Kishore Kumar
Bengal Liberty
“মুসাফির হুঁ ইয়ারোঁ, না ঘর হ্যায় না ঠিকানা, মুঝে চলতে(Kishore Kumar) জানা হ্যায়, বাস চলতে জানা…”— রেডিও কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় যখনই এই অমর গানটি বেজে উঠেছে, তখনই কোটি কোটি শ্রোতা তাঁদের সমস্ত কাজ ফেলে মুগ্ধ হয়ে শুনেছেন। এই গানের সঙ্গে অনেকে নিজেদের জীবনের সংগ্রামকে মিলিয়ে দেখেছেন। আনন্দ বক্সীর লেখা এবং রাহুল দেব বর্মনের সুরে এই কালজয়ী গানকে অমর করে তুলেছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও অভিনেতা আভাস কুমার গাঙ্গুলি, যিনি সবার কাছে কিশোর কুমার নামেই পরিচিত।

যুগ বদলালেও কিশোরের গান আজও অমর(Kishore Kumar)
ষাট, সত্তর এবং আশির দশক—টানা তিন দশক নিজের সুরের জাদুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র ও সঙ্গীতজগতে এক অনন্য স্থান তৈরি করেছিলেন কিশোর কুমার।রাজেশ খান্না, অমিতাভ বচ্চন, ধর্মেন্দ্র, দেব আনন্দ, ঋষি কাপুর, সঞ্জীব কুমার থেকে শুরু করে মিঠুন চক্রবর্তী, অনিল কাপুর, সঞ্জয় দত্ত, কিরণ কুমার—প্রায় সব প্রজন্মের নায়কদের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।অগণিত কালজয়ী গান, পাশাপাশি অভিনয় ‘ঝুমরু’ থেকে ‘শরাবি’, আবার অসংখ্য স্মরণীয়

চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান ভারতীয় সিনেমাকে সমৃদ্ধ করেছে। শুধু গান নয়, তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি যেন এক একটি ইতিহাসের সাক্ষী।কিন্তু জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই শিল্পীকেই একসময় নিষিদ্ধ করেছিল তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। শাসকের নির্দেশ মানতে অস্বীকার করার মূল্য তাঁকে বড়সড়ভাবেই চুকাতে হয়েছিল। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা যাক সেই বিতর্কিত অধ্যায়।
ইন্দিরা ও সঞ্জয় গান্ধীর সময়ের জরুরি অবস্থা(Kishore Kumar)
কিশোর কুমারকে নিষিদ্ধ করার ঘটনাটি বুঝতে হলে আগে জানতে হবে ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপট। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত টানা ২১ মাস ভারতে জরুরি অবস্থা জারি ছিল। এই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নাগরিক স্বাধীনতার ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেন। সংবাদপত্রের ওপর সেন্সরশিপ চালু হয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালিত হয়।
আদালতের রায়(Kishore Kumar)
১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্ট নির্বাচনী অসদাচরণের অভিযোগে ইন্দিরা গান্ধীকে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত তাঁর নির্বাচন বাতিল করে এবং ছয় বছরের জন্য নির্বাচনে লড়ার অযোগ্য ঘোষণা করে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা(Kishore Kumar)
এরপর জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে দেশজুড়ে গণআন্দোলন শুরু হয়। অটল বিহারি বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আডবাণী, জ্যোতি বসুসহ বহু বিরোধী নেতা ইন্দিরা গান্ধীর পদত্যাগের দাবি জানান।
সেই বিতর্কিত ঘোষণা(Kishore Kumar)
১৯৭৫ সালের ২৫ জুন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ সংবিধানের ৩৫২ অনুচ্ছেদের অধীনে ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগ’-এর কারণ দেখিয়ে দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। জরুরি অবস্থার সময় এক লক্ষেরও বেশি রাজনৈতিক নেতা, আন্দোলনকারী এবং সাংবাদিককে বিনা বিচারে গ্রেফতার করা হয়। সংবাদপত্রের ওপর কঠোর প্রাক-সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়, যার ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে সঞ্জয় গান্ধীর নেতৃত্বে দিল্লিতে জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ কর্মসূচি এবং বস্তি উচ্ছেদ অভিযান নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
জরুরি অবস্থার সমাপ্তি(Kishore Kumar)
১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে ইন্দিরা গান্ধী হঠাৎ সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন এবং রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দেন। ততদিনে দেশজুড়ে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে প্রবল জনরোষ তৈরি হয়েছিল।নির্বাচনে পরাজয়ের আশঙ্কার মধ্যেই সঞ্জয় গান্ধীর উদ্যোগে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, দেশের জনপ্রিয় শিল্পী, অভিনেতা ও গায়কদের উপস্থিতির মাধ্যমে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা।

যেকোনো মুহূর্তে নির্বাচন ঘোষণা হলেই চোখের সামনে পরাজয় দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল। আর ঠিক তখনই সঞ্জয় গান্ধীর পরামর্শে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে দেশজুড়ে নামিদামি অভিনেতা, অভিনেত্রী, গায়ক-গায়িকারা অংশ নেবেন এবং ইন্দিরা গান্ধী কত বড় নেত্রী, তা প্রচার করার জন্যই উঠেপড়ে লেগেছিল মা-ছেলের যৌথ সরকার।
কিশোর কুমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা(Kishore Kumar)
সেই সময় সঞ্জয় গান্ধী কিশোর কুমারকে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানান। কিন্তু কিশোর কুমার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এরপরই তাঁর গান অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, যে সব চলচ্চিত্রে তাঁর গান ছিল, সেগুলির প্রচারও বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়। অল ইন্ডিয়া রেডিওর পাশাপাশি দূরদর্শনেও তাঁর গান এবং তাঁর অংশগ্রহণে নির্মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার কার্যত বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তারপর ইন্দিরা সরকারের পতন(Kishore Kumar)
১৯৭৭ সালের নির্বাচনে জনগণ ভোটের মাধ্যমে ইন্দিরা গান্ধী এবং কংগ্রেসকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। জয়প্রকাশ নারায়ণের সমর্থনে গঠিত জনতা পার্টি সরকার ক্ষমতায় আসে এবং মোরারজি দেশাই প্রধানমন্ত্রী হন।সরকার পরিবর্তনের পর কিশোর কুমারের ওপর জারি হওয়া নিষেধাজ্ঞাকে অগণতান্ত্রিক বলে সমালোচনা করা হয়। পরে আবার অল ইন্ডিয়া রেডিও ও দূরদর্শনে তাঁর গান সম্প্রচার শুরু হয়। আজও কয়েক দশক পর কিশোর কুমারের কণ্ঠ একইভাবে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে আছে। তাঁর গান ছিল, আছে এবং আগামী প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে অমর হয়ে থাকবে।


