Bricks of Blood
Bricks of Blood

সিন্ডিকেট মাফিয়াদের মরণকামড়(Bricks of Blood): কলকাতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে তিলোত্তমার ‘সমান্তরাল আতঙ্ক’

Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে, Kolkata:

কলকাতার ‘সিন্ডিকেট রাজ’ (Bricks of Blood): আভিজাত্যের আড়ালে এক বিষাক্ত সাম্রাজ্য

কলকাতার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ট্রাম, হলুদ ট্যাক্সি আর ঐতিহ্যের গলি। কিন্তু এই তিলোত্তমারই এক অন্ধকার গলিপথ হলো ‘সিন্ডিকেট রাজ’। গত কয়েক দশকে সিন্ডিকেট শব্দটি এই শহরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে মিশে গেছে যে, এটি এখন কেবল একটি ব্যবসা নয়, বরং একটি সমান্তরাল প্রশাসন বা ‘সমান্তরাল অর্থনীতি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সিন্ডিকেট হলো স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি গোষ্ঠী (যাদের পেছনে প্রায়শই রাজনৈতিক ছত্রছায়াও থাকে), যারা কোনো একটি নির্দিষ্ট এলাকার নির্মাণকাজ বা ব্যবসার ওপর একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে। বিশেষ করে রিয়েল এস্টেট বা আবাসন শিল্পে এদের দাপট সবথেকে বেশি।

Bricks of Blood
Bricks of Blood

 

সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে? (The Modus Operandi)

সিন্ডিকেটের কার্যপদ্ধতি বেশ পরিকল্পিত এবং ভয়াবহ। এর মূল ভিত্তি হলো ‘জোরপূর্বক সরবরাহ ব্যবস্থা’।

কাঁচামাল সরবরাহ: কোনো প্রোমোটার বা সাধারণ মানুষ যদি কোনো এলাকায় বাড়ি বানাতে চান, তবে তিনি চাইলেই নিজের পছন্দমতো দোকান থেকে বালি, সিমেন্ট বা পাথর কিনতে পারবেন না। তাকে ওই এলাকার নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের থেকেই এই সমস্ত মালপত্র কিনতে হবে।
বাজারদরের চেয়ে চড়া দাম: সিন্ডিকেট যে দামে মালপত্র দেয়, তা বাজারদরের থেকে অনেক বেশি।

নিম্নমানের সামগ্রী: দাম বেশি নিলেও জিনিসের মান হয় অত্যন্ত নিম্ন। অনেক সময় দেখা যায় সিমেন্টের বদলে ছাই মেশানো মাল বা নিম্নমানের বালি সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রতিবাদ করার কোনো উপায় থাকে না।

লেবার সাপ্লাই: শুধু মালপত্র নয়, রাজমিস্ত্রি থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রমিক—সবই নিতে হয় সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই।

Bricks of Blood
Bricks of Blood

 

এটি কতটা বিপজ্জনক? (The Danger Quotient)

কলকাতার বুকে সিন্ডিকেট রাজ আজ কেবল তোলাবাজিতে সীমাবদ্ধ নেই, এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

গ্যাং ওয়ার বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব: এক একটি এলাকার দখল নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুটি সিন্ডিকেটের মধ্যে হামেশাই সংঘর্ষ বাধে। এর ফলে কলকাতার রাস্তায় প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চলা বা বোমাবাজির ঘটনা এখন আর অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়।

 রাজনৈতিক অপরাধীকরণ: সিন্ডিকেটের মাথায় যারা থাকে, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের ‘বাহুবলী’ হিসেবে পরিচিত। ফলে পুলিশ বা প্রশাসন অনেক সময় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে না। এই দায়মুক্তি তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

অস্ত্রের ঝনঝনানি: সিন্ডিকেট চালানোর জন্য এলাকা দখলে রাখতে ছোট-বড় সব ধরনের বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষ সবসময় এক আতঙ্কের মধ্যে বাস করেন।
সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস

Syndicate Raj in Kolkata
Syndicate Raj in Kolkata

 

সিন্ডিকেট রাজের সবথেকে বড় শিকার সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ (Bricks of Blood)

তাদের জীবন ও জীবিকায় এটি কীভাবে প্রভাব ফেলে

আবাসনের দাম বৃদ্ধি: প্রোমোটারদের যখন চড়া দামে সিন্ডিকেটের থেকে মাল কিনতে হয়, তখন সেই অতিরিক্ত খরচ উসুল করা হয় সাধারণ ফ্ল্যাট ক্রেতাদের পকেট থেকে। ফলে সাধারণ মানুষের নিজের বাড়ির স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
 নির্মাণকাজের নিরাপত্তা: নিম্নমানের বালি-সিমেন্ট ব্যবহারের ফলে বাড়ির কাঠামো দুর্বল হয়। ভবিষ্যতে বড় কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা সবসময় থেকেই যায়।

প্রতিবাদের ভাষা নেই: কেউ যদি সিন্ডিকেটের অন্যায় আবদার মানতে না চান, তবে তাকে শারীরিক নিগ্রহ, প্রাণনাশের হুমকি বা সামাজিকভাবে বয়কট করার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় বাড়ি তৈরির মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কারণ মালিক সিন্ডিকেটের সব শর্ত মানেননি।

Syndicate Raj in Kolkata
Syndicate Raj in Kolkata

 

কেন এই ব্যবস্থার শেষ নেই?(Bricks of Blood)

সিন্ডিকেট আসলে একটি বড় ‘ইকোসিস্টেম’। এখানে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের নামে তোলাবাজির লাইসেন্স দেওয়া হয়। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলো সহজেই বুথ দখল বা মিছিলে লোক জড়ো করার জন্য এক বাহিনী পেয়ে যায়। অর্থের লেনদেন নিচুতলা থেকে ওপরতলা পর্যন্ত এমনভাবে প্রবাহিত হয় যে, এই ব্যবস্থা ভাঙা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

Syndicate Raj in Kolkata
Syndicate Raj in Kolkata

 

বর্তমান পরিস্থিতি ও মানুষের অসহায়তা(Bricks of Blood)

রাজারহাট-নিউটাউন থেকে শুরু করে কসবা, বেহালা বা তিলজলা—কলকাতার সর্বত্রই সিন্ডিকেটের থাবা। সাম্প্রতিককালে সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ বিবাদের কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন নিজের জমি কেনা বা বাড়ি সারাতেও ভয় পান। পুলিশে অভিযোগ জানালে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় অভিযোগকারীকেই উল্টো হেনস্তা হতে হচ্ছে।

সিন্ডিকেট রাজ কলকাতার সংস্কৃতির ওপর একটি বড় কলঙ্ক। উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানের দোহাই দিয়ে যে ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল, তা আজ একটি মাফিয়া সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে। যতক্ষণ না পুলিশ প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, ততক্ষণ সাধারণ মানুষের জীবনে এই ‘সিন্ডিকেট বিভীষিকা’ চলতেই থাকবে। শহর কলকাতার আত্মা হলো তার স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা, কিন্তু সিন্ডিকেট সেই নিরাপত্তাকেই আজ গ্রাস করে নিয়েছে।

আরও পড়ুন:

ডাবগ্রাম–ফুলবাড়ি ছেড়ে শিলিগুড়িতে লড়াইয়ের ঘোষণা গৌতম দেবের (Gautam Deb Seat Shift), কটাক্ষে সরব বিজেপি

Bengal liberty
Bengal liberty

Bengal Liberty is a platform dedicated to guerrilla, unfiltered, and independent journalism. Through YouTube, its official website, and various social media channels, Bengal Liberty seeks to present citizen journalism to the public with integrity and transparency. Editor: Bittu Roy Chowdhury