Brain Drain from West Bengal
Bengal Liberty Desk, Kolkata:
একসময় দেশের অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল পশ্চিমবঙ্গ Brain Drain from West Bengal। ঔপনিবেশিক আমল থেকেই এই রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই রাজ্য থেকে বহু বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং গবেষক দেশ-বিদেশে সুনাম অর্জন করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দেশের সেরা মেধাবীদের তৈরী করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্কের কারণে রাজ্যের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের একাংশ অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে রাজ্যের মানবসম্পদ বিকাশের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচার বলে উল্লেখ করেছেন।

উচ্চশিক্ষায় সংকট Brain Drain from West Bengal
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেই প্রথম ধাক্কা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজ্যের বহু সরকারি ও সরকারপোষিত কলেজে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক আসন ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজ্যের ৯.৩৬ লক্ষের বেশি স্নাতক আসনের মধ্যে প্রায় ২.৭ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছে, অর্থাৎ ৭০ শতাংশেরও বেশি আসন ফাঁকা থেকে গেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, এর একটি বড় কারণ হলো ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অন্য রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি। বিশেষত প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, ম্যানেজমেন্ট ও গবেষণাভিত্তিক বিষয়গুলিতে পড়াশোনার জন্য বহু ছাত্রছাত্রী দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে বেছে নিচ্ছেন। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ, পুনে কিংবা দিল্লির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে বলে বিভিন্ন শিক্ষা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা
শিক্ষার পরবর্তী ধাপ কর্মসংস্থান। কিন্তু এখানেই বড় বাধার মুখে পড়ছেন বহু শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। বিশেষজ্ঞদের মতে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা অনেক যুবক-যুবতীকে রাজ্যের বাইরে যেতে বাধ্য করছে। শিল্পায়নের গতি তুলনামূলক ধীর হওয়ায় রাজ্যে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ খুব দ্রুত তৈরি হচ্ছে না—এমন অভিযোগ বহু অর্থনীতিবিদের। বিশেষ করে আইটি, স্টার্ট-আপ, গবেষণা বা কর্পোরেট খাতে বড় আকারের কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অনেকেই পড়াশোনা শেষ করে সরাসরি অন্য রাজ্যে চলে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রাজ্যে পড়াশোনা করলেও ক্যারিয়ার গড়তে ছাত্রছাত্রীরা বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা গুরগাঁওয়ের মতো শহরকে বেছে নিচ্ছেন।
নিয়োগ সংক্রান্ত বিতর্ক ও আস্থার সংকট
শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে গত কয়েক বছরে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের নির্দেশে বহু নিয়োগ বাতিল হওয়া এবং দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার ফলে শিক্ষাব্যবস্থার উপর আস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষক নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় বহু ছাত্রছাত্রীর মধ্যে সরকারি চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই সরকারি চাকরির পরিবর্তে বেসরকারি বা অন্য রাজ্যের সুযোগের দিকে ঝুঁকছেন।
স্কুলশিক্ষায় বৈষম্য ও অবকাঠামোর সমস্যা
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল শুরু হচ্ছে স্কুল স্তর থেকেই। বিদ্যালয় স্তরেই শিক্ষার মান এবং অবকাঠামো নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মাধ্যমিক স্তরে ড্রপ আউট হার প্রায় ১৮.৭৫ শতাংশ, যা দেশের মধ্যে অন্যতম বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ ও শহুরে শিক্ষার মধ্যে এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে। অনেক গ্রামীণ স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাবরেটরি বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ নেই। ফলে উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর আগেই অনেক ছাত্রছাত্রী পিছিয়ে পড়ছে। এছাড়াও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বা স্কিল-ডেভেলপমেন্টের উপর যথেষ্ট জোর না দেওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে।
কেন বাড়ছে ‘ব্রেন ড্রেন’?
শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অন্যরাজ্যে উন্নত অবকাঠামো ও আধুনিক কোর্সের সুযোগ ও বড় শিল্প ও প্রযুক্তি সংস্থার উপস্থিতি। ওই রাজ্যগুলিতে ভালো বেতন ও দ্রুত ক্যারিয়ার বৃদ্ধির সম্ভাবনা পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় অনেক বেশি। সাথে রাজ্যগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পক্ষেত্রের ঘনিষ্ঠ সংযোগও পশ্চিমবঙ্গে ব্রেন ড্রেন– এর অন্যতম প্রধার কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এই সব কারণ মিলিয়েই অনেক তরুণ পড়াশোনা শেষ করেই রাজ্যের বাইরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করছেন।
সমাধানের কোন পথে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। উচ্চশিক্ষায় নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কোর্স চালু করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা বাড়ানো এবং স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রাজ্যে শিল্প ও স্টার্ট-আপ পরিবেশ শক্তিশালী করা গেলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যদি সমন্বিত উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া যায়, তবে রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষার শক্তিকে আবারও পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। তা না হলে ‘ব্রেন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের সমস্যা আগামী দিনে আরও প্রকট হয়ে উঠতে বাধ্য।
পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষার ঐতিহ্য এখনও দেশের অন্যতম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রকে আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক না করলে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। শিক্ষাবিদদের মতে, সঠিক নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব— নাহলে ‘মেধা পাচার’ ভবিষ্যতে রাজ্যের উন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
