Left Front manifesto
Bengal Liberty Desk, Kolkata:
আসন্ন ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের নির্বাচনী ইস্তাহার প্রকাশ করল বামফ্রন্ট Left Front manifesto। ইস্তাহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষকদের স্বার্থরক্ষা এবং শিল্পোন্নয়নকে প্রধান অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বাম নেতৃত্বের দাবি, রাজ্যে বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় এই ইস্তাহারই বিকল্প পথ দেখাবে।
কর্মসংস্থান ও বেকার সমস্যা Left Front manifesto
বামেদের দাবি, রাজ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুবক-যুবতী দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের অভাবে ভুগছেন। তাই সরকার গঠন করতে পারলে প্রথমেই সরকারি দপ্তরে থাকা শূন্যপদ দ্রুত পূরণ করা হবে। পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপন ও ছোট-মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ দিয়ে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার পরিকল্পনাও ইস্তাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বামেদের প্রতিশ্রুতি
সরকারি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক-কর্মচারীর শূন্যপদ পূরণ করা হবে এবং শিক্ষার বেসরকারিকরণ রুখতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য আরও বেশি স্কলারশিপ ও সহায়তা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সমস্ত সরকারি শুন্যপদ পূরণ, আবারও বছর-বছর স্বচ্ছতার সাথে এসএসসি, সিএসসি ও পিএসসি পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি
স্বাস্থ্য পরিষেবার ক্ষেত্রেও সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো উন্নত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ব্লক ও জেলা স্তরে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিষেবা বাড়ানো এবং কম খরচে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাম নেতৃত্ব। সাথে প্রবীণদের জন্য ‘স্বাস্থ্য সেবা’ প্রকল্প।

কৃষক ও গ্রামীণ উন্নয়ন
কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও ইস্তাহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সেচব্যবস্থা উন্নত করা এবং কৃষকদের ঋণ সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সাথে ১৬টি ফসলের ন্যূনতম সহায়ক দেড় গুণ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
শ্রমিক কল্যাণ
শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ন্যূনতম ৭০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। ৪টি শ্রম কোড রাজ্যে প্রয়োগ না করার কথা ইস্তাহারে বলা হয়েছে। সাথে সমকাজে সমমজুরি, কর্মরত নারী শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য ক্রেশ, তৃতীয় লিঙ্গ ও Queer শ্রমিকদের সমকাজে সমমজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মীর মর্যাদার করা ইস্তাহারে প্রকাশ করেছে।
রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরানো
একই সঙ্গে বামফ্রন্টের দাবি, রাজ্যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা তাদের অন্যতম লক্ষ্য। ভোটে হিংসা বন্ধ করা এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও ইস্তাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারী নিরাপত্তা ও নারী ক্ষমতায়ন
পাঁচ বছরের মধ্যে কুড়ি লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি, তামান্না, আভয়া-সহ সকল নির্যাতিতার ন্যায়বিচার, প্রতিটি জেলায় পুলিশের নিজস্ব কিন্তু ‘স্বশাসিত আভয়া বাহিনী’ গঠনের কথা বামেরা তাদের ইস্তাহারে প্রকাশ করেছে।
নদী ভাঙন রোধে কার্যকর কর্মসূচির প্রতিশ্রুতি
আসন্ন ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে প্রকাশিত নির্বাচনী ইস্তাহারে পরিবেশ ও নদী রক্ষার বিষয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বামফ্রন্ট। বিশেষ করে নদী ভাঙন সমস্যা মোকাবিলায় কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ইস্তাহারে। এছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন খাল, বিল, পুকুর, জলাভূমি এবং নদী রক্ষার জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বামফ্রন্ট। ইস্তাহারে বলা হয়েছে, জলাশয় ভরাট বা অবৈধ দখল বন্ধ করতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য বিশেষ নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
সংখ্যালঘু ও আদিবাসী উন্নয়নে জোর
বামেরা তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সংখ্যালঘু ও আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য বৃত্তি বৃদ্ধি এবং সংরক্ষণের সুযোগ আরও কার্যকর করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির জন্য সংরক্ষণের অধিকার ও মর্যাদা বজায় রাখা এবং তা আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে বামেদের ইস্তাহারে।
বামেদের ইস্তাহার নিয়ে তৃণমূল ও বিজেপির কটাক্ষ
তবে বামেদের তাদের এই নির্বাচনী ইস্তাহার নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি তৃণমূল ও বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বামেদের এই ইস্তাহার “বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে”। তৃণমূল নেতৃত্বের মতে, দীর্ঘ ৩৪ বছর রাজ্যে ক্ষমতায় থাকার সময় বামেরা যে সমস্যাগুলির সমাধান করতে পারেনি, এখন ভোটের মুখে সেই একই প্রতিশ্রুতি আবার তুলে ধরা হচ্ছে। তাদের বক্তব্য, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নের কোনও সুস্পষ্ট রূপরেখা ইস্তাহারে নেই।
অন্যদিকে বিজেপির তরফেও বামেদের ইস্তাহারকে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বিজেপি নেতাদের দাবি, বামফ্রন্টের ঘোষণাগুলি “অবাস্তব ও পুরনো রাজনৈতিক ভাবনার পুনরাবৃত্তি”। তাদের মতে, শিল্পোন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বামেদের পূর্ববর্তী শাসনামলের অভিজ্ঞতা রাজ্যের মানুষ এখনও ভুলে যায়নি। তাই নতুন করে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে মানুষের আস্থা তৈরি হবে না বলেই মত বিজেপি নেতৃত্বের।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বামেদের ইস্তাহারকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে ভোটের আগে রাজনৈতিক তরজা। এখন নির্বাচনী প্রচারে এই ইস্যুকে সামনে রেখে শাসক ও বিরোধী শিবিরের বাকযুদ্ধ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

