Mystery of Deadly Dawood Ibrahim
Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:
দাউদ ইব্রাহিম(Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)—একটি নাম যা কয়েক দশক ধরে মুম্বাইয়ের অপরাধ জগত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের মানচিত্রে এক ত্রাসের নাম হয়ে আছে। ডংরির অলিগলি থেকে করাচির সুরক্ষিত বাংলো পর্যন্ত তার এই যাত্রাপথ রক্ত, বিশ্বাসঘাতকতা এবং নৃশংসতায় মোড়ানো।

ডংরির ছেলে থেকে ‘আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন’ (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
দাউদ ইব্রাহিমের জন্ম ১৯৫৫ সালে মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে। তার বাবা ইব্রাহিম কাস্কার ছিলেন মুম্বাই পুলিশের একজন কনস্টেবল। অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে বেড়ে উঠলেও দাউদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল আকাশচুম্বী।
মুম্বাইয়ের ডংরি এলাকায় বড় হওয়ার সময় সে ছোটখাটো চুরি ও চোরাচালানে জড়িয়ে পড়ে। সত্তরের দশকে মুম্বাইয়ের অপরাধ জগত শাসন করত হাজি মাস্তান এবং বরদারাজন মুদালিয়ার। দাউদ তার ভাই সাবির ইব্রাহিমের সাথে মিলে নিজস্ব গ্যাং ‘ডি-কোম্পানি’ (D-Company) গড়ে তোলে।

পাঠান গ্যাংয়ের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ
দাউদের উত্থানের পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল করিম লালার ‘পাঠান গ্যাং’। ১৯৮১ সালে পাঠান গ্যাংয়ের হাতে দাউদের বড় ভাই সাবির নিহত হয়। এই হত্যাকাণ্ড দাউদকে চরম নৃশংস করে তোলে। সে প্রতিজ্ঞা করে মুম্বাই থেকে পাঠানদের নিশ্চিহ্ন করার। একে একে শমীর খান এবং আমির জাদার মতো ডনদের খতম করে দাউদ মুম্বাইয়ের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠে।
অপরাধী থেকে আন্তর্জাতিক জঙ্গি: ১৯৯৩-এর সেই কালো দিন (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
দাউদের জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় আসে ১৯৯৩ সালে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর মুম্বাইয়ে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, তাকে পুঁজি করে দাউদ ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
১২ মার্চ, ১৯৯৩। মুম্বাই কেঁপে ওঠে ১২টি ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণে। ২৫৭ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায় এবং ৭০০-র বেশি মানুষ আহত হয়। এই ঘটনার মাধ্যমেই দাউদ ইব্রাহিম স্রেফ একজন ‘গ্যাংস্টার’ থেকে ‘আন্তর্জাতিক জঙ্গি’ বা গ্লোবাল টেররিস্টে পরিণত হয়। এই বিস্ফোরণের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল দাউদ এবং টাইগার মেমন।

আইএসআই (ISI) এবং দাউদ: অশুভ আঁতাত (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
১৯৯৩ সালের বিস্ফোরণের পর দাউদ ভারত ছেড়ে দুবাই হয়ে পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। এখানেই শুরু হয় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ISI-এর সাথে তার গভীর সম্পর্ক।
• আশ্রয় ও সুরক্ষা: করাচির অভিজাত এলাকা ক্লিফটনে দাউদকে কড়া নিরাপত্তায় রাখা হয়। ISI তাকে ভারতের বিরুদ্ধে একটি ‘কৌশলগত অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।
• অর্থায়ন: দাউদের মাদক ব্যবসা (Narcotics) এবং জালনোটের কারবার (FICN) পাকিস্তানের অর্থনীতিতে এবং জঙ্গি অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
• লস্কর-ই-তৈবা ও জৈশ-ই-মহম্মদ: রিপোর্ট অনুযায়ী, দাউদের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে লস্কর এবং জৈশ-এর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো ভারতে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচার করে। দাউদ সরাসরি পাকিস্তানের ‘স্টেট গেস্ট’-এ পরিণত হয়।

রেহমান বালোচ এবং দাউদের ভীতি (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
মুম্বাইয়ের বেতাজ বাদশা হলেও দাউদ ইব্রাহিম একজনকে যমের মতো ভয় পেত—সে হলো করাচির গ্যাংস্টার রেহমান ডাকাত ওরফে রেহমান বালোচ। করাচির লিয়ারি (Lyari) এলাকার ত্রাস ছিল এই রেহমান।
নূর কাস্কারের মৃত্যু এবং দাউদের পরাজয়
দাউদের ভাই নূর কাস্কার ওরফে নূরা ইব্রাহিম করাচিতে দাউদের সাম্রাজ্য দেখভাল করত। নূরা ছিল মাদকাসক্ত এবং উগ্র মেজাজি। লিয়ারি এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে নূরার সাথে রেহমান বালোচের বিরোধ শুরু হয়।

রেহমান বালোচ কোনো আন্তর্জাতিক ডন ছিল না, কিন্তু সে ছিল মাটির কাছাকাছি থাকা একজন লড়াকু গ্যাংস্টার। ২০০৯ সালে (মতভেদে এর কিছু আগে) নূর কাস্কার এবং রেহমান বালোচের গ্যাংয়ের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। শোনা যায়, রেহমান বালোচ নিজেই নূরাকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।
দাউদ ইব্রাহিম তার ভাইয়ের এই হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারেনি। কারণ লিয়ারি এলাকায় রেহমানের জনসমর্থন এবং তার নৃশংসতার কাছে ডি-কোম্পানি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। এই ঘটনা দাউদের অপরাজেয় ইমেজে বড় ধাক্কা দেয়।
দাউদের মৃত্যু রহস্য: সত্য না গুজব? (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
বিগত কয়েক বছর ধরে দাউদ ইব্রাহিমের মৃত্যু নিয়ে বারবার খবর সামনে এসেছে। বর্তমানে তার বয়স ৭০-এর কাছাকাছি।
• অসুস্থতা: বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, দাউদ কিডনি বিকল হওয়া বা গ্যাংগ্রিনের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। সে করাচির একটি সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে জানা যায়।

• বিষপ্রয়োগের গুঞ্জন: ২০২৪ সালের শুরুর দিকে একটি খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে যে, করাচির হাসপাতালে দাউদকে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে এবং তার মৃত্যু হয়েছে।
• পাকিস্তানের নিরবতা: পাকিস্তান সরকার বরাবরের মতোই দাউদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, দাউদ এখনো জীবিত তবে সে অত্যন্ত অসুস্থ এবং ঘরবন্দী।
তার মৃত্যু রহস্য এখনো কুয়াশাচ্ছন্ন। যদি সে মারা গিয়ে থাকে, তবে পাকিস্তান তা গোপন রাখবে কারণ দাউদের মৃত্যু স্বীকার করা মানেই হলো এতদিন সে পাকিস্তানে ছিল তা মেনে নেওয়া—যা আন্তর্জাতিক স্তরে পাকিস্তানকে বিপদে ফেলতে পারে।
দাউদ ও ইলিয়াস কাশ্মীরি: আল-কায়েদার সাথে সংযোগ (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন থেকে দাউদের ‘গ্লোবাল টেররিস্ট’ হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় হাত ছিল ইলিয়াস কাশ্মীরির। কাশ্মীরি ছিল আল-কায়েদার অন্যতম দুর্ধর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং ‘৩১৩ ব্রিগেড’-এর প্রধান।

• কৌশলগত জোট: ২০০০ সালের পরবর্তী সময়ে দাউদ সরাসরি আল-কায়েদার সংস্পর্শে আসে কাশ্মীরির মাধ্যমে। ইলিয়াস কাশ্মীরি দাউদকে শিখিয়েছিল কীভাবে স্রেফ গ্যাংস্টার নেটওয়ার্ককে একটি আধাসামরিক জঙ্গি সংগঠনে রূপান্তর করা যায়।
• ২৬/১১ মুম্বাই হামলা: গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলার আগে লজিস্টিক সাপোর্ট এবং স্থানীয় রেইকি করার ক্ষেত্রে দাউদের নেটওয়ার্ক ও কাশ্মীরির রণকৌশল এক সুতোয় গেঁথেছিল।
• করাচি কানেকশন: করাচিতে থাকাকালীন দাউদ এবং কাশ্মীরি একাধিকবার গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। কাশ্মীরি দাউদকে ড্রাগ মানি বা ‘মাদক অর্থ’ ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে জিহাদি কার্যক্রম চালানোর পথ দেখিয়েছিল।
অন্যান্য জঙ্গি নেতাদের সাথে দাউদের নাশকতামূলক সম্পর্ক (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
ISI-এর আশ্রয়ে থাকাকালীন দাউদ ইব্রাহিম পাকিস্তানের প্রায় প্রতিটি বড় জঙ্গি সংগঠনের প্রধানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে।
ক) হাফিজ সাইদ (লস্কর-ই-তৈবা প্রধান)
দাউদ ইব্রাহিম এবং হাফিজ সাইদের সম্পর্ক অনেকটা ‘অর্থ ও অস্ত্রের’ মতো। দাউদ তার ডি-কোম্পানির বিশাল অর্থভাণ্ডার হাফিজ সাইদের লস্কর-ই-তৈবাকে দান করে, যার বিনিময়ে লস্কর দাউদকে নিরাপত্তা এবং ভারতের বিরুদ্ধে নাশকতার জন্য লোকবল সরবরাহ করে। করাচির ক্লিফটনে তাদের একাধিকবার একসাথে দেখা যাওয়ার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
খ) মাসুদ আজহার (জৈশ-ই-মহম্মদ প্রধান)
জৈশ-ই-মহম্মদের প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আজহারের সাথে দাউদের সম্পর্ক মূলত অস্ত্র পাচার কেন্দ্রিক। নেপাল এবং বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে ভারতে জাল নোট এবং অস্ত্র ঢোকানোর জন্য দাউদ মাসুদ আজহারের ক্যাডারদের ব্যবহার করে থাকে। দাউদের অর্থায়নেই জৈশ-এর অনেক অপারেশন পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
গ) জাকি-উর-রহমান লখভি
লস্কর-ই-তৈবার অপারেশনাল কমান্ডার লখভির সাথে দাউদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল ২৬/১১ হামলার সময়। করাচি বন্দরে দাউদের নিয়ন্ত্রণাধীন বোট এবং ডকগুলো লখভির জঙ্গিদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল দাউদ।

বিশ্বজুড়ে ত্রাসের নেটওয়ার্ক: দাউদ-কাশ্মীরি অক্ষ (Mystery of Deadly Dawood Ibrahim)
ইলিয়াস কাশ্মীরি দাউদকে বুঝিয়েছিল যে, কেবল ভারত নয়, পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। এর ফলে দাউদের ডি-কোম্পানি আন্তর্জাতিক ‘নার্কো-টেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের মূল হোতা হয়ে ওঠে। দাউদ আফগানিস্তান থেকে আফিম সংগ্রহ করে কাশ্মীরির নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে দিত, যার লভ্যাংশ যেত আল-কায়েদার তহবিলে।
➡️ https://t.co/3dyJsBp5Lp বিস্তারিত পড়ুন লিংকে ক্লিক করে
The Unknown Men 2022-23: অপারেশন আননোন মেন, লস্কর-জইশ থেকে খলিস্তানি জঙ্গি—বিদেশের মাটিতে যেভাবে খতম হলো ভারতের শত্রুরা@bengalliberty #bengalliberty #indianraw #indianarmyforces #indianintelligence #unknownmen pic.twitter.com/krB5sn9Tmn— Bengal Liberty (@bengalliberty1) March 22, 2026
দাউদ ইব্রাহিম কেবল একটি নাম নয়, এটি ভারতের বিচার ব্যবস্থার কাছে একটি অমীমাংসিত অধ্যায়। একজন কনস্টেবলের ছেলে থেকে দুনিয়ার অন্যতম মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধী হয়ে ওঠার এই কাহিনী যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি ভয়াবহ। নূর কাস্কারের মৃত্যু এবং রেহমান বালোচের ভয় প্রমাণ করে যে, অপরাধ জগতের সম্রাট হলেও ক্ষমতার সীমা নির্দিষ্ট।
আরও পড়ুন :
অপারেশন আননোন মেন(The Unknown Men 2022-23): লস্কর-জইশ থেকে খলিস্তানি জঙ্গি—বিদেশের মাটিতে যেভাবে খতম হলো ভারতের শত্রুরা
