The Unknown Men 2022-23
Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:
গত কয়েক বছরে পাকিস্তান, কানাডা এবং ইউরোপের মাটিতে ভারতের তালিকাভুক্ত একাধিক সন্ত্রাসীর(The Unknown Men 2022-23) মৃত্যু হয়েছে। এদের বেশিরভাগই লস্কর-ই-তৈবা, জইশ-ই-মহম্মদ বা খলিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। মজার বিষয় হলো, এই মৃত্যুগুলোর ধরণ প্রায় একই রকম—মোটরসাইকেলে আসা আততায়ীদের গুলিতে বা অত্যন্ত গোপনে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে।

২০২৩ সালের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা: রহস্যময় মৃত্যুর মিছিল (The Unknown Men 2022-23)
১. খাজা শাহিদ (৬ নভেম্বর ২০২৩): লস্কর-ই-তৈবার এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের নীলম উপত্যকায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে অপহরণ করার পর হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
২. আকরাম গাজী (১০ নভেম্বর ২০২৩): জইশ-ই-মহম্মদের শীর্ষ স্থানীয় নিয়োগকারী আকরাম গাজীকে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা অজ্ঞাত আততায়ীরা গুলি করে হত্যা করে।
৩. মাওলানা রহিম উল্লাহ তারিক (১৪ নভেম্বর ২০২৩): করাচিতে একটি ধর্মীয় সভায় যাওয়ার পথে জইশ প্রধান মাসুদ আজহারের ঘনিষ্ঠ এই সহযোগীকে গুলি করে মারা হয়।
৪. মাওলানা শের বাহাদুর (৩ ডিসেম্বর ২০২৩): খাইবার পাখতুনখোয়ায় লস্কর-ই-তৈবার এই জঙ্গিকে একইভাবে নিকেশ করা হয়।
৫. আদনান আহমেদ (৫ ডিসেম্বর ২০২৩): করাচিতে কড়া নিরাপত্তার মাঝেও লস্কর-ই-তৈবার এই অপারেশনাল কমান্ডারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। আদনান মুম্বাই হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিত ছিল।
৬. শাহিদ লতিফ (১১ অক্টোবর ২০২৩): পাঠানকোট বিমানঘাঁটি হামলার মূল চক্রী শাহিদ লতিফকে শিয়ালকোটের একটি মসজিদে নামাজের সময় গুলি করে হত্যা করা হয়।
খলিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মৃত্যু
৭. হরদীপ সিং নিঝর (১৯ জুন ২০২৩): কানাডার সারে এলাকায় একটি গুরুদ্বারের সামনে নিঝরকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনাটি ভারত ও কানাডার মধ্যে চরম কূটনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে।
৮. অবতার সিং খান্ডা (১৬ জুন ২০২৩): লন্ডনের একটি হাসপাতালে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় খলিস্তানি লিডার খান্ডোর। পরিবারের দাবি তাকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল, যদিও মেডিকেল রিপোর্টে ক্যান্সারের কথা বলা হয়।
৯. পরমজিৎ সিং পানজওয়ার (৬ মে ২০২৩): লাহোরে মর্নিং ওয়াকের সময় মোটরসাইকেলে আসা বন্দুকধারীরা তাকে খতম করে। সে খলিস্তান কমান্ডো ফোর্সের প্রধান ছিল।

দাউদ ইব্রাহিম: মৃত্যু না কি ধোঁয়াশা? (The Unknown Men 2022-23)
১৯৯৩ সালের মুম্বাই বিস্ফোরণের মূল হোতা এবং ডি-কোম্পানির ডন দাউদ ইব্রাহিমকে নিয়ে রহস্যের শেষ নেই। ২০২৩ সালের শেষ দিকে খবর রটে যে, করাচির এক হাসপাতালে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছে।
বিষপ্রয়োগের তত্ত্ব: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করা হয় যে, দাউদকে কেউ খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। এরপর করাচিতে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা জল্পনাকে আরও উসকে দেয়।
পাকিস্তানের অবস্থান: পাকিস্তান বরাবরই দাউদের সে দেশে থাকার কথা অস্বীকার করে এসেছে। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দাউদ করাচির ক্লিফটন এলাকায় কড়া নিরাপত্তার মাঝেই বসবাস করে। দাউদের মৃত্যুর খবরটি এখনও কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র দ্বারা নিশ্চিত করা হয়নি, তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন সে অত্যন্ত অসুস্থ এবং পঙ্গু অবস্থায় রয়েছে।

“Unknown Men”: কারা এই অদৃশ্য আততায়ী? (The Unknown Men 2022-23)
এই তালিকার প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে একটি সাধারণ যোগসূত্র আছে—অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি বা “Unknown Men”। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) দাবি করে আসছে যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বাইরের দেশে গিয়ে এই টার্গেটেড কিলিং চালাচ্ছে।
অপারেশনাল প্যাটার্ন
এই আততায়ীরা সাধারণত নিচের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করে:
• সার্ভেইল্যান্স: টার্গেটের গতিবিধি কয়েক মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করা।
• নির্ভুল নিশান: জনবহুল এলাকায় বা মসজিদের সামনে খুব কাছ থেকে গুলি করা।
• দ্রুত প্রস্থান: কাজ শেষ করে কোনো চিহ্ন না রেখেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া।

ভারতের অবস্থান: ভারত সরকার সবসময় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যকার গ্যাং-ওয়ার বা আইএসআই-এর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বলি হচ্ছে। তবে বিশ্ব মিডিয়ায় এই অজ্ঞাত ব্যক্তিদের “The New Guardians of Security” হিসেবেও অনেকে ব্যাখ্যা করছেন।
পুরনো কিছু উল্লেখযোগ্য মৃত্যু (২০২২-২০২৩) (The Unknown Men 2022-23)
১০. জহুর মিস্ত্রি (১ মার্চ ২০২২): কান্দাহার বিমান অপহরণ কাণ্ডের অন্যতম অপরাধী জহুর মিস্ত্রিকে করাচিতে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করা হয়।
১১. রিপুদামান সিং মালিক (১৪ জুলাই ২০২২): এয়ার ইন্ডিয়া কনিষ্ক বোমা হামলার আসামি রিপুদামানকে কানাডায় হত্যা করা হয়।
১২. সৈয়দ খালিদ রাজা (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩): আল-বদর মুজাহিদিনের প্রাক্তন কমান্ডারকে করাচিতে তার বাড়ির সামনে গুলি করা হয়।
১৩. আবু কাসিম কাশ্মীরি (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩): লস্কর-ই-তৈবার এই শীর্ষ কমান্ডারকে পাক-অধিকৃত কাশ্মীরের রাওয়ালকোটের একটি মসজিদের ভেতরে নামাজের সময় গুলি করে হত্যা করা হয়। সে ২০০৬ সালের মুম্বাই ট্রেন বিস্ফোরণের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী ছিল।
১৪. সর্দার হোসেন আরাইন (১ আগস্ট ২০২৩): লস্কর-ই-তৈবার সিনিয়র সদস্য এবং হাফিজ সাঈদের ঘনিষ্ঠ এই জঙ্গিকে করাচিতে তার বাড়ির সামনেই গুলি করে নিকেশ করা হয়।
১৫. বশির আহমেদ পীর (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৩): হিজবুল মুজাহিদিনের এই লঞ্চিং প্যাড কমান্ডারকে রাওয়ালপিন্ডিতে একটি দোকানের সামনে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। সে কাশ্মীরে অনুপ্রবেশের মূল হোতা ছিল।
১৬. সৈয়দ নূর শালোবার (৪ মার্চ ২০২৩): খাইবার পাখতুনখোয়ায় এক রহস্যময় হামলায় মারা যায় এই জঙ্গি নেতা। সে উপত্যকায় ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র পাচারের কাজ দেখাশোনা করত।
১৭. আইজাজ আহমদ আহাঙ্গার (১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩): আফগানিস্তানের কাবুলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এই আইএস (IS) ক্যাডারকে। সে কাশ্মীরে আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করার জন্য কুখ্যাত ছিল।
১৮. লখবীর সিং রোডে (২ ডিসেম্বর ২০২৩): খলিস্তান জিন্দাবাদ ফোর্সের এই প্রধান এবং ১৯৮৫ সালের এয়ার ইন্ডিয়া বোম্বিংয়ের মাস্টারমাইন্ড পাকিস্তানে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে বলে দাবি করা হয়, তবে তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অনেক রহস্য রয়ে গেছে।
১৯. জিয়াউর রহমান (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩): লস্কর-ই-তৈবার এই গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে করাচিতে অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ীরা গুলি করে মারে।
২০. সুখদুল সিং ওরফে সুখা দুনিকে (২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩): কানাডার উইনিপেগ শহরে লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং-এর সাথে গ্যাং-ওয়ারে সুখা খুন হয় বলে দাবি করা হয়। সে খলিস্তানি আন্দোলনের বড় অর্থদাতা ছিল।
২১. হরবিন্দর সিং সান্ধু ওরফে রিন্ডা (১৯ নভেম্বর ২০২২): পাকিস্তান থেকে মাদক ও অস্ত্র পাচারের এই মূল হোতাকে লাহোরের একটি হাসপাতালে রহস্যজনকভাবে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। গোয়েন্দাদের মতে, তাকে বিষপ্রয়োগ করা হয়েছিল।

Suvendu: হিন্দু ও মুসলিম উভয়কে একসাথে আঘাত ও অসম্মান করছেন মমতা | Bengal Liberty@SuvenduWB @MamataOfficial @BJP4Bengal #SuvenduAdhikari #bjpwestbengal #westbengalbjp #MamataBanerjee pic.twitter.com/19Zww1EnVa
— Bengal Liberty (@bengalliberty1) March 21, 2026

ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব (The Unknown Men 2022-23)
এই ধারাবাহিক মৃত্যুগুলো একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, সন্ত্রাসীদের জন্য তথাকথিত “নিরাপদ স্বর্গরাজ্য” আর নিরাপদ নেই। হোক সেটা করাচির সুরক্ষিত গলি বা কানাডার রাজপথ—সন্ত্রাসীদের বিচার এখন আদালতের বদলে অজ্ঞাত বুলেটের মাধ্যমে হচ্ছে বলে মনে করা হয়।
এই “অজ্ঞাত আততায়ী” তত্ত্বটি এখন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা মহলে একটি মিথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ একে দেখছেন ভারতের আক্রমণাত্মক নীতি হিসেবে, আবার কেউ মনে করছেন এটি অপরাধী জগতের অভ্যন্তরীণ বিবাদের ফল। তবে কারণ যাই হোক, ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার বড় একটি অংশ এখন ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে।
দাউদ ইব্রাহিম হোক বা হাফিজ সাঈদ—সবার মনেই এখন এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। কে জানে, হয়তো পরের টার্গেটের জন্য কোনো এক অন্ধকার গলিতে অপেক্ষা করছে সেই “অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি”।
আরও পড়ুন :
Lyari Operation 2012: ২০১২-এর লিয়ারি অপারেশন: করাচির ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়
