Chicken Neck Security
Bengal Liberty, ২৩ মে :
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর স্নায়ুকেন্দ্র ‘চিকেনস নেক’ (Chicken Neck Security)। একদিকে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সীমান্ত, আর ঠিক ঘাড়ের কাছেই নিঃশ্বাস ফেলছে চিনা ড্রাগন। দেশের নিরাপত্তার এই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারকে সুরক্ষিত করতে এবার কোমর বেঁধে নামল কেন্দ্র ও রাজ্যের নয়া সরকার। এই এলাকার মাত্র ২২ কিলোমিটারের মধ্যে ব্যাটেলিয়ন হেডকোয়ার্টার গড়তে রাজ্যের কাছে ৬ একর জমি চেয়েছে BSF। পাশাপাশি, স্থায়ী বেস ক্যাম্পের জন্য ১০০ একর জমি চেয়েছে ITBP। জাতীয় সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া ও আউটপোস্টের জন্য আরও ৮৮ একর জমি কেনার ছাড়পত্র ইতিমধ্যেই দিয়েছে রাজ্য। নতুন মুখ্যমন্ত্রী ৪৫ দিনের মধ্যে BSF-কে জমি হস্তান্তরের ডেডলাইন দিয়েছেন (Chicken Neck Security)।

২২ কিলোমিটারের বৃত্তে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা (Chicken Neck Security)
চিকেনস নেকের ওপর পূর্ণাঙ্গ ও মজবুত নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে তৎপর কেন্দ্র। সূত্রের খবর, শিলিগুড়িতে একটি আস্ত ব্যাটেলিয়ন হেডকোয়ার্টার গঠনের জন্য রাজ্যের কাছে ৬ একর জমি চেয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, এই প্রস্তাবিত জমিটি চিকেনস নেকের ২২ কিলোমিটারের স্ট্র্যাটেজিক রেডিয়াসের মধ্যেই অবস্থিত। পাশাপাশি, উত্তরবঙ্গে স্থায়ী পরিকাঠামো ও বেস ক্যাম্প তৈরির জন্য ১০০ একর জমি চেয়েছে ইন্দো-তিব্বতীয় সীমান্ত পুলিশ। এখানেই শেষ নয়, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ফেন্সিং বা কাঁটাতারের বেড়া এবং বর্ডার আউটপোস্ট নির্মাণের জন্য আরও ৮৮ একর জমি কেনার অনুমোদন ইতিমধ্যেই দিয়ে দিয়েছে রাজ্য। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই ঘোষণা করেছিল, ৪৫ দিনের মধ্যে সীমান্ত এলাকার প্রয়োজনীয় জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হতে দেখেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন সীমান্তবাসী।

পূর্বতন সরকারের উদাসীনতার খতিয়ান (Chicken Neck Security)
এখানেই প্রশ্ন উঠছে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের ভূমিকা নিয়ে। চিকেনস নেকের মতো এমন একটি অতি-সংবেদনশীল এলাকায়, যেখানে সামান্য সামরিক ভুল বড়সড় বিপদের কারণ হতে পারে, সেখানে বিগত সরকার কেন দিনের পর দিন উদাসীন ছিল? সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পূর্বতন সরকারের কোনও সদর্থক পদক্ষেপ তো দেখাই যায়নি, উলটে এই জমি জট জিইয়ে রাখা হয়েছিল। এই গাফিলতির সুযোগ নিয়েই বিগত বছরগুলিতে, বিশেষ করে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে, চিকেনস নেকের ঠিক ডানদিকের অংশে সিকিম, ভুটান ও চিন সীমান্তে বারবার চিনা সেনার জমায়েত ও ক্যাম্প তৈরির মতো উদ্বেগজনক খবর প্রকাশ্যে এসেছে। দেশের সুরক্ষার সঙ্গে আপস করে কেন এই এলাকাকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, তা নিয়ে আজ বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

অনুপ্রবেশের ‘ফ্রি-পাস’ সেভেন সিস্টার্স? (Chicken Neck Security)
চিকেনস নেক কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি গোটা ভারতের সঙ্গে সেভেন সিস্টার্স বা উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র সংযোগরক্ষাকারী করিডোর। মায়ানমার বা বাংলাদেশ সীমান্ত টপকে যেসব অনুপ্রবেশকারীরা উত্তরবঙ্গ বা আলিপুরদুয়ারের দিক দিয়ে দেশে প্রবেশ করে, তাদের মূল লক্ষ্যই থাকে এই চিকেনস নেক হয়ে গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়া। বিগত সরকারের আমলে এই রুটটি কার্যত অনুপ্রবেশকারীদের ‘ফ্রি-পাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রশ্ন উঠছে, তৎকালীন রাজ্য সরকার এই আন্তর্জাতিক করিডোর দিয়ে বেআইনি অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ঠিক কী পদক্ষেপ নিয়েছিল? নাকি ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে জেনেবুঝেই এই করিডোরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, যাতে অবাধে অনুপ্রবেশ চলতে পারে? আবার সেভেন সিস্টার্স বা চিকেনস নেক নিয়ে ইন্ডো জোটের দলগুলো একাধিক প্রশ্ন তুলতো। অথচ তাঁদেরই একটি জোট দল তৃণমূলের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতার কারণে এই চিকেনস নেকের কাজ দীর্ঘদিন পড়ে ছিল, তাহলে এত বড় বড় কথা বলত কীভাবে?

চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ ফন্দিতে ভারতের পাল্টা চাল (Chicken Neck Security)
চিকেনস নেকের এই জিও-পলিটিক্যাল গুরুত্বের কথা মাথায় রাখলেই চিনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ -এর পেছনের আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়। বিভিন্ন দেশকে ঋণের ফাঁদে ফেলে পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে এই প্রজেক্টের জাল বিছিয়েছে বেজিং। এই প্রকল্প ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকার কাছাকাছি দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নয়াদিল্লি অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই প্রজেক্ট থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। কারণ ভারত সরকার খুব ভালো করেই জানত, এই ধরনের প্রজেক্টের আড়ালে দেশে গুপ্তচরবৃত্তি এবং বেআইনি কার্যকলাপ ঢোকানো চিনের পক্ষে অনেক সহজ হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের এই কড়া অবস্থানের পরেও, রাজ্যের পূর্বতন সরকার নিজেদের সীমানায় কেন সুরক্ষার প্রাচীর তোলেনি, তা এক বিরাট রহস্য।

বিরোধীদের দীর্ঘদিনের চিরাচরিত অভিযোগ ছিল, দিল্লি নাকি উত্তর-পূর্ব ভারত বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-কে বঞ্চিত করে রেখেছে! চিনের প্ররোচনামূলক ‘স্ট্যান্ডার্ড ম্যাপ’-এর প্রসঙ্গ টেনে কেন্দ্রকে তোপ দাগতেও ছাড়েননি তাঁরা। কিন্তু শিলিগুড়ি করিডোরে দেশের এই নয়া রণকৌশল, এক লহমায় সেই সমস্ত সমালোচকদের মুখে কার্যত স্থায়ী কুলুপ পরিয়ে দিল। সেভেন সিস্টার্স যদি সত্যিই কেন্দ্রের কাছে ব্রাত্য হত, তবে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার একমাত্র ধমনী, এই ‘চিকেনস নেক’-কে এমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলার কোনো প্রয়োজনই ছিল না। আসলে, চিকেনস নেককে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করার এই মেগা-প্ল্যান নিছক কোনো সামরিক প্রস্তুতি নয়, এটি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে চিনের চোখের দিকে চোখ রেখে ভারতের এক চূড়ান্ত মাস্টারস্ট্রোক! এই পদক্ষেপ আজ বুক ঠুকে গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিল, উত্তর-পূর্ব ভারত শুধু মানচিত্রের অংশ নয়, এটি অখণ্ড ভারতের স্পন্দিত হৃদয়। আর সেই স্পন্দনকে সুরক্ষিত রাখতে কেন্দ্র ও রাজ্যের বর্তমান ‘ডাবল-ইঞ্জিন’ সরকার যে আপসহীন লৌহবর্ম তৈরি করছে, চিকেনস নেকের বুকে এই রণপ্রস্তুতিই আগামীর এক সুরক্ষিত ভারতের অমোঘ হুঙ্কার!

