Bangladesh Independence Day
Bengal Liberty Desk: আজ, ২৬ মার্চ, বাংলাদেশের ৫৬তম মহান স্বাধীনতা দিবস। এ দিনটি আমাদের জাতীয় জীবনের গৌরব, আত্মত্যাগ ও মুক্তির প্রতীক। ১৯৭১ সালের এই দিনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নৃগোষ্ঠী মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার অমোঘ পথে যাত্রা শুরু করে। দেশবাসী জীবনপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তারপর দীর্ঘ ন’মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় আমাদের চূড়ান্ত বিজয়। লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। আমরা

অর্জন করি নিজস্ব জাতীয় পরিচিতি। অভ্যুদয় ঘটে জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের। তাই স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন গৌরবের, তেমনি বেদনারও। আজ এই মহান দিনে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান-কে, যিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়ে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের; যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলাদেশ। আমরা শ্রদ্ধা জানাই রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাসহ সম্ভ্রম হারানো মা-বোনদের; যারা আমাদের পরম গর্বের স্মারক। শ্রদ্ধা জানাই একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে বিভীষিকার শিকার পূর্ব বাংলার জনগণকে; যারা বাধ্য হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং এরই ধারাবাহিকতায় এগিয়ে চলে মুক্তিসংগ্রাম। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ (Bangladesh Independence Day)।
১৯৭১-এর চেতনা থেকে আজকের বাংলাদেশ (Bangladesh Independence Day)

দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। ‘৭১’-এর মুক্তিযুদ্ধ কেবল বাঙালির ইতিহাসেই নয় পৃথিবীর সমসাময়িক ইতিহাসেও বড় একটি ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী নিয়ে অনেকেই লিখেছেন, লিখছেন এবং বলেছেন, বলছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্মৃতিচারণমূলক বইয়ের সংখ্যাও কম নয়। ১৯৭১ সালে আমি তখন ছোট। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সেভাবে ধারণ করতে পারিনি। তখন রেডিওতে জয় বাংলা স্লোগান ও বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত হতে শুনতাম। আমি নিজেও বাসায় এই স্লোগান কন্ঠে ধারণ করতাম। বারবার শেখ মুজিব শেখ মুজিব বলে স্লোগান তুলতাম।
হাজার বছরের ইতিহাস বাঙালির। এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্য বীর সন্তানের জন্ম হয়েছে এই ভূখন্ডে। কিন্তু ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি ‘জাতিসত্তা রাষ্ট্র’- এর প্রতিষ্ঠাতা কেবল একজনই। তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠসন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিব গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার এক নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই বাঙালির অধিকার আদায়ে সচেতন ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাহচর্যে এসে রাজনীতিতে নিজের একটা স্বতন্ত্র অবস্থান গড়েন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আন্দোলনের পথ বেয়েই তিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।
স্বাধীনতার দিবসে আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও পরিবর্তনের গল্প (Bangladesh Independence Day)

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১। এই ভূ-খন্ডের দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ এবং বৈষম্যের ইতিহাস। ‘৫২’-এর ভাষা আন্দোলন, ’৫৪’ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ‘৬২’-এর শিক্ষা আন্দোলন, ‘৬৬’-এর ছয় দফা এবং ‘৬৯’-এর গণঅভ্যুত্থানের সিঁড়ি বেয়েই আসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে ভৌগোলিক ব্যবধান প্রায় ১২০০ মাইলের। ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতির ক্ষেত্রে দুটি ভূখন্ডের ব্যবধান ছিল যোজন যোজন দূরে। কেবল ধর্মভিত্তিক বন্ধনই ছিল দুই খন্ডের ঐক্য টিকিয়ে রাখার একমাত্র অবলম্বন। ভারত ভাগের শুরুতেই পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ ও বৈষম্য এই অঞ্চলের মানুষের বোধে আঘাত হানে। প্রথম আঘাতটাই আসে ভাষার উপর। পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬০ ভাগ বাঙালি হওয়ার পরও উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়। এটাই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার আদায়ে প্রথম লড়াই। ভাষার জন্য রক্ত দেয় বাঙালি। রক্তের পথ বেয়েই এ দেশের মানুষ অধিকার ছিনিয়ে আনে। এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ এবং বৈষম্যের পর বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠায় ‘স্বাধীনতা’র কোনও বিকল্প ছিল না। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল এই দীর্ঘ আন্দোলন আর সংগ্রামেরই চূড়ান্ত পর্যায়। যা সংঘটিত হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে। পাকিস্তানের ২৩ বছরের শাসনে ১৪ বছরই কারাগারে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেই ছাত্রাবস্থা থেকে আন্দোলন সংগ্রামের পথ বেয়ে তিনি হয়েছেন বঙ্গবন্ধু। আর বঙ্গবন্ধু থেকে বাঙালি জাতির পিতা। আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা নিয়েই বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্র্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি দেশপ্রেম, মেধা আর আত্মত্যাগে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে জাতিকে জাগিয়ে তোলেন, সচেতন করে তোলেন। আন্দোলনে একচ্ছত্রভাবে বেগবান ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেন। একজন রাজনীতিবিদের জীবনে এটা বিস্ময়কর সাফল্য।
‘জয় বাংলা’ থেকে আজকের উন্নত বাংলাদেশ (Bangladesh Independence Day)

নেতৃত্বের গুণেই তিনি বাঙালির মানস, মাটি আর আশা-আকাঙ্খার সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। এ দেশের মানুষ তাঁর আহ্বানেই পরিবার-পরিজন ছেড়ে দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করতে দীর্ঘ নয় মাস জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছে। মূলত ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই ঘোষণার মধ্য দিয়েই এদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে যায়। খুঁজে পায় গেরিলাযুদ্ধের কৌশল ও দিকনির্দেশনা। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধুর ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর জাতিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আপামর জনতা ‘জয়বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানকে বুকে ধারণ করে মরণপণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে। মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিপাগল বাঙালির রক্তের বন্যায় ভেসে যায় পাকিস্তানের দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও আধুনিক সেনা পরাশক্তি। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ ও বঞ্চনার পথ বেয়ে, ন’মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ আর তিন লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় আমাদের বিজয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল বিজয়ের দিন। সেদিন বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বাংলাদেশে অবস্থিত পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অধিনায়ক লে. জে. এ এ কে নিয়াজী হাজার হাজার মুক্তিকামী উৎফুল্ল জনতার সামনে প্রায় ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন। সেদিন একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত ছিলাম দীর্ঘদিন। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস একটা প্রজন্মের কাছে পৌঁছায়নি বলেই আমাদের কষ্টার্জিত স্বাধীনতা, মহান বিজয় দিবস এখনও কিছু লোককে নাড়া দেয় না। তাই বার বার প্রকৃত ইতিহাসের কথা বলতে হয়। শুধু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসই নয়, অনেকেই জানেন না আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও তার ইতিহাস। বলা চলে সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবেই তারা বড় হচ্ছেন ভিন্ন সংস্কৃতিতে। এই দেশে জন্মগ্রহণ করে এই দেশের আলো-বাতাস গায়ে মেখে ওরা বড় হচ্ছে ভিন্ন ধারায়- এটা দুঃখ জনক।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করে টানা চার মেয়াদে প্রায় ১৬ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিগত ৬ জানুয়ারি পূরণ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকারের ক্ষমতার টানা ১৪ বছর। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকারের একটানা ১৬ বছরে বদলে গিয়েছে বাংলাদেশের চিত্র। দেশের মানুষসহ গোটাবিশ্ব দেখছে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সফলতার ক্ষেত্রে রেকর্ডসংখ্যক টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ক্যারিশমেটিক লিডারশিপ। চালকের আসনে থেকে গোটা দেশের চেহারাই বদলে দিয়েছেন তিনি। সরকারের উন্নয়ন-অগ্রগতি ও সাফল্যের নিচে ঢাকা পড়ে গিয়েছে অতীতের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ও সাম্প্রদায়িক নেতিবাচক রাজনীতির ইতিহাস। দেশের মাটিতে কুঁড়েঘর, ছনের ছাউনি কিম্বা বিদ্যুতহীন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশের সেই চিত্র এখন কেবলই ইতিহাস, নিয়েছে জাদুঘরে ঠাঁই। দেশের শতভাগ মানুষের ঘরে এখন বিদ্যুতের রোশনাই, সর্বত্র পাকারাস্তা, পুল-ব্রিজ-কালভার্ট, ফ্লাইওভার, এলিভেটেডে এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মার বুক চিড়ে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলি টানেল, মেট্রোরেল এসবই বর্তমানে বাংলাদেশের বদলে যাওয়ার বাস্তব চিত্র। দেশের এই সত্যিকারের বদলে যাওয়ার প্রধান রূপকারই হচ্ছেন শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার হাত ধরে পাহাড়ে শান্তিচুক্তি, ভারতের সঙ্গে গঙ্গার জলচুক্তি, সিটমহল সমাধান হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ সাড়ে ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা বাংলাদেশকে দিয়ে ভারতের সঙ্গে নতুন সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত। জাতির পিতার কন্যার হাত ধরে ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতিতে এসেছে গুণগত পরিবর্তন। তাঁর উদ্যোগে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত হতদরিদ্র, অসহায়, বয়স্ক নারী-পুরুষ, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, প্রতিবন্ধীরা মাসিক ভাতা পাচ্ছেন।
আরও পড়ুন-
Women Empowerment in Bangladesh: ঘরের শ্রম থেকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত গড়ছে নারীসমাজ
স্বাধীনতা দিবস(Independence Day of Bangladesh): বাঙালির রক্তে লেখা ইতিহাস

কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোটা আন্দোলনের নামে যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেশবাসী দেখল তা দেশ ধ্বংসের আলামত। এর আড়ালে দেশি-বিদেশি নানা স্বার্থ ও স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি জামায়াত-শিবির ও জঙ্গীদের প্রভাব কাজ করেছিল। আমরা দেখেছি যখন কোনও আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন সেটি তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। একটি নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে উৎখাত করা হয়েছে। দখলের দায়িত্বে থাকা মানুষেরা গত ২২ মাসে দেশকে চরমভাবে ধ্বংস করেছে। লুটপাট করে দেশে অর্থনীতিসহ দেশের সামাজিক খাতকে শেষ করে দিয়েছে। যা একটি পিছিয়ে পড়া পরাধীন বাংলাদেশের ছবি। পরাধীনতার ছোবল থেকে জনগণের মুক্তি অনিবার্য (Bangladesh Independence Day)।
