পাণ্ডিত্যের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের শুভ মুহূর্ত (Guru Purnima)। গুরু বা শিক্ষকদের সম্মানার্থে উদযাপিত একটি উৎসব। সংস্কৃত শব্দ ‘গু’-এর অর্থ অন্ধকার বা অজ্ঞতা এবং ‘রু’-এর অর্থ তা দূরকারী । অর্থাৎ, গুরু হলেন সেই ব্যক্তি যিনি আমাদের জীবনের অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে আলোর পথ দেখান। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত পূর্ণিমা হল গুরু পূর্ণিমা। ইতিহাস ঘাঁটলে এই দিনের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। ভারত, ভুটান এবং নেপালের মানুষ গুরু পূর্ণিমা উদযাপন করেন। মূলত হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্মে এই পূর্ণিমার গুরুত্ব অপরিসীম।

গুরু পূর্ণিমার অপর নাম ব্যাস পূর্ণিমা।কারণ এই দিনেই মহর্ষি বেদব্যাসের জন্ম হয়েছিল। কর্মযোগ অনুসারে, গুরু পূর্ণিমা হলো আমাদের গুরুদের পূজা করার দিন। পুরাণ মতে, ভগবান শিব প্রথম গুরু হয়েছিলেন এই দিনে এবং তাঁর জ্ঞান সাতজন ঋষি বা সপ্তর্ষিদের প্রদান করেছিলেন।

গুরু পূর্ণিমার ইতিহাস Guru Purnima
যোগশাস্ত্রের প্রাচীন ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই দিনেই ভগবান শিব প্রথম গুরু (আদি গুরু) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে এক যোগী হিমালয়ে এসে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন হন। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার কথা শুনে বহু মানুষ তাঁকে দেখতে আসতেন। একসময় তিনি চোখ খুললে সাতজন ব্যক্তি তাঁর কাছে অনুরোধ করেন, তিনি যেন তাঁদের সেই আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার পথ শেখান। কিন্তু যোগী কোনও উত্তর না দিয়ে আবার ধ্যানে বসে পড়েন।
প্রায় ৮৪ বছর পর তিনি পুনরায় চোখ খুলে দেখেন, সেই সাতজন শিষ্য এখনও ধৈর্য ধরে তাঁর অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁদের আন্তরিকতা ও জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করে এক পূর্ণিমার দিনে তিনি তাঁদের শিক্ষা দিতে সম্মত হন। সেই দিনই তিনি বিশ্বের প্রথম গুরু বা আদি গুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তিনি এই সাত শিষ্যকে যোগবিদ্যার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে অবগত করেন। পরবর্তীকালে এই সাতজনই সপ্তর্ষি নামে পরিচিত হন এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে যোগের সাতটি ভিন্ন দিক মানুষের মধ্যে প্রচার করেন। ভগবান শিবের এই আদি গুরু হিসেবে আত্মপ্রকাশের স্মরণেই প্রতি বছর গুরু পূর্ণিমা পালিত হয়।

প্রচলিত কাহিনী
হস্তীমুণ্ড হিন্দু দেবতা প্রচলিত কাহিনী অনুসারে, গণেশ ছিলেন ব্যাসদেবের মহাকাব্য মহাভারতের লিপিকার এবং গুরু পূর্ণিমায় তাঁকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দেবতা হিসেবেও পূজা করা হয়। ব্যাসদেব যিনি মহাভারত সংস্কৃতে রচনা করেছিলেন। ব্যাসদেবের প্রকৃত নাম কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন এবং তিনি ছিলেন তপস্বী পরাশর ও রাজকুমারী সত্যবতীর পুত্র । হিন্দু ঐতিহ্য অনুসারে, ঋষিদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠার সময় তিনি বৈদিক জ্ঞান অর্জন করেন এবং তারপর বেদ সংকলন করেন। লোককথা অনুযায়ী, তিনি সুমন্তু, বৈশম্পায়ন, জৈমিনি, পৈল প্রমুখ শিষ্যদের শিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর সম্মানার্থে তাঁর জন্মদিনকে প্রায়শই ব্যাস পূর্ণিমা বলা হয়।

বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্ম অনুযায়ী গুরুপূর্ণিমার মাহাত্ম্য

বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা গৌতম বুদ্ধকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ অনুসারীরা বিশ্বাস করেন যে, এই দিনে ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা বুদ্ধ জ্ঞানলাভের পর তাঁর শিষ্যদের প্রথম উপদেশ দিয়েছিলেন। তিনি বারাণসীর নিকটবর্তী সারনাথে (বর্তমান উত্তর প্রদেশ রাজ্যে) তাঁর পাঁচজন শিষ্যকে উপদেশ প্রদান করেন, যাঁরা তপস্যা করতেন। বৌদ্ধদের মধ্যে এটি ধর্মচক্র প্রবর্তন দিবস হিসেবে পালিত হয়। এই দিনে বৌদ্ধরা বুদ্ধের প্রজ্ঞাকে সম্মান জানান, তাঁর শিক্ষাসমূহ পুনরায় পর্যালোচনা করেন এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের জন্য তাঁর দেখানো পথে চলার প্রতি নিজেদের নিষ্ঠা নবায়ন করেন।
জৈনধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন যে এই দিনে মহাবীর গৌতম স্বামীকে তাঁর প্রথম শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন । এই ঘটনাটি জৈন ঐতিহ্যে গুরু-শিষ্য সম্পর্কের সূচনা করে, যা আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও নির্দেশনার আদান-প্রদানের প্রতীক।
গুরুপূর্ণিমা পালন
হিন্দু মতে সবাই তার আরাধ্য গুরুর উপাসনা করেন। শাস্ত্র অনুযায়ী, দেবতাগণ তাদের গুরু বৃহস্পতির থেকে দীক্ষা লাভ করেছিলেন আজ। তাই হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী, পিতা মাতা এবং শিক্ষক সকলেই আরাধ্য গুরু। তাদের প্রতি সন্মান, তাদের দেখানো পথের মূল্যবোধ এবং কৃতজ্ঞতা স্বরূপ পালিত হয় গুরু পূর্ণিমা।
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে কিছু মানুষ ধ্যান, উপবাস এবং দানের মাধ্যমে দিনটি পালন করেন। অনেকে এই দিনে তাদের আধ্যাত্মিক শিক্ষা শুরু করেন, এই ধাপটিকে বলা হয় দীক্ষা । অন্যান্য পূর্ণিমার দিনের মতোই, বৌদ্ধরা উপোসথা নামক একটি অনুশীলনের মাধ্যমে বুদ্ধের আটটি মূল শিক্ষা এবং সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। এই দিনটি গুরু- শিষ্য , অর্থাৎ শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ককে সম্মান জানায়। তবে, নেপালে শিক্ষাবিদদের ভূমিকাকে গুরুর স্থানে স্বীকৃতি ও সম্মান জানিয়ে স্কুল ও কলেজে এই দিনটি শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়।

