Netaji Subhash Chandra Bose
Bengal Liberty, সৈকত নিয়োগী : শুধু তাঁদের জন্য, যাঁরা এখনও না জেনে, না বুঝে সংশয় প্রকাশ করছেন-সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের ভারতে অবস্থান নিয়ে! নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান ভারতীয় ইতিহাসের অন্যতম বড় রহস্য (Netaji Subhash Chandra Bose)। এই রহস্যকে ঘিরে সংশয় থাকবে, প্রশ্ন থাকবে, মতপার্থক্যও থাকবে-এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না করেই শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করা কি ইতিহাসচর্চার পথ হতে পারে (Netaji Subhash Chandra Bose)?
নেতাজিকে কাছ থেকে যাঁরা দেখেছেন, তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁদের কাছে ‘নেতা’ শব্দটির অর্থ ছিল অন্যরকম। তাঁদের কাছে সুভাষচন্দ্র শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক নেতৃত্ব, যার সিদ্ধান্তের প্রতি ছিল গভীর আস্থা।

এই প্রসঙ্গে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি বক্তব্য রেখেছিলেন ডাক্তার পবিত্র মোহন রায় (Netaji Subhash Chandra Bose)
আজাদ হিন্দ সরকারের সঙ্গে যুক্ত এই মানুষটি ছিলেন নেতাজির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকর্মী এবং আজাদ হিন্দ সিক্রেট সার্ভিসের ফিল্ড এজেন্ট। নেতাজির সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ও কাজের অভিজ্ঞতা ছিল। সেই পবিত্র মোহন রায় ১৯৮০ সালের ১১ অক্টোবর বিক্ষুব্ধ কিছু অনুগামীর উদ্দেশে বলেছিলেন—

«“লিডার তো আমি নই, আমরা কেহ নই। সুতরাং লিডারই ঠিক করবেন। আমরা নিজ নিজ ইচ্ছামত লিডারের কার্যের হয় সমালোচনা করি অথবা খুশিমতো কাজ করি—কাজেই এইসব কথা, তাদের মুখেই শোভা পায়। হয় লিডারকে জানুন নতুবা নিজেরাই লিডারি করুন।”»
কথাগুলি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। কিন্তু নেতাজির সঙ্গে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের মানসিকতা বোঝার জন্য এই কয়েকটি বাক্যই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
আরও আশ্চর্যের বিষয়, নিজের লেখা একটি নোটে ডাক্তার পবিত্র মোহন রায় এই বক্তব্যের কথা সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে জানিয়েছিলেন—এমন দাবি রয়েছে।

এখানেই প্রশ্নটা আরও গভীর হয়ে যায় (Netaji Subhash Chandra Bose)
যদি সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের অস্তিত্বই তাঁর কাছে নিছক কল্পনা হয়ে থাকে, তাহলে কেন তিনি তাঁকে উদ্দেশ করে নিজের বক্তব্যের কথা লিখবেন? কেনই বা ‘লিডার’ প্রসঙ্গে তাঁর সেই পুরনো অবস্থানকে এভাবে তুলে ধরবেন?
অবশ্যই এই একটি নোটকে চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যায় না। ইতিহাসে কোনো একটি নথি বা বক্তব্যের উপর দাঁড়িয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে এটিকেও উপেক্ষা করা যায় না। কারণ ইতিহাসের রহস্য অনেক সময় একক কোনো প্রমাণে নয়, বরং একাধিক ছোট ছোট সূত্রের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে লুকিয়ে থাকে।

পবিত্র মোহন রায়ের অবস্থানটিও এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
তিনি আজাদ হিন্দের রণাঙ্গনে নেতাজির সঙ্গে ছিলেন। পরবর্তী সময়েও তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারাননি। সময় বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে, ভারত কমনওয়েলথের অংশ হয়েছে—কিন্তু তাঁর কাছে ‘লিডার’ বদলে যায়নি।
আজাদ হিন্দের রণাঙ্গনেই হোক, অথবা স্বাধীন ভারতের মাটিতে—পবিত্র মোহন রায়ের কাছে লিডার ছিলেন লিডারই | তাই সংশয় থাকুক। প্রশ্ন থাকুক।
নেতাজি সত্যিই সন্ন্যাসীর বেশে ভারতে ছিলেন কি না—তা নিয়েও বিতর্ক চলুক।
কিন্তু সেই বিতর্ক যেন হয় তথ্যের ভিত্তিতে, নথির ভিত্তিতে, যুক্তির ভিত্তিতে।

অন্ধ বিশ্বাস যেমন ইতিহাসের পক্ষে বিপজ্জনক, তেমনই অন্ধ বিরোধিতাও।
কারণ কোনো একজন মানুষকে অস্বীকার করার আগে তাঁকে জানার চেষ্টা করতে হয়। তাঁর সময়কে বুঝতে হয়। তাঁর সহযোদ্ধাদের বক্তব্য পড়তে হয়। তাঁর রেখে যাওয়া নথিগুলিকে দেখতে হয়।
ডাক্তার পবিত্র মোহন রায়ের কথাটি তাই আজও যেন প্রাসঙ্গিক—
“হয় লিডারকে জানুন, নতুবা নিজেরাই লিডারি করুন।”
সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের প্রসঙ্গে হয়তো এটাই আজ সবচেয়ে জরুরি কথা। সংশয় অবশ্যই থাকুক। কিন্তু অন্ধ বিরোধিতা নয়।
ইতিহাসের দরজা প্রশ্নের জন্য খোলা থাকে।
আরও পড়ুন :
Netaji Subhash Chandra Bose : সুভাষচন্দ্র : ‘যুদ্ধাপরাধী’ বিতর্ক

