Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery
Bengal Lliberty, বিট্টু রায়চৌধুরী: ২০২৩-এর ডিসেম্বর মাস। গোটা দেশের মিডিয়া রাম মন্দির নিয়ে মেতে উঠেছে। ৫০০ বছর পর শ্রী রামচন্দ্র রাজনৈতিক বনবাস কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরছেন। তাই, মিডিয়া কর্মী হিসেবে ৭-৮ দিনের জন্য আমি পৌঁছে গিয়েছিলাম সরযূ নদীর তীরে অবস্থিত রামরাজ্যে। টেলিভিশনে মন্দির নির্মাণকে কেন্দ্র করে বাম, ডান এবং মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গরম বাক্যবিনিময় অব্যাহত। অন্যদিকে, অযোধ্যা ধামে দিন-রাত মিলিয়ে তাপমাত্রার পারদ ৭-৮ ডিগ্রির মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। প্রত্যহ মধ্যরাত্রি থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় ঢেকে থাকছে গোটা ‘রামপথ’। যে রাস্তা ধরে সোজা পৌঁছে যাওয়া যায় ফৈজাবাদে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)। বছরের শেষ দিন রাজনীতি এবং ইতিহাসের টানে আমিও পৌঁছে গিয়েছিলাম সেখানে। কারণ, শেষ জীবনে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) না-কি সন্ন্যাসী ছদ্মবেশে ফৈজাবাদেই ছিলেন (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)!

নেতাজি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) আবার সন্ন্যাসী? ছদ্মবেশ? বেঁচে ছিলেন সুভাষ? ফিরেছিলেন দেশে? প্রশ্নগুলো আজও দিকে-দিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু, উত্তর নেই। যাই হোক, হেঁয়ালি ছেড়ে প্রসঙ্গে আসি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
রূপ বদলে ব্রিটিশদের বোকা বানিয়েছেন। যুদ্ধবিমান, ডুবোজাহাজে চেপে বছরের পর বছর ধরে ইংরেজদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) চালিয়ে গিয়েছেন। হিটলারের ‘বডি ডাবল’-কে এক দেখাতেই চিনে ফেলার ক্ষমতা ছিল তাঁর। জাতীয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে জ্ঞানের প্রশ্ন যদি আসে, সেই সময়ে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) ধারে-কাছে খুব কম ভারতীয়-ই স্থান পেয়েছেন। আজাদ হিন্দ ফৌজ, এশিয়ান লিবারেশন আর্মি পরিচালনা করা, গুপ্তচর মোতায়েন, আর কত বলব! ঋষি অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দকে নেতাজি গুরু মানতেন। আর, নেতাজিকে আদর্শ ভাবতেন তামিল জাতীয়তাবাদী গেরিলা (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) নেতা প্রভাকরণ।
পার্ট ১. (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)

গুমনামি বাবার (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) তত্ত্বটা এলো কীভাবে, সেই দিকে সামান্য আলোকপাত করা যাক। অনেকেই বিশ্বাস করেন, নেতাজি পদে-পদে ছদ্মবেশ ধারণ করে ব্রিটিশদের ফাঁকি দিয়েছেন, নাজেহাল করে রেখে দিয়েছিলেন। তাই, তাঁর মৃত্যুর প্লট এত কাঁচা হতে পারে না। একটা নতুন স্ক্রিপ্ট তৈরি করে পুনরায় অন্তর্ধানের পথে হেঁটেছেন তিনি। কারণ, ওনার অনেক কাজ বাকি। এই বিষয়গুলোই মূলত নেতাজির (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) জীবিত থাকার সম্ভাবনা উস্কে দিয়েছিল। অবশ্য, এর যথেষ্ট কারণও রয়েছে। যেমন― ১৯৪৫-এর ১৮ আগস্ট তাইহকুতে যে বিমান দুর্ঘটনার (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) প্রসঙ্গ বারবার উঠে এসেছে, তার কোনও সঠিক আলোকচিত্র বা প্রমাণ মেলেনি। নেতাজির মৃত্যু সংক্রান্ত কোনও শংসাপত্র (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) ছিল না। হাবিবুর রহমান তাঁর বয়ানে যা বলেছিলেন, সেটার ওপর ভিত্তি করেই দেশের বহু মানুষ ভেবে নিয়েছিলেন, নেতাজি মৃত। কিন্তু, প্রমাণ কই? এরই মধ্যে গান্ধিজি নেতাজিভবনে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে বসু পরিবারকে সুভাষের শ্রাদ্ধ না-করার জন্য অনুরোধ করলেন। ব্যাস, নেতাজির (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আরও বৃদ্ধি পেলে।

তা-হলে কোথায় গেলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)? উঠে এলো একের পর এক থিওরি। কেউ বললেন, তিনি রাশিয়া গিয়েছিলেন। ওখানেই তাঁকে নেহরু এবং স্ট্যালিন ষড়যন্ত্র করে হত্যা করেছেন। কারণ, নেহরু জানতেন, নেতাজি ফিরলে তিনি আর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। তাঁকে সিংহাসন ছেড়ে দিতে হবে। তাই, স্ট্যালিন সুভাষের জুজু দেখিয়ে নেহেরুকে সোভিয়েতের পুতুল হয়ে থাকতে চাপ দিতে থাকেন। ভারত সোভিয়েত ঘেঁষা হয়ে না-থাকলে নেতাজিকে ভারতে পাঠিয়ে নেহরুকে মসনদচ্যূত করা ছিল জোসেফ স্ট্যালিনের বাঁ-হাতের খেল। বলা বাহুল্য, জওহরলাল নেহরুর সময়কালে এ-দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থাটা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল। যদিও, ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের শরিক হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিতর্কের ইতিও খুব সহজে টেনে দেওয়া যায়। আর, নেহরুর সঙ্গে সুভাষ দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে, দু’জনের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য থাকলেও একে অপরকে প্রকাশ্যে অসম্মান করেননি। নেতাজি তাঁর আজাদ হিন্দ ব্রিগেডগুলোর মধ্যে একটির নাম রেখেছিলেন, ‘নেহরু ব্রিগেড’। এবং, নেতাজির মৃত্যুর পর নেহরু তাঁকে জাতীয় নায়ক (ন্যাশনাল হিরো) বলে সম্মোধনও করেন। এছাড়াও, লাল কেল্লাতে শাহ নওয়াজ খান, গুরবকশ সিং ধিল্লন এবং প্রেম কুমার সহগাল, এই ৩ আই.এন.এ কর্তার ট্রায়ালের বিষয়টা সামনে আসতেই নেহরুর হস্তক্ষেপে কংগ্রেস ‘আই.এন.এ ডিফেন্স কমিটি’ গঠন করে। যার সদস্য ছিলেন খোদ পণ্ডিত নেহরু। ‘‘Association of Asian studies’’ ওয়েবসাইটে ‘Trial at the Red Fort 1945-1946: The Indian National Army and the End of the British Raj in India’ শীর্ষক লেখায় গোটা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য মিলবে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।

নেহরুর সঙ্গে সুভাষের (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) সম্পর্ক আদৌ তলানিতে ছিল কি-না, সে সম্পর্কে পোক্ত কোনও প্রমাণ নেই। বা রাখা হয়নি। কারণ, আজকালকার মতো কেউ কাউকে প্রকাশ্যে গালাগালি, কটাক্ষ করেননি! কিন্তু, কংগ্রেস যে নেতাজির পিছনে ছুরি মেরেছিল, এবং নেহেরু ও গান্ধি— এই দু’জন-ই যে ষড়যন্ত্রের মূল কান্ডারি, তার শতকোটি প্রমাণ ইতিহাস ঘাটলেই মিলবে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
বিজেপি নেতা এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ববিদ সুব্রামানিয়ান স্বামীর দাবি, সুভাষ ১৯৪৫ সালে মারা যাননি। তিনি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। সেখানে নেহরু এবং স্ট্যালিন, উভয় মিলে নেতাজিকে হত্যা করেছিলেন (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
কারও মতে আবার, বোস (নেতাজি) সোভিয়েতে পালিয়ে স্ট্যালিনের হয়ে গোপনে কাজ করছিলেন। সেই সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) তাসখণ্ডে নেতাজিকে দেখে ফেলেন। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় দু’জনের ছবিও ওঠে! অদ্ভুতভাবে, তারপরই শাস্ত্রীজির রহস্যজনক মৃত্যুর দেখি আমরা। খুব অবাক লাগে যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশে মারা গেলেন, কিন্তু কোনও ময়নাতদন্ত হ’ল না! এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করতেই হচ্ছে, যে ফটোগ্রাফটি প্রকাশ্যে এসেছে, তা-নিয়ে গত ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’-তে ‘Face-mapping shows man with Lal Bahadur Shastri at Tashkent could be Netaji Subhas Chandra Bose’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

রাশিয়া ছাড়াও আরও বেশকিছু তত্ত্ব সামনে এসেছে। বিমান দুর্ঘটনার গপ্প ফেঁদে নেতাজি চিনে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) যান। সেখানে মাও সেতুঙয়ের সঙ্গে দেখা করেন। গড়ে তোলেন, এশিয়ান লিবারেশন আর্মি। এই চিনে-ই ১৯৫০ সালে নেতাজির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় মুত্থারালিঙ্গম থেভরের (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)। এই বিষয়টা নিয়ে প্রথক একটি ভিডিও Bengal Liberty-র তরফে আমি করেছি। আপনারা চাইলে ভিডিওটি দেখতে পারেন। তাহলে যে নেতাজি রহস্য নিয়ে কিছুটা হলেও আপনাদের জট কাটতে পারে। যাই হোক, আসি আলোচনার পরের অংশে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
আন্তর্জাতিক স্তরের নেতাজি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) নানা রাজনৈতিক সমস্যা মেটাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। যেমন― ১৯৫২ সালে কোরিয়া যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেন তিনি। ’৬২-র ভারত-চিন যুদ্ধে নেতাজি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) লাল ফৌজকে নেতৃত্ব দেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার বিরুদ্ধে হো-চি-মিনের গেরিলাদের যুদ্ধ করার নীল নকশা বাতলে দেন। ১৯৬৬-র তাশখন্দ চুক্তিতে বড় ভূমিকা ছিল সুভাষের। আগেই বলেছি, সেই চুক্তিকালে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যু হয়। ’৭১-এর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদেরও সাহায্য করছিলেন বোস (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।

আরেকটা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলছে, নেতাজি সাইবেরিয়া পালিয়ে যান। সেখানে স্ট্যালিনের হয়ে কিছুদিন কাজ করার পর ’৫০-এ চিন-তিব্বতে চলে আসেন। এশিয়ান লিবারেশন আর্মির ভেঙে তন্ত্রসাধনা এবং যোগচর্চায় মনোনিবেশ করেন। তারপর সন্ন্যাসী ছদ্মবেশে নেপালের পথ দিয়ে ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রবেশ করেন। তারপর থেকে কেউ তাঁকে ভগবানজি বলে ডাকতেন, কারও কাছে তিনি আবার গুমনামি বাবা। মূলত, ১৮৮৫ সাল থেকে এই থিওরিটা নিয়ে চর্চা শুরু হয়।
পর্ব ২ (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)
নেতাজির বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আগে কমিশন এবং কমিটিগুলোর রিপোর্ট, সঙ্গে তাইওয়ান ফাইল নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। নানা সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য জানান দিচ্ছে, ১৯৪৫ থেকে এখনও পর্যন্ত ১১টি তদন্ত কমিটি এবং কমিশন নেতাজির মৃত্যু রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, জাপান, তাইওয়ান, স্বাধীন ভারত― প্রত্যেকেই জানার চেষ্টা করেছে যে, নেতাজি জীবিত না-কি মৃত (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
- ১৯৪৬ সালে লর্ড মাউন্টব্যাটনের ইন্টেলিজেন্স অফিসার জন ফিগেস তদন্ত শুরু করেন। ২৫ জুলাই ১৯৪৬-এ রিপোর্ট জমা পড়ে।
‘ফিগেস রিপোর্ট’-এর দাবি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)―
১) ১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এ বিমান দুর্ঘটনা ঘটে।
২) নেতাজি ওই প্লেনেই বসেছিলেন।
৩) ঘটনার দিন স্থানীয় একটি মিলিটারি হাসপাতালে
সুভাষ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
৪) তাইহোকুতেই তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
৫) টোকিওতে অস্থিভস্ম নিয়ে যাওয়া হয়।
যদিও রিপোর্টে স্পষ্টত উল্লেখ ছিল, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে পরোক্ষ প্রমাণ ছাড়া কিছুই মেলেনি।
- নেতাজির মৃত্যু রহস্য উন্মোচনের জন্য ১৯৫৬ সালে স্বাধীন ভারত সরকার দ্বারা শাহ নওয়াজ কমিটি গঠন করা হয়। যার সদস্য ছিলেন যথাক্রমে শাহ নওয়াজ খান, এস.এন মৈত্র এবং নেতাজির দাদা সুরেশচন্দ্র বসু।
কমিটির দাবি―
১) বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে।
২) তাইহোকুতেই নেতাজির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়।
৩) অস্থিভস্ম টোকিওর রেজকোজি মন্দিরে রাখা আছে।
শাহ নওয়াজ কমিটি তাইওয়ান না-গিয়ে কার্যত ফিগেস রিপোর্টকেই নতুনভাবে ব্যাখ্যা করল। ঠিক যেন, ‘অ্যান ওল্ড ওয়াইন ইন অ্যা নিউ বোতল!’

শাহ নওয়াজ কমিটির পেশ করা ১৮১ পাতার চূড়ান্ত রিপোর্টে সুরেশচন্দ্র বসু সই করেননি। তাঁর অভিযোগ ছিল― ‘‘গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এবং তথ্য লুকিয়ে দিচ্ছেন শাহ নওয়াজ, নেহরু। কোনও বিমান দুর্ঘটনাই ঘটেনি। নেতাজি বেঁচে আছেন।’’ এরপর তিনি পৃথকভাবে ‘Dissentient Report by Suresh Chandra Bose, Non-official Member Netaji Enquiry Committee’ নামক নথি প্রকাশ্যে আনেন। যেখানে তিনি দাবি করেন, নেতাজি জীবিত।
এখানে একটা ‘ক্লাইম্যাক্স’ আছে। ১৯৮৫ সালে নেতাজির ভাই-ঝি তথা সুরেশচন্দ্র বসুর মেয়ে ললিতা ফৈজাবাদের রামভবনে পা-রাখেন। এই বাড়িতে গুমনামি বাবা তাঁর শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘরের ভিতর গুমনামির ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো দেখে ললিতা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। জিনিসপত্র খতিয়ে দেখতে গিয়ে তাঁর চোখে পড়ে সুরেশ বসুর রিপোর্টটি। যার ওপর ললিতাদেবীর মা তথা সুরেশবাবুর স্ত্রীর হস্তাক্ষর মেলে। সেখানে লেখা― ‘‘পরম কল্যাণীর দেবর, চিরজীবেষূ, প্রাণাধিক স্নেহ, আশীর্বাদ।’’ সবটা চাক্ষুষ করে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন ললিতা। বলে ওঠেন, ‘‘এসব আমার রাঙা কাকুর (নেতাজি) জিনিস।’’

১৯৭০ সালে পাঞ্জাব হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জি.ডি খোসলার নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘খোসলা কমিশন’। ’৭৪-এ কমিশন রিপোর্ট পেশ করে। যেখানে, বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্বতেই সীলমোহর দেন খোসলা। আর, সেটা না-হওয়ারও তো কোনও কারণ ছিল না। বলতে বাধ্য হচ্ছি, এই কমিশনের মাথা জি ডি খোসলা এতটাই নিরপেক্ষ ছিলেন যে, তদন্ত চালানোর পাশাপাশি ইন্দিরা গন্ধিকে নিয়ে একটা আস্ত বই লিখে ফেলেন। এখানেই তাঁর কংগ্রেসি মানসিকতার প্রকাশ পায়। অর্থাৎ, কমিশনের রিপোর্ট যে কংগ্রেসের ন্যারেটিভকে প্রাধান্য পাবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
কিন্তু, রহস্য এখানে থেমে থাকল না। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকল নেতাজির দেশে ফিরে আসার জল্পনা।
১৯৮২-’৮৫ পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ এলাকার একটি বাড়িতে (রামভবন) ভাড়া ছিলেন গুমনামি বাবা নামে এক সন্ন্যাসী। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, নেতাজির সঙ্গে তাঁর রূপের একাধিক মিল ছিল। কথা-বার্তা, রাজনৈতিক জ্ঞান এবং ব্যবহৃত সামগ্রী, যা-কিছু দেখা, বোঝা এবং জানা গিয়েছে, তাতে করে দেশবাসীর একাংশ কার্যত বিশ্বাস করেন, নেতাজি গুমনামি বাবার ছদ্মবেশে দেশে ফিরে এসেছেন।
ভগবানজি বা গুমনামি বাবার বাড়ি থেকে যে সমস্ত সামগ্রী উদ্ধার হয়, তার সঙ্গে নেতাজির ব্যবহার করা বস্তুর একাধিক মিল পাওয়া গিয়েছে। জিনিসগুলো যথাক্রমে (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)―
১) সুভাষের পিতা জনকীনাথ বসু ও মাতা প্রভাবতীর আলোকচিত্র।
৩) ভাই-বোনদের সঙ্গে দু’টি পারিবারিক ফটোগ্রাফ।
৩) ধূমপানের তিনটি পাইপ।
৪) জার্মানি এবং ইতালির চুরুট।
৫) গোল ফ্রেমের একাধিক চশমা।
৬) জার্মানির তৈরি দূরবীন।
৭) রোলেক্স হাতঘড়ি।
৮) পোর্টেবল বেলজিয়াম টাইপরাইটার।
৯) ভারত সরকার দ্বারা প্রকাশিত দু’টি ডাকটিকিট।
১০) ভারত, চিন, তিব্বতের ওপর লেখা একাধিক বই।
১১) স্বাধীনতার আগে এবং পরের একাধিক সংবাদপত্র এবং পত্রিকা।
১২) একটি রেডিও।
১৩) জর্জ দেবব্রত বিশ্বাসের গানের রেকর্ড।
১৪) স্পুল ক্যাসেট টেপ রেকর্ডার।
১৫) শীতের স্থানে ব্যবহার করার জন্য স্টোভ।
১৬) রাশিয়ার-সহ একাধিক জায়গার ম্যাপ।
১৭) জল পরিশোধক জাপানি ফিল্টার।

গুমনামি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery) ইস্যুতে রামভবনের কর্তা শক্তি সিংয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত স্তরে কথা হয়। তিনি আমায় যা যা বলেছিলেন, তার সবটা এখানে তুলে ধরলাম। শক্তি সিংয়ের (গুমনামি বাবাকে নিজের চোখে দেখেছেন) দাবি, দলিল-দস্তাবেজ, কাগজ মিলিয়ে মোট ২,৭৬০টি নথি উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু, একটাতেও সুভাষের ‘এস’ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে, অদ্ভুতভাবে নথিগুলোর বেশিরভাগটাই নেতাজি কেন্দ্রীক। জীবনের শেষ ৩ বছর শক্তিবাবুর সঙ্গে গুমনামি বাবা মাঝে-মধ্যেই পর্দার আড়াল থেকে কথা বলতেন। ভগবানজি মা কালীর ভক্ত ছিলেন। সরস্বতীদেবী শুক্লা নামে নেপালের এক মহিলা বাবাকে রান্না করে দিতেন। বাঙালি খাদ্য তাঁর বিশেষ পছন্দ ছিল। শুক্তো খেতে ভীষণ ভালোবাসতেন। তালিকায় মাছ, মাংসও ছিল। ২৩ জানুয়ারি এবং দুর্গাপুজো, বছরে অন্তত এই দু’বার ভগবানজির সঙ্গে একটা দল দেখা করতে আসতেন। পরে জানা যায়, ওই দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের সিক্রেট সার্ভিসের কর্তা পবিত্রমোহন রায়। নির্দ্বিধায় বাংলা, হিন্দি, ইংরেজিতে বাক্যালাপ চালিয়ে যেতেন বাবা। তবে, অন্যান্য ভাষায় কথা বলার সময় বাংলার টান স্পষ্ট বোঝা যেত। ‘555’ সিগারেট সেবন করতেন। কখনও আবার পাইপ টানতেন। পছন্দ করতেন রোলেক্স ঘড়ি পরতে।
শক্তিবাবুর আরও দাবি, বাবার ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া চিঠিগুলো প্রকাশ্যে এলে অনেক রহস্যের অবসান ঘটবে। পবিত্রমোহন রায়, লীলা রায়-সহ নেতাজির পরিবারের একাধিক সদস্য গুমনামিকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন।
১৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫-তে ফৈজবাদের রামভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গুমনামি বাবা। মৃত্যুর ২ দিন পর, অর্থাৎ ১৮ তারিখ সরযূ নদীর তীরে অবস্থিত গুপ্তার ঘাট নামক একটি মিলিটারি ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ১৩ জনের উপস্থিতিতে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। যদিও, যে স্থানে দেহ সৎকার করা হয়, তার থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে প্রাচীন একটি শ্মশান অবস্থিত। সেখানে না-গিয়ে কেন নির্জন মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে দেহ দাহ করা হ’ল?
শক্তি সিংয়ের বক্তব্য, ‘‘১৬ তারিখ গুমনামি বাবার দেহান্ত হওয়ার খবর কলকাতায় পাঠানো হয়। অপেক্ষায় ছিলাম, শেষ দেখা দেখতে কেউ আসবেন। কিন্তু, তা-হয়নি। দু’দিন পর বিকেলে দেহ পোড়ানো হয়। মৃত্যুর পরও তাঁর মুখ যাতে কেউ দেখতে না-পারেন, সেই ব্যবস্থাও আমরা করেছিলাম।’’
জীবিত অবস্থায় গুমনামি বাবার কোনও ছবি, মৃত্যুর শংসাপত্র, নিথর দেহের আলোকচিত্র, কিছুই নেই। একটি মাত্র স্কেচ পাওয়া গিয়েছে, যেটি প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ওপর ভিত্তি করে আঁকা।

গুমনামির মৃত্যুর পর নেতাজির ভাইঝি ললিতা বসু দাবি তোলেন, সন্ন্যাসীর ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো সংরক্ষণ করা হোক। বিষয়টির গুরুত্ব বোঝার পর তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বীরবাহাদুর সিং আবেদনকারীদের কোর্টে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেই মতোই ললিতাদেবীরা ফৈজাবাদ জেলা আদালতে রিড পিটিশন দাখিল করেন। একইসঙ্গে গুমনামি বাবার আসল পরিচয়ও জানতে চাওয়া হয়। ১০/২/১৯৮৬-তে আদালতের নির্দেশে রামভবনে ভিতর থেকে গুমনামির ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো ২৬টি গাড়ির মাধ্যমে বের করে আনা হয়। প্রায় ১ বছর ধরে তালিকা তৈরির কাজ চলে। এই মুহূর্তে বাবার ব্যবহৃত জিনিসগুলো ফৈজাবাদের ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করে রাখা।
গুমনামী বাবার মৃত্যুর পর কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত খবর গোটা দেশে নেতাজি নিয়ে নতুন করে জল্পনা উস্কে দেয়। ২৮ অক্টোবর ১৯৮৫-তে ‘নয়া লোগ’ নামক একটি স্থানীয় সংবাদপত্র দাবি করে, গুমনামি-ই আদতে নেতাজি। তারপর, এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আরও একাধিক ফলোআপ স্টোরি প্রকাশ পেতে থাকে সংশ্লিষ্ট কাগজে। পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক অশোক টন্ডন ‘গুমনামী সুভাষ’ বইতে ‘তিরিশ বছর পর’ অংশে লিখছেন, ‘কি কারণ থাকতে পারে, ডাঃ পবিত্রমোহন রায়, প্রফেসর সমর গুহ, আশুতোষ কালী, কবিরাজ কমলাকান্ত ঘোষ, শ্রীমতি লীলা রায়, বিশ্বনাথ রায়, অমল রায়, জগজিৎ দাশগুপ্ত, কৌশলা কিশোর, জয়শ্রী পত্রিকার সম্পাদক শ্রী বিজয়কুমার নাগ— প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে গুমনামী বাবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁরা সন্ন্যাসীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। মানতেন, তিনি-ই নেতাজি সুভাষচন্দ্র।
‘জনমোর্চা’ নামক আরেকটি খবরের কাগজের সম্পাদক ১৯৮৫ সালে পবিত্রমোহন রায়ের সঙ্গে দেখা করেন। সাক্ষাৎকারে নেতাজির সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান বলেন, ‘‘সুভাষচন্দ্র বসুর খোঁজে বহু বাবার সঙ্গে দেখা করেছি। কিন্তু, কোথাও নেতাজির দেখা মেলেনি।’’ যদিও, গুমনামি বাবার ঘর থেকে যে নথিগুলো উদ্ধার হয়েছে, তার মধ্যে পবিত্রমোহন রায়ের লেখা চিঠিও মিলেছে। গুমনামি বাবা তাঁকেও চিঠি লিখতেন। যার সূত্র ধরে এফ.বি.আই-এর হস্তলেখা বিশেষজ্ঞ ব্যাগেড বলছেন, ‘‘নেতাজি এবং গুমনামি, উভয়ের হাতের লেখা এক।’’
পরিস্থিতি যখন এই পর্যায়ে জটিল আকার ধারণ করেছে, তখন আরেকটা কমিশন নেতাজির শেষপর্ব নিয়ে তদন্ত শুরু করল। উনি কি আদৌ বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন, না-কি অন্তর্ধান?
১৯৯৮-তে বিজেপি সরকারের আমলে সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি মনোজ কুমার মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে গঠন হ’ল মুখার্জি কমিশন। এখানে এতদিন ধরে বলে আসা একটা গল্পকে কার্যত খারিজ করলেন মুখোপাধ্যায়বাবু। কমিশন জানিয়ে দিল, কোনও বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি। অবশ্য, নেতাজির কি হয়েছিল, কমিশন তা প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। গুমনামি বাবার দাঁতের এবং নেতাজির পরিবারের এক সদস্যের ১ মিলিলিটার রক্ত ব্যবহার হয় ডি.এন.এ পরীক্ষার জন্য। রিপোর্ট আসে নেগেটিভ। ১ মিলিলিটার রক্ত চেয়ে মুখার্জি কমিশনের তরফে সুগত বসুর কাছেও চিঠি যায়। কিন্তু, তিনি রক্ত দিতে অস্বীকার করেন। কারণ, কৃষ্ণা, সুগত বসুদের মতো নেতাজি পরিবারের একটা অংশ মনে করেন, বিমান দুর্ঘটনাতেই সুভাষের মৃত্যু হয়েছে। তাই, গুমনামি বাবার সঙ্গে নেতাজির ডি.এন.এ-র মিল আছে কি-না, তার জন্য রক্ত অপচয় করা যাবে না!
হাতের লেখা প্রসঙ্গে মনোজ কুমার মুখোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য, উভয় সরকারের হস্তলেখা বিশেষজ্ঞর থেকে পরীক্ষা করানো হয়। গুমনামি বাবার সঙ্গে নেতাজির হাতের লেখার মিল ছিল না।’’ এছাড়াও, রামভবন থেকে উদ্ধার হওয়া গুমনামির সমস্ত ব্যবহৃত জিনিসগুলোর মধ্যে ৮৭০টি সামগ্রী কমিশন পরীক্ষা করেছে। তাও, নেতাজির আদতে কি হয়েছিল, সেই তথ্য পেশ করতে পারেনি টিম মুখার্জি। যদিও, গোপন ক্যামেরায় মনোজ কুমার মুখোপাধ্যায় কি বলেছেন, সেই প্রসঙ্গ এবার একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন। গুমনামি ইস্যুতে তাঁর একটি গোপন ভিডিও প্রকাশ্যে আসে।
যেখানে তিনি বলছেন, ‘‘উনি (নেতাজি) রাশিয়াতে গিয়েছিলেন। রাশিয়া কাছে নথি আছে। আমারদের সেটা দিল না। ওনার বাড়ি থেকে একটা ম্যাপও পাওয়া গিয়েছিল। উনি রাশিয়া থেকে ফিরে এসেছিলেন। আমি ১০০ শতাংশ নিশ্চিত, উনি (গুমনামি বাবা) হচ্ছেন নেতাজি।’’ ২০০৬ সালের মে মাসে সংসদে মুখার্জি কমিশনের রিপোর্ট জমা পড়ে। তৎকালীন কংগ্রেস সরকার সেটা বাতিল করে দেয়।

গুমনামি বাবার আরও কয়েকটা পরিচয় সামনে আসতে শুরু করে। কেউ-কেউ তাঁকে কেন্দ্রীয় আই.বি-র সদস্য বলে দাবি করেন। নেতাজির প্রকৃত মৃত্যু নিয়ে মানুষের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিতে কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা এই গুমনামি থিওরি সামনে আনা হয়। কারও মতে আবার, গুমনামি তথা ভগবানজি ওরফে পর্দাওয়ালা বাবার আসল নাম কৃষ্ণ দত্ত উপাধ্যায়। গায়ত্রী ভবনের বোর্ড অফ ট্রাস্টির সদস্য ছিলেন। টাকা-সহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে বিবাদের জেরে পণ্ডিত ব্রহ্মদেব স্বাস্ত্রীকে খুন করে ফেরার হন। তারপর গুমনামির ছদ্মবেশে নানা জায়গায় গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে শুরু করেন।
২০১০ সালে গুমনামি বাবার পরিচয় জানতে তদন্ত কমিশন গঠনের আর্জি জানান রাম ভবনের কর্তা শক্তি সিং। ২৬ জুন ২০১৬ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিষ্ণু সহায়ের নেতৃত্বে গঠন করা হয় ‘সহায় কমিশন’। রাজ্যপালের কাছে পেশ করা ৩৪৭ পাতার রিপোর্টে সহায় কমিশন জানায়, ‘‘অধিকাংশ সাক্ষীর মতে, গুমনামি বাবাই নেতাজি ছিলেন। যদিও, ওই সন্ন্যাসী নেতাজি ছিলেন কি-না, তা নিশ্চিতরূপে বলা সম্ভব নয়।’’ এই রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আনেনি উত্তরপ্রদেশ সরকার। অন্যদিকে, আমার সঙ্গে যখন শক্তি সিংয়ের কথা হয়, তখন তিনি দাবি করেন, গুমনামি বাবার চিঠিগুলো প্রকাশ্যে আনা হলে প্রমাণ হয়ে যাবে নেতাজি-ই আসলে গুমনামি (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শুভা দত্তর লেখা ‘মেজদা’ বইটার ২২ নম্বর অধ্যায়ের কিছু অংশ হু-ব-হু তুলে ধরা হ’ল। সাংবাদিক বরুণ সেনগুপ্তর জীবনীকে কেন্দ্র করে লেখা এই পুস্তকের ১৭৩-১৭৪ পৃষ্ঠায় তাঁর বোন শুভা দত্ত লিখছেন, ‘‘নেতাজিকে নিয়ে বহু আগে একটা বই লিখেছিল মেজদা। আমরা তখন ডালিমতলায় থাকি। পাতলা চটি একটা বই। তার কতটা কী বিক্রি হয়েছিল, জানি না। তবে, এটুকু বলতে পারি, পরের দিকে ওই বইয়ের একটা কপিও বাড়িতে আর পাইনি। ওই সময়ে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটে। একদিন বিকেলে তিনজন সাধু আসেন আমাদের বাড়িতে। সোজা আমাদের তিনতলায় উঠে আসেন তাঁরা। মা তখন বারান্দায় বসেছিলেন। ওঁরা কেন জানি না, মায়ের কাছে মেজদার লেখা ওই বইটা চান। মা এক কপি বই দেন তাঁদের। বিনিময়ে ওঁরা বইয়ের দামও দিতে চান। মা অবশ্য তা নেননি। রাতে মেজদা ফেরার পর মা ওঁকে সব বললেন। তাতে মেজদা দেখলাম একটু গম্ভীর হয়ে গেল। মা ওঁদের চেহারার বর্ণনা দিলেন। মেজদা মন দিয়ে শুনল। কিছু বলল না। শুধু মুখে একটা চিন্তার ছাপ দেখতে পেলাম।’’
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বইতে শুভা দত্ত আরও লিখছেন, ‘‘নেহরু সম্পর্কে শোনা একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার ভুবনেশ্বরে পার্টি কংগ্রেসের মিটিং হচ্ছে। সে-সময় মিটিংয়ের মধ্যেই না-কি নেহরু অজ্ঞান হয়ে যান। অনেকে বলেন, ওদিন এক সাধুকে দেখা গিয়েছিল সভায়। তাঁর চেহারার সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর অনেকটাই মিল। নেহরু তাঁকে দেখেই না-কি অসুস্থ হয়ে পড়েন।’’
রহস্য ক্রমে জটিল আকার ধারণ করেছে। কোটি টাকা খরচ করে গঠিত কমিটি, কমিশন কার্যত বিফল। নেতাজির কি হয়েছিল, তা-নিয়ে কারও কাছে কোনও পোক্ত প্রমাণ নেই। কাজেই, সত্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে ভরসা একমাত্র নেতাজি সংক্রান্ত অপ্রকাশিত ফাইলগুলো।
কবে কতগুলো ফাইল প্রকাশিত হয়, সেই সংক্রান্ত তথ্য (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)―
- বিজেপি সরকার ২০১৫ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ২২৫টি ফাইল প্রকাশ্যে আনে।
- ১৯৯৭ সালে দেবেগৌড়ার সরকার ৯৯০টি ফাইল প্রকাশ করে।
- ২০১২ সালে মনমোহন সরকার ১,০৩০টি ফাইল জনগণের সামনে আনে।

মোদি সরকারের প্রকাশ করা ফাইলের মধ্যে ১টি ছিল ‘ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্টস লিগ’-এর তদন্ত রিপোর্ট। ১৯৫৩-তে নেতাজির মৃত্যু নিয়ে লিগ সংশ্লিষ্ট রিপোর্টটি সরকারের কাছে জমা দেয়। যেখানে দাবি করা হয়েছিল, জাপানি সরকারের একটা অংশের ষড়যন্ত্র ছিল বিমান দুর্ঘটনায়। ইতিমধ্যে― অস্ট্রিয়া, জার্মানি, রাশিয়া, ব্রিটেন, আমেরিকা নেতাজি সংক্রান্ত বেশ কিছু ফাইল প্রকাশ্যে এনেছে। তবে, জাপান এখনও পর্যন্ত ৫টির মধ্যে ৩টে ফাইল গোপনে রেখেছে। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারও ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেতাজি সংক্রান্ত ৬৪টি ফাইল প্রকাশ্যে আনে। যদিও, এতগুলো ফাইল প্রকাশের পরও রহস্যের জট খোলেনি। উল্টে, একটা প্রশ্ন বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। কোন রাজনৈতিক কারণে জাপানের রেনকোজি মন্দিরে নেতাজির তথাকথিত অস্থিভস্মের ডি.এন.এ পরীক্ষা হচ্ছে না? সেখানে আদৌ নেতাজির চিতাছাই রয়েছে? না-কি অন্য কিছুকে ‘সুভাষের দেহভস্ম’-র নাম দিয়ে দশকের পর দশকের ধরে ধারাবাহিকভাবে মিথ্যে বলে চলেছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বগণ। বাজপেয়ীর আমলে নেতাজির মৃত্যু রহস্যের সমাধানসূত্র বের করতে মুখার্জি কমিশন গঠন হয়। আর, ২০০১-২০০২ এর মধ্যে সেই অটলজি রেনকোজি মন্দিরে গিয়ে হাজির হন! নেতাজির আবক্ষ মূর্তিতে মালা দিয়ে প্রণাম করেন। এই একবার নয়, ৭-এর দশকে তিনি বিদেশমন্ত্ৰী থাকাকালীনও ওই মন্দিরে যান অটল। এছাড়াও, জওহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধি-ও নেতাজির টানে পা-রেখেছিলেন রেনকোজিতে। এই টান কি আদৌ সুভাষের প্রতি শ্রদ্ধা? না-কি এটা জোর করে প্রমাণ করার চেষ্টা যে, বিমান দুর্ঘটনাতেই মৃত্যু হয়েছিল নেতাজির? আবারও সেই একই প্রশ্ন, কোন অজ্ঞাত রাজনৈতিক কারণে রেনকোজিতে রাখা চিতাছাইয়ের ডি.এন.এ পরীক্ষা হচ্ছে না? উত্তর কেউ দেবে না।
‘তাইওয়ান ফাইল’ স্পষ্ট জানান দিয়েছে, ১৮ আগস্ট কোনও বিমান ওড়েইনি। যে প্রসঙ্গ মুখার্জি কমিশন স্পষ্ট করে তার রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। সাংবাদিক এবং নেতাজি গবেষক বরুণ সেনগুপ্ত-ও এই ‘তাইওয়ান ফাইল’-এর কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। এই ফাইল প্রকাশ্যে আনলেই বিমান দুর্ঘটনার তত্ত্ব খারিজ হতে বাধ্য। যদিও, ভারত সরকার কোন অজ্ঞাত কারণে এই ফাইল প্রকাশ করছে না, তা আমাদের জানা নেই।
২৩ জানুয়ারি সুভাষের স্মৃতিচারণ করে বিশ্ববাসী। তাঁর কাহিনি ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলে, কলেজে পড়বে, খাতায় লিখবে। কিন্তু, এই মানুষটার শেষ জীবনে কি ঘটেছিল, তা আমরা জানতে পারব না। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে এই রহস্য হয়তো রহস্যই থেকে যাবে। জয় হিন্দ (Netaji Subhas Chandra Bose Death Mystery)।
