Rajouri sector attack 2000
Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:
পশ্চিমবঙ্গ—যাকে একসময় সংস্কৃতির পীঠস্থান বলা হতো, সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা সেই রাজ্যের নিরাপত্তা বলয় নিয়ে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে(West Bengal terror module)। গত কয়েক দিনে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা—যেভাবে একের পর এক নাশকতামূলক ষড়যন্ত্র এবং সন্ত্রাসবাদী যোগসূত্র প্রকাশ্যে আসছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: “বাংলা কি তবে জঙ্গিদের নিরাপদ আস্তানা বা করিডর হয়ে উঠছে?”
ঘটনার ঘনঘটা: মুর্শিদাবাদ থেকে কেষ্টপুর West Bengal terror module
গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি মুর্শিদাবাদ জেলায় এসটিএফ (STF) এবং পুলিশের বিশেষ অভিযানে ধরা পড়ে দুই সন্দেহভাজন জঙ্গি। তাদের জেরা করে যে তথ্য উঠে আসে, তা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। ঠিক তার পরের দিনই জেলা আদালতে ইমেল মারফত আসে “বোমা হুমকির” খবর। বিচারব্যবস্থার প্রাণকেন্দ্রে এই ধরনের হুমকি কেবল একটি ইমেল নয়, বরং প্রশাসনের চোখে আঙুল দিয়ে নিরাপত্তার ফাঁকফোকর দেখিয়ে দেওয়া।
এর রেশ কাটতে না কাটতেই খাস কলকাতা সংলগ্ন কেষ্টপুর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় আরও এক সন্ত্রাসবাদীকে। সবথেকে ভয়ের বিষয় হলো, ধৃত ব্যক্তিটি দীর্ঘ সময় ধরে নিজের পরিচয় লুকিয়ে, ছদ্মবেশে সাধারণ মানুষের ভিড়ে মিশে ছিল। এই “স্লিপার সেল” বা ছদ্মবেশী জঙ্গিদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসবাদের শিকড় বাংলার অলিগলিতে কতটা গভীরে পৌঁছে গেছে।

বিএসএফ বনাম রাজ্য সরকার: সীমান্তে সুরক্ষার অভাব? West Bengal terror module
পশ্চিমবঙ্গের একটি বিশাল অংশ বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত ভাগ করে নেয়। মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলো ভৌগোলিক কারণেই অত্যন্ত সংবেদনশীল। দীর্ঘকাল ধরে বিএসএফ (BSF) অভিযোগ করে আসছে যে, সীমান্তে পূর্ণাঙ্গ কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার জমি অধিগ্রহণে সহযোগিতা করছে না।
প্রশাসনের এই নির্লিপ্ততা বা “মুখ কুলুপ” এঁটে থাকার সংস্কৃতি সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। বিএসএফ যখন বারবার জমি চায় এবং রাজ্য সরকার নীরব থাকে, তখন সেই সুযোগটাই নেয় পাচারকারী এবং জঙ্গিরা। নদীপথ বা অরক্ষিত সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ এখন জলভাতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং ভোটব্যাংকের রাজনীতির কারণেই কি এই সীমান্ত করিডরগুলো সন্ত্রাসবাদীদের জন্য উন্মুক্ত হয়ে থাকছে?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং ‘জামাত’ ফ্যাক্টর West Bengal terror module
পশ্চিমবঙ্গের এই অস্থিরতার পেছনে সীমান্তের ওপার অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির এক বিশাল ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচনের পরবর্তী অধ্যায়ে ‘জামাত-ই-ইসলামি’-র মতো কট্টরপন্থী দলগুলোর আধিপত্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ঐতিহাসিকভাবেই জামাতিরা ভারতবিরোধী এবং মৌলবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী।
সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে জামাতের প্রভাব বৃদ্ধির অর্থ হলো—ভারতের মাটিতে মৌলবাদ রপ্তানি করা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত বা নজরদারিতে থাকা জঙ্গিরা পশ্চিমবঙ্গে এসে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে জাল নোটের কারবার এবং অস্ত্র পাচার। জামাতিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে এই করিডরগুলো এখন সচল, যা পশ্চিমবঙ্গের শান্তিশৃঙ্খলা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।
প্রশাসনের নীরবতা: কেন্দ্র ও রাজ্য সংঘাত West Bengal terror module
আশ্চর্যের বিষয় হলো, এতগুলো গ্রেফতারি এবং হুমকির পরও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে যে সমন্বয় থাকা উচিত ছিল, তার অভাব স্পষ্ট। একদিকে রাজ্য সরকার যেমন জমি বিবাদে জড়িয়ে বিএসএফ-এর কাজে বাধা সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর তৎপরতা নিয়েও রাজনীতির রঙ চড়ানো হচ্ছে। যখন নিরাপত্তা নিয়ে রাজনীতি হয়, তখন লাভবান হয় কেবল রাষ্ট্রের শত্রুরা।
কেষ্টপুরের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় একজন জঙ্গি মাসের পর মাস পরিচয় লুকিয়ে থেকে গেল, অথচ স্থানীয় পুলিশ বা গোয়েন্দারা তা জানতে পারল না—এটি গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়। সাধারণ মানুষ এখন আতঙ্কিত এই ভেবে যে, তাদের পাশের বাড়িতেই হয়তো কোনো মারণাস্ত্র তৈরির নীল নকশা তৈরি হচ্ছে।
সময় এখন সতর্ক হওয়ার West Bengal terror module
পশ্চিমবঙ্গকে যদি সত্যিই “জঙ্গিদের করিডর” হওয়া থেকে বাঁচাতে হয়, তবে প্রশাসনকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। বিএসএফ-কে প্রয়োজনীয় জমি প্রদান করে সীমান্ত সিল করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তির অনুপ্রবেশ রুখতে বিজিবি (BGB) এবং বিএসএফ-এর মধ্যে কঠোর সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলা যখন “বাংলাদেশী” কায়দায় মৌলবাদের চারণভূমি হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে বিপদ আমাদের দোরগোড়ায়। গত তিন দিনের ঘটনাপ্রবাহ স্রেফ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড়সড় অশনি সংকেত। সরকার এবং সাধারণ মানুষ—উভয়কেই এখন চোখ-কান খোলা রাখতে হবে, নয়তো এই শান্ত সুন্দর বাংলা একদিন কেবল সন্ত্রাসবাদীদের অভয়ারণ্য হিসেবেই পরিচিতি পাবে।
