Vote counting
Bengal Liberty, ৩ মে :
আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। তারপরেই শুরু হতে চলেছে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব—ভোটগণনা (Vote Counting)। সোমবার সকাল ৮টা থেকে রাজ্যের বিভিন্ন গণনা কেন্দ্রে একযোগে খুলবে ইভিএম ও স্ট্রং রুমের সিল। দীর্ঘ প্রচারপর্ব, রাজনৈতিক সংঘাত, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং টানটান উত্তেজনার পর শেষ পর্যন্ত বাংলার মসনদে কে বসবেন, তার উত্তর মিলবে এদিনই। গোটা রাজ্য তো বটেই, দেশের রাজনৈতিক মহলের নজরও এখন পশ্চিমবঙ্গের দিকে। টানা তিন বারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি ফের নবান্নের ১৪ তলায় নিজের আসন ধরে রাখতে পারবেন? না কি সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসবেন শুভেন্দু অধিকারী? সেই উত্তর আপাতত বন্দি ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট ও পোস্টাল ব্যালটের বাক্সে (Vote Counting)।

নজিরবিহীন কড়া পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের (Vote Counting)
এই পরিস্থিতিতে গণনা ঘিরে নজিরবিহীন কড়াকড়ি করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, গণনার প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একাধিক নতুন নিয়ম চালু করা হয়েছে। রাজ্যের প্রতিটি গণনা কেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে বলবৎ থাকবে ভারতীয় ন্যায়সংহিতার ১৬৩ ধারা, যা আগে ১৪৪ ধারা নামে পরিচিত ছিল। ফলে ওই এলাকায় জমায়েত, বিক্ষোভ বা অযাচিত ভিড় কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।
ত্রিস্তরীয় বলয় (Vote Counting)
নিরাপত্তার জন্য তৈরি করা হয়েছে তিন স্তরের বলয়। প্রথম স্তরে থাকবেন কলকাতা পুলিশের লাঠিধারী বাহিনী ও সার্জেন্টরা। দ্বিতীয় স্তরে থাকবে কলকাতা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ মোতায়েন। তৃতীয় এবং সবচেয়ে সুরক্ষিত বলয়ে থাকবেন শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানেরা। এই তিনটি স্তর পার করেই গণনা কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে।
যাঁদের প্রবেশের অনুমতি রয়েছে- গণনাকর্মী, সরকারি কর্মী, প্রার্থী বা কাউন্টিং এজেন্ট—সকলকেই সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের মধ্যে কেন্দ্রে ঢুকতে হবে। তার পরে আর কাউকে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না। ভিতরে মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনকি সিগারেট লাইটারও নিয়ে যাওয়া যাবে না। কেবলমাত্র একটি সাদা কাগজ ও একটি কলম সঙ্গে রাখা যাবে।

প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা পদক্ষেপ (Vote Counting)
কাউন্টিং এজেন্ট :
রাজনৈতিক দলের কাউন্টিং এজেন্টদের ক্ষেত্রেও এবার নতুন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তাঁদের পরিচয়পত্রে প্রথম বার যুক্ত করা হয়েছে QR কোড। প্রবেশের আগে সেই কোড স্ক্যান করে সমস্ত তথ্য যাচাই করবেন কমিশনের আধিকারিকেরা। সব কিছু মিলে গেলেই মিলবে ভিতরে ঢোকার অনুমতি।
সংবাদমাধ্যম :
সংবাদমাধ্যমের জন্যও রাখা হয়েছে আলাদা জায়গা। দ্বিতীয় নিরাপত্তা স্তরের পরে নির্দিষ্ট এলাকায় বসার ব্যবস্থা থাকবে সাংবাদিকদের। সেখান থেকেই তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের কর্মীরা প্রতি মুহূর্তে আপডেট দেবেন। নির্দিষ্ট সময়ে সীমিত সংখ্যক সাংবাদিককে গণনা কেন্দ্রের নির্দিষ্ট অংশে নিয়ে গিয়ে ছবি তোলার অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
প্রার্থী বা তাঁর অনুমোদিত এজেন্ট :
সকালেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থী বা তাঁর অনুমোদিত এজেন্টদের উপস্থিতিতে স্ট্রং রুমের সিল খোলা হবে। সেখানে থাকবেন রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং অবজারভার, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা। স্ট্রং রুম খোলার পর প্রথমে বার করা হবে পোস্টাল ব্যালট। সেগুলির গণনা চলবে আলাদা কক্ষে। সকাল ৮ টা ৩০ মিনিট থেকে একে একে ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিট এনে গণনা টেবিলে রাখা হবে।
প্রতিটি গণনা টেবিলের চারপাশে থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। ভিতরে থাকবেন গণনাকর্মীরা, বাইরে বসবেন রাজনৈতিক দলের কাউন্টিং এজেন্টরা। প্রথমে জাতীয় দলের প্রতিনিধিরা, তার পরে রাজ্য দলের, তারপর নির্দল এবং সবশেষে অন্যান্য দলের প্রতিনিধিরা বসার সুযোগ পাবেন।

ট্যাবুলেশন টেবিল (Vote Counting)
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে ফল ঘোষণার প্রক্রিয়ায়। প্রতি রাউন্ডের ফল প্রথমে ট্যাবুলেশন টেবিলে পাঠানো হবে। সেখানে হিসাব মেলানোর পর তা যাচাই করবেন সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও রিটার্নিং অফিসার। এরপর প্রথমে সাক্ষর করবেন রিটার্নিং অফিসার, তার পরে কাউন্টিং অবজারভার সই না করা পর্যন্ত কোনও ফলাফল বাইরে জানানো যাবে না। অতীতে বহু ক্ষেত্রেই এজেন্টদের মাধ্যমে আগাম ফল বাইরে পৌঁছে যেত। এবার সেই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ।
অবজারভারের সইয়ের পরই আনুষ্ঠানিক ভাবে ফল ঘোষণা হবে এবং একই সঙ্গে তা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হবে। তবে ইভিএমের রাউন্ড শেষ হয়ে গেলেও পাশের ঘরে চলতে থাকবে পোস্টাল ব্যালটের গণনা। কারণ পোস্টাল ব্যালট গুনতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে। সব শেষে ইভিএম ও পোস্টাল ব্যালটের মোট ফল যোগ করেই ঘোষণা করা হবে জয়ী প্রার্থীর নাম। দীর্ঘ সময় ধরে গণনা চলবে বলে ভিতরে পানীয় জল, শৌচাগার এবং নির্দিষ্ট খাদ্যগ্রহণের জায়গার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কাউন্টিং এজেন্টদেরও নির্দিষ্ট জায়গায় বসেই খেতে হবে।

সিসিটিভির ক্যামেরার নজরদারি (Vote Counting)
গোটা প্রক্রিয়ার উপর নজর রাখতে প্রতিটি গণনা কেন্দ্র ও তার ২০০ মিটার এলাকা জুড়ে বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। যদিও লাইভ ওয়েবকাস্টিং হবে না, তবে সমস্ত কিছু রেকর্ড করে রাখা হবে। কমিশনের দাবি, ভবিষ্যতে কোনও অভিযোগ উঠলে সেই ফুটেজই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। এই গণনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক, রাজ্য পুলিশের ডিজি, কলকাতা পুলিশ, সিআইএসএফ, বিএসএফ-সহ বিভিন্ন সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক সেরে ফেলেছে কমিশন। ফলে সোমবার সকাল থেকেই কলকাতা থেকে জেলা- সমস্ত গণনা কেন্দ্র থাকবে কড়া নিরাপত্তার বলয়ে।
এখন শুধু অপেক্ষা সময়ের। সোমবার বিকেলের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে—নবান্নে ফিরছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, না কি বাংলায় শুরু হচ্ছে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। অপেক্ষা এখন শুধুই সময়ের।
