Modi rally
Bengal Liberty Desk, Kolkata:
ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের জগদ্দল এলাকায় ভোটের দ্বিতীয় দফার আগে রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে পৌঁছেছে। বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে সংঘর্ষ, গুলি-বোমা চালানোর অভিযোগ এবং গ্রেফতার—সব মিলিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গোটা এলাকা Modi rally। এই অশান্তির আবহেই নির্বাচনী প্রচারে ব্যারাকপুরে পৌঁছালেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিশাল জনসমাবেশে তিনি তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করে বিজেপিকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

ব্যারাকপুরে ‘আজাদি’র ডাক প্রধানমন্ত্রীর Modi rally
উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই ব্যারাকপুরে নির্বাচনী জনসভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সভামঞ্চ থেকে তিনি বাংলার মানুষের উদ্দেশে ‘আজাদি’র ডাক দেন। তাঁর কথায়, এই ভোটে বিজেপিকে বেছে নেওয়ার অর্থ হবে ভয়, দাঙ্গা ও অশান্তির রাজনীতি থেকে মুক্তি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বেকারত্ব থেকেও মুক্তির পথ খুলবে বিজেপিকে ক্ষমতায় আনলে। বক্তৃতায় তিনি স্মরণ করেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে যে স্বপ্ন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় দেখেছিলেন, তা এখনও পূরণ হয়নি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগোনো হবে।

প্রধানমন্ত্রীর মুখে ‘পাল্টানো দরকার’ স্লোগান
সভায় উপস্থিত বিপুল জনসমাগম দেখে প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, গোটা বাংলায় এখন একটাই স্লোগান শোনা যাচ্ছে—“পাল্টানো দরকার, চাই বিজেপি সরকার।” তিনি বলেন, ২৯ এপ্রিলের ভোট শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্য নয়, পূর্ব ভারতের ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে গোটা পূর্ব ভারতের ভাগ্য বদলাতে পারে। একই সঙ্গে ইতিহাস টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “১৮৫৭ সালে এই ব্যারাকপুরে স্বাধীনতার প্রথম লড়াইকে শক্তি জুগিয়েছিল। আজ এই ভূমি বাংলায় পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত করছে।” এদিন ব্যারাকপুর থেকেই পরিবর্তনের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “যে ব্যারাকপুরে আগে বাইরে থেকে লোক আসতেন, কাজের জন্য, আজ সেখান থেকে লোক পালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে কারখানার শব্দ আসত এক সময়, আজ গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। অকল্যান্ড পাটকলে কী হল, সবাই দেখেছেন। আজ ব্যারাকপুরের দুর্ভাগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাট, কাপড়কল বন্ধ হয়েছে। ব্যারাকপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেল্টে গত কয়েক মাসে এক ডজন পাটকল বন্ধ হয়েছে।”
তৃণমূলের বিরুদ্ধে তোপ প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী সরাসরি আক্রমণ করেন তৃণমূল কংগ্রেসকে। তৃনমূল কংগ্রেসকে কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এবার ভোটে একবারও মা-মাটি-মানুষের কথা বলেনি তৃণমূল। যে স্লোগান নিয়ে সরকার গড়েছিল, আজ তাই ভুলে গিয়েছে তৃণমূল। ১৫ বছরের উন্নয়নের কোনও রিপোর্ট কার্ড দেখাতে পারেনি। বাংলার মন যা বুঝছি, এ বার পদ্মফুলই ফুটবে। এখানে একটাই ফুল রয়েছে, সেটা পদ্মফুল।” জনসভা থেকে মোদি প্রতিশ্রুতি দেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হবে। সরকারি চাকরির পরীক্ষা নিয়মিত ব্যবধানে নেওয়া হবে এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন। তিনি সভা থেকে তৃণমূলকে হারানোর ডাকও দেন। তিনি বলেন, “আপনাদের রোজগার বন্ধ হচ্ছে। গুন্ডাদের রোজগারের জায়গা, বোমার কারখানা ফুলেফেঁপে উঠছে। তৃণমূলের সিন্ডিকেটের দোকান বাড়ছে। এটাই ওদের জঙ্গলরাজ। নিজের বাড়ি, দোকান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে ওদের সিন্ডিকেটকে জিজ্ঞেস করতে হয়। তৃণমূলের সিন্ডিকেটকে ভাগাতে হবে, ওদের হারাতে হবে। তৃণমূলকে সরাবেন তো? আজ ভারতের জন্য গোটা দুনিয়া উৎসাহিত।”
প্রধানমন্ত্রীর মুখে ঈশ্বররূপী জনতার প্রেম
জগদ্দলের সভায় প্রধানমন্ত্রীর মুখে শোনা গেল ঈশ্বররূপী জনতার প্রেমের কথা। তিনি বললেন, ‘মা কালীর ভক্তদের মাঝে গিয়েছি। তাঁরা ভালবাসেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে অযোধ্যায় রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়, তার আগে ১১ দিন বিভিন্ন পুজো, আচার করেছি। দক্ষিণ ভারতের মন্দিরে গিয়েছি। এই ভোটেও তা-ই হচ্ছে। এর নেপথ্যে রয়েছে বাংলার জন্য আমার ভালবাসা। আমার আধ্যাত্মিক মননের কেন্দ্র হল বাংলা। ঈশ্বররূপী জনতার প্রেম ছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলার রোড শো, সভায় আমাকে আপন করে নেওয়ার বার্তা পেয়েছি। ছবি পেয়েছি। যত রাত হোক, রাতে গিয়ে সেই ছবি দেখি। ছবির পিছনে ছোট শিল্পীদের ভাব বোঝার চেষ্টা করি। চিঠি পড়ি। কোথাও কষ্ট দেখতে পাই, কোথাও আশা। আমি জবাব দিই। বাংলার জনতা জনার্দনের এই অসীম প্রেম আমার সৌভাগ্য। সকলের চোখে স্নেহ দেখি। এটাই আমার জীবনের পুঁজি। ওঁরা আমায় দেখে কেঁদে ফেললে ভাবনা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।’
প্রধানমন্ত্রীর মুখে অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ
ফের অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গের কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর কথায়, ‘বাংলার সেবা করা, সুরক্ষিত করা, বড় চ্যালেঞ্জ থেকে তাকে রক্ষা করা আমার ভাগ্যে লেখা রয়েছে। আমার দায়িত্বও। এই দায়িত্ব থেকে পিছু হঠব না। যখন ভারত সমৃদ্ধ ছিল অতীতে, তখন তিনটি মজবুত স্তম্ভ ছিল- অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ অর্থাৎ বিহার, বাংলা, ওড়িশা। আজ বিকশিত ভারতে এই তিন স্তম্ভ জরুরি। ভারতের ভাগ্যোদয় এবং পূর্বোদয় পরস্পরের পরিপূরক।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভারতের প্রগতি, সংস্কৃতি, স্বাধীনতায় বাংলার সন্তানদের অগ্রণী ভূমিকা ছিল। বন্দে মাতরমের দেড়শো বছর পূর্তিতে বাংলাও ঐতিহাসিক পরিবর্তন করতে চলেছে। বন্দে মাতরম দাসত্ব থেকে মুক্তির মন্ত্র ছিল। এবার বাংলার নব নির্মাণের মন্ত্র তৈরি করতে হবে। সুজলং, সুফলংকে নীতি করব, শস্য শ্যামলংকে রোজগারের পথ করব। মলয়জ শীতলংকে সুখ সমৃদ্ধির পথ করব। দুর্গার শক্তিকে সুরক্ষার গ্যারান্টি করব।’
মতুয়া, নমশূদ্রদের নাগরিকত্ব মিলবেই- প্রধানমন্ত্রী
এদিনের সভায় নাগরিকত্ব নিয়ে বড় বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর প্রতিশ্রুতি, ‘বিজেপি জমানায় কোনও ভারতীয় নাগরিক, যে ধর্মেরই হোন, তাঁদের সমস্যা হবে না। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের ছাড়া হবে না। মতুয়া, নমশূদ্রদের নাগরিকত্ব মিলবেই। সব কাগজ, অধিকার পাবেন, যা ভারতীয় নাগরিকেরা পান। এটা মোদীর গ্যারান্টি। নেতাজি বলেন, রক্ত দাও, স্বাধীনতা দেব। আপনারা ৭০ বছর কংগ্রেস, বাম, তৃণমূলকে দিয়েছেন। একটা সুযোেগ বিজেপি-কে দিন, মোদীকে দিন।
৪ মে শপথগ্রহণে আসতেই হবে- প্রধানমন্ত্রী
সভায় বিপুল জনসমর্থন দেখে আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সকাল সকাল আমাকে আশীর্বাদ দিতে এসেছেন বহু মানুষ। হেলিপ্যাড থেকে যখন আসছিলাম, রাস্তার দুই পাশে মানুষের উৎসাহ দেখে আমি অভিভূত। কল্পনা করতে পারিনি। এই ভোটে আমার এটা শেষ সভা। বাংলায় যেখানে যেখানে গিয়েছি, মানুষের যা মেজাজ দেখেছি, এই বিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছি যে, ৪ মের পরে বিজেপির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আসতেই হবে।” তাঁর এই মন্তব্যে উপস্থিত সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা যায়। এদিনের জনসভায় গতকালের হরিপালের জনসভায় ব্যারিকেড টপকে প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করেন এক মহিলা বিজেপি কর্মী। নিরাপত্তারক্ষীরা ওই মহিলা কর্মীকে সভাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। জগদ্দলের সভায় গতকালকের ঘটনার কথা স্মরণ করে বলেন, “কাল সভায় এক ছোট বোন রেলিং ভেঙে সামনে আসার চেষ্টা করেন। রক্ষীদের সঙ্গে বচসা হয়। তিনি না খেয়ে সকালে চলে আসেন সভাস্থলে। বাচ্চাদের বলেছিলেন, আমার সঙ্গে দেখা করে যাবেন। আমি ক্ষমাপ্রার্থী, ওই বোনের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। তাঁর বিশ্বাসকে সম্মান জানাই। কখনও না কখনও দেখা হবে। তাঁর আশীর্বাদ, আপনাদের আশীর্বাদ আমার উপর বর্ষিত হবে সব সময়।”
জগদ্দলে সংঘর্ষ, গ্রেফতার ৪
উল্লেখ্য, গতকাল প্রধানমন্ত্রী সভাকে কেন্দ্র করে জগদ্দল এলাকায় বিজেপি ও তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গুলি ও বোমা চালানোর অভিযোগ তোলে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। ঘটনার জেরে ভাটপাড়া পুরসভার এক তৃণমূল কাউন্সিলর-সহ মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
সব মিলিয়ে, ভোটের আগে জগদ্দল ও ব্যারাকপুরে রাজনৈতিক উত্তেজনা যেমন তুঙ্গে, তেমনই প্রচারের ময়দানেও তীব্র হয়ে উঠছে শাসক ও বিরোধী শিবিরের লড়াই। আগামী দফার ভোটের আগে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।
