Iliyas kashmiri
Bengal Liberty Desk, ১০ ডিসেম্বর, কলকাতা: লোকে বলে মানুষের মৃত্যু ঘটলে তারা অশরীরি রূপে পুরো জগতে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু আমরা এমন এক অশরীরির কথা জানবো যে মৃত্যুর পরও হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসের এক অন্যতম প্রধান মুখ এবং ঘটিয়েছিল সারা জীবন মনে রাখার মত এমন কিছু ঘটনা (Mastermind of Terrorism) যেগুলির কথা ভাবলে এখনও পুরো শরীরে শিহরণ দিয়ে ওঠে।
আজ আমরা কথা বলব সন্ত্রাসের এক অন্যতম বাদশা আল কায়েদা জঙ্গি গোষ্ঠীর নেতা “ইলিয়াস কাশ্মীরি”(Iliyas kashmiri) এর সম্বন্ধে।
কে ছিল এই ইলিয়াস কাশ্মীরি? কি ভূমিকা ছিল তার সন্ত্রাসবাদী রূপে?

ইলিয়াস কাশ্মীরি (Iliyas kashmiri): ( Mastermind of Terrorism)
নানারকম খবর সামনে এসেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা তাকে আল-কায়েদার প্রধান হিসেবে ওসামা বিন লাদেনের সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন । তার মৃত্যুর আগে, একটি সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম তাকে “পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি” বলে অভিহিত করেছিল, এবং সাংবাদিক সৈয়দ সেলিম শাহজাদ বলেছিলেন যে “বিশ্ব গোয়েন্দা সংস্থাগুলি তাকে সর্বদা বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর, বিপজ্জনক এবং সফল গেরিলা নেতা হিসাবে বর্ণনা করে।” ঠিক তারপরই হঠাৎই সবার সামনে আসে তার একটি মৃত্যুর খবর তবে সেটিকে পুরোপুরি “ভুয়োমৃত্যু” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় কারণ সেটির পরই ঘটেছিল মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে ২৬/১১ এর মত ভয়ংকর একটি সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ। যার মধ্যে প্রধানতম ভূমিকায় ছিল এই বিখ্যাত জঙ্গি নেতা ইলিয়াস কাশ্মিরী, রেহমান ডাকেইথ সহ আইএসআই জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রমুখেরা। এই ইলিয়াস কাশ্মীরি শুধুমাত্র আল-কায়েদা নয় জয়েশ-এ-মহাম্মদের সাথেও যুক্ত ছিল। সব জায়গায় তার মৃত্যু নিয়ে অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে কেউ বলে সে ৩রা জুন ২০১১ তে ইউএস স্ট্রাইক ড্রোনের আক্রমণে নিহত হয় তবে তার মৃত্যুর সত্যতা আজ অব্দি যাচাই করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি।

ওসামা বিন লাদেনের সঙ্গে সংযোগ (The successor of Osama bin Laden):
রাজা লাহরাসিব খানের পৃথক মামলায় কাশ্মীরির মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলায় সহায়তা করার অভিপ্রায় প্রকাশ পায়। খান একজন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক, যাকে ২০১০ সালের মার্চ মাসে শিকাগোতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং আল-কায়েদাকে বস্তুগত সহায়তা প্রদানের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।খান দাবি করেছিলেন যে তিনি কাশ্মীরিকে ১৫ বছর ধরে চেনেন, তার সাথে অসংখ্যবার দেখা করেছিলেন এবং জানতে পেরেছিলেন যে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর জন্য কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে চান।খান একজন অজ্ঞাত সহযোগীর সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্টেডিয়ামে হামলার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন, যদিও মনে হয় না যে তিনি কাশ্মীরির নির্দেশে তা করছিলেন।রেকর্ড করা আলোচনায়, খান আরও জানান যে কাশ্মীরি এক সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ ছিলেন এবং একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন।খান কাশ্মীরির আল-কায়েদার সাথে সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে কাশ্মীরি বিন লাদেনের নির্দেশে কাজ করেন। সেইখান থেকে কাশ্মীরি ওসামা বিন লাদেনের প্রধান উত্তরসূরী হয়ে ওঠে।
রহমান ডাকাইতের সঙ্গে সংযোগ(link with Rehman Dakait):
সরদার আব্দুল রেহমান বালুচ (ডাকাইত)ছিলেন তৎকালীন বালৌচ গোষ্ঠীর প্রধান নেতা, যার ভয় কাঁপতো পুরো পাকিস্তান। রেহমান ডাকাইত এমন একটি চরিত্র যে নিজের আধিপত্য পাকিস্তানের ভিতরেও এক মিনি পাকিস্তান রূপে বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।সে করাচির লিয়ারি পাড়ায় অবস্থিত একজন পাকিস্তানি গ্যাংস্টার ছিল। পিপলস আমান কমিটি গঠন করেছিল সে। শহুরে করাচিতে, তিনি ভীত কিন্তু আলোচিত নয় এমন আন্ডারওয়ার্ল্ডের একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। এইরকম ভয়ানক একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিল কাশ্মিরী এবং ঘটিয়েছিল ২৬/১১ এর মত মর্মান্তিক এক ঘটনা। খবর মেলে যে কাশ্মীরি এবং এই রেহমান বালুচের মধ্যে প্রায়সই অত্র সরবরাহ হতো এবং সেই অস্ত্রের ব্যবহারই করা হয় সেই দিন মুম্বাইয়ের তাজ হোটেলে।
ইলিয়াস কাশ্মীরির দ্বারা ঘটিত সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ (Terrorist attacks)
1. ভারতীয় সৈনিকের শিরশ্ছেদ (২০০০): তার সবচেয়ে কুখ্যাত কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি ঘটে ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, যখন তার জঙ্গিরা জম্মু ও কাশ্মীরের রাজৌরি জেলায় একটি ভারতীয় সেনা পোস্টে আক্রমণ করে। এতে সাতজন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয় এবং কাশ্মীরি তাদের একজন, ভৌসাহেব মারুতি তালেকরের শিরশ্ছেদ করে তার মাথা ট্রফি হিসেবে পাকিস্তানে নিয়ে যায় বলে জানা গেছে। পাকিস্তানি মিডিয়া এই ঘটনার ছবি প্রকাশ করে এবং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মোশাররফ তাকে পুরস্কৃত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
2. মুম্বাই হামলা (২০০৮): নিহত সাংবাদিক সৈয়দ সেলিম শাহজাদের মতে, কাশ্মীরি ২৬/১১ হামলাকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু করার জন্য একটি “ব্যাপক অভিযান” হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, যার ফলে আল-কায়েদার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের গতিপথ ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
3. পারভেজ মোশাররফের উপর হত্যা প্রচেষ্টা (২০০৩): পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল এবং অল্প সময়ের জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
4. করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটে আত্মঘাতী বোমা হামলা (২০০৬): তার দল, হুজি, এই হামলার পিছনে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত, যেখানে একজন আমেরিকান কূটনীতিক সহ চারজন নিহত হন।
5. ক্যাম্প চ্যাপম্যান আক্রমণ (ডিসেম্বর ২০০৯): কাশ্মীরির বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের একটি সিআইএ ঘাঁটিতে আত্মঘাতী হামলার আয়োজনের অভিযোগ আনা হয়েছিল, যেখানে সাতজন সিআইএ কর্মকর্তা এবং ঠিকাদার নিহত হয়েছিল।
6. পিএনএস মেহরানের উপর আক্রমণ (মে ২০১১): কাশ্মিরির ৩১৩ ব্রিগেড করাচিতে পাকিস্তান নৌ বিমান ঘাঁটিতে একটি অত্যাধুনিক, বহু ঘন্টাব্যাপী আক্রমণের মূল পরিকল্পনাকারী বলে মনে করা হয়, যার ফলে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে।
7. লকহিড মার্টিনের সিইওকে হত্যার ষড়যন্ত্র: ডেভিড হেডলি মার্কিন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন যে মার্কিন ড্রোন ব্যবহারের কারণে ক্ষোভের বশে কাশ্মীরি লকহিড মার্টিনের সিইওকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন।
মেজর মোহিত শর্মার সাথে কাশ্মীরির সাক্ষাৎ(first meet with Mohit Sharma):
মেজর মোহিত শর্মা ছিলেন ভারতীয় সেনার এক অন্যতম সেরা জওয়ান। যিনি আইএসআই,আল কায়দা,জয়শ এ মহাম্মদ ইত্যাদি জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজের পরিচয় লুকিয়ে থেকেছিলেন দীর্ঘদিন। মেজর মোহিত শর্মা নিজের জীবনের পরোয়া না করে জঙ্গিদের একদম ভিতর অব্দি অগ্রসর হয়েছিলেন এবং সেখানেই তার সাথে সাক্ষাৎ হয় প্রথমবার এই ইলিয়াস কাশ্মীরির এবং এই জঙ্গি নেতা তার চোখের সামনে ২৬/১১ তাজ হোটেল অ্যাটাক ঘটিয়েছিল।
