Mosharraf Hossain Death
Bengal Liberty, কলাম লেখক নয়ন বিশ্বাস রকি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ আছেন, যারা কেবল দলীয় পরিচয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেন না; তারা হয়ে ওঠেন একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তেমনই এক নাম ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন(Mosharraf Hossain Death)। সম্প্রতি তার মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয় বরং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা, অভিজ্ঞতা ও গণমুখী নেতৃত্বের এক যুগের অবসান।

এক প্রবীণ রাজনীতিকের প্রয়াণ ও মানবিকতার সংকট
বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনীতিক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির প্রয়াণ নয়, এটি রাষ্ট্র, রাজনীতি ও মানবাধিকারের জন্য এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে রইল। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে তাকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, তা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নির্মম বাস্তবতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। একজন প্রবীণ, অসুস্থ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে ন্যূনতম মানবিক আচরণ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের অভিযোগ- তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাননি, শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন। একটি সভ্য রাষ্ট্রে কোনো নাগরিক, বিশেষ করে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি মানবিকতারও ভয়াবহ সংকট।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও আইনের শাসনের বিপর্যয় (Mosharraf Hossain Death)
আসলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার অঘোষিত সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তখন আইনের শাসনের জায়গা দখল করে প্রতিশোধের মনোভাব। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ঘটনাটি সেই আশঙ্কাকেই আরও জোরালো করেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, বিচার হতে পারে, কিন্তু অসুস্থ একজন মানুষকে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা কখনও ন্যায়বিচারের অংশ হতে পারে না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মানবিক বিবেচনাও হারিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিশোধমূলক আচরণ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিতর্কিত করে তুলছে। এতে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, সমাজে বিভাজন বাড়ে এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি তৈরি হয়।

চট্টগ্রামের ‘সিংহপুরুষ’: সংগ্রাম ও অর্জনের খতিয়ান (Mosharraf Hossain Death)
চট্টগ্রামের মানুষ তাকে জানতেন রাজনীতির ‘সিংহপুরুষ’ হিসেবে। কারণ তিনি ছিলেন আপসহীন, স্পষ্টভাষী এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখেও অবিচল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান। তিনি শুধু রাজনীতিবিদ ছিলেন না, ছিলেন একজন সংগঠক, কৌশলী এবং জনমানুষের নেতা।
সমসাময়িক রাজনীতি: বিভাজন ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি (Mosharraf Hossain Death)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে যে প্রতিহিংসা, বিভাজন ও প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা ক্রমেই প্রকট হচ্ছে, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জীবন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তার একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। তিনি এমন এক সময়ের রাজনীতিক ছিলেন, যখন মতভেদ ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত শত্রুতা এতটা নগ্ন ছিল না। আজ রাজনীতি ক্রমেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২৪-এর ৫ আগস্টের পর। একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের হাতে ক্ষমতা গেলেও কার্যত সরকারে ছিল স্বাধীনতা বিরোধীরা। এই আলবদর-রাজাকার নির্দেশ ইউনূস সরকার আওয়ামী লীগ তথা ৭১-কে মুছে ফেলার মিশনে নামে। ড. মোহাম্মদ ইউনূস নিজেই গণমাধ্যমকে বলেছিলেন অতীত তিনি রিসেট বাটন দিয়ে মুছে ফেলতে। তার সময়ে রাজনৈতিক মতের অমিল মানেই যেন সামাজিক ও মানবিক সম্পর্কের সমাপ্তি। যে ধারা বর্তমান তারেক রহমানের সরকারও করে যাচ্ছে।

বর্তমান প্রজন্মের জন্য শিক্ষণীয় রাজনৈতিক দর্শন (Mosharraf Hossain Death)
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। কারাবরণ, নির্যাতন, অপবাদ- সবই তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। অথচ তিনি কখনও প্রতিহিংসার ভাষায় রাজনীতি করেননি। বরং তার বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে গণতন্ত্র, উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সহাবস্থানের কথা। বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য এখানেই রয়েছে বড় শিক্ষা।
আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সংকট হলো সহনশীলতার অভাব। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করাই যথেষ্ট নয়; তাকে সামাজিকভাবে অপমান, প্রশাসনিকভাবে হয়রানি এবং রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রবণতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মেধাবী, অভিজ্ঞ ও আদর্শবাদী মানুষ। তৈরি হচ্ছে ভয় ও অনিশ্চয়তার সংস্কৃতি।
চট্টগ্রামের অভিভাবক ও নেতৃত্বের শূন্যতা (Mosharraf Hossain Death)
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ছিলেন অভিভাবক। উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব তৈরিতে তার ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। তিনি জানতেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়; এটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ার। তার সময়ে চট্টগ্রামে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে ভারসাম্য ছিল, আজ তা অনেকটাই অনুপস্থিত। এখন রাজনীতি অনেকাংশে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক এবং প্রতিদ্বন্দ্বীকে ধ্বংস করার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে।

প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনও একটি দেশকে এগিয়ে নিতে পারে না। ইতিহাস বলে, যেখানে রাজনৈতিক সহনশীলতা দুর্বল হয়, সেখানে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয়করণে আক্রান্ত হয়, বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং সমাজে বিভক্তি বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ আজ সেই ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে।
এক নির্মম বাস্তবতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন (Mosharraf Hossain Death)
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়- আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে অভিজ্ঞ ও প্রবীণ নেতারা সম্মান পাবেন? নাকি আমরা এমন এক নিষ্ঠুর রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছি, যেখানে মানুষের অবদান নয়, দলীয় অবস্থানই সবকিছু নির্ধারণ করে?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিহিংসার চর্চা নতুন নয়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে মামলা, গ্রেপ্তার, হয়রানি এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা বহুদিনের। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও নির্মম রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, চরিত্রহনন এবং বিভাজনের রাজনীতি সমাজকেও বিষাক্ত করে তুলছে। এই বাস্তবতায় ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের অনুপস্থিতি আরও বেশি অনুভূত হবে।
দলমতের ঊর্ধ্বে জনমানুষের হৃদয়ে স্থান (Mosharraf Hossain Death)
একজন রাজনীতিকের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় তার মৃত্যুর পর। কারণ তখন মানুষ দলীয় পরিচয় ভুলে তার অবদানকে স্মরণ করে। ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের ক্ষেত্রেও সেটিই ঘটছে। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও অনেকে তাকে সম্মান করছেন তার সাহস, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের জন্য। এটি প্রমাণ করে, সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতৃত্ব কখনো কেবল দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়।

উত্তরণের পথ: সহাবস্থান ও আত্মসমালোচনা (Mosharraf Hossain Death)
আজ প্রয়োজন রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির পুনর্গঠন। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। সংসদ, রাজপথ এবং জনপরিসরে ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় রাজনীতি আরও সহিংস, আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠবে। এই সিংহপুরুষের মৃত্যু তাই কেবল শোকের বিষয় নয়; এটি আত্মসমালোচনারও মুহূর্ত। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন আমাদের শেখায়- ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের জন্য কাজ করলে সম্মান স্থায়ী হয়। প্রতিহিংসা সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনো ইতিহাসে মর্যাদা এনে দেয় না।

বাংলাদেশের রাজনীতি আজ যে বিভক্ত ও উত্তপ্ত অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মতো অভিজ্ঞ নেতাদের রাজনৈতিক দর্শন নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে। কারণ গণতন্ত্র টিকে থাকে সংলাপ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর; প্রতিহিংসা ও ঘৃণার ওপর নয়। তার মৃত্যুতে চট্টগ্রাম হারিয়েছে এক অভিভাবককে, আর বাংলাদেশ হারিয়েছে অভিজ্ঞ রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
শেষ কথা: রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রের পরীক্ষা (Mosharraf Hossain Death)
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের মৃত্যু তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের মানবিক চরিত্রেরও পরীক্ষা। তার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়- প্রতিহিংসা দিয়ে সাময়িক জয় পাওয়া যায়, কিন্তু ইতিহাসে সম্মান পাওয়া যায় মানবিকতা ও ন্যায়ের মাধ্যমে। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাবার সবচেয়ে বড় উপায় হবে প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে মানবিক, সহনশীল ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।
আরও পড়ুন:
সুপ্রিম কোর্টে ভার্চুয়াল শুনানি ও ওয়ার্ক ফ্রম হোম চালু (WFH), জ্বালানি সাশ্রয়ে নতুন উদ্যোগ
