Bengal Liberty : ‘আমি ফিরে এসেছি’- এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে লেগে গেল ১৯ বছর! চোখে জল, মনে অভিমান, তবু দু’হাত ভরা ভালোবাসা নিয়েই প্রাণের শহর কলকাতায় ফিরলেন তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasreen)। রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে তাঁর আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের ভাষণ যেন শুধু একজন লেখিকার ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কাহিনি নয়, বরং নির্বাসন, স্মৃতি, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকল। প্রায় দু’দশকের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। শুক্রবার কলকাতায় ফিরে শনিবার রবীন্দ্র সদনের ‘ফেরা’ অনুষ্ঠানের মঞ্চে আবেগে ভাসলেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। নিজের ফিরে আসার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বারবার উঠে এল হারিয়ে ফেলা ঠিকানার যন্ত্রণা, নির্বাসনের দীর্ঘ ১৯ বছর এবং কলকাতার প্রতি অমলিন ভালোবাসার কথা (Taslima Nasreen)। একইসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানিয়ে অতীতের বাম সরকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর কথায়, “অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, কারা খুলল।”

১৯ বছরের যন্ত্রণার বিস্ফোরণ (Taslima Nasreen)
রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তসলিমা জানান, কলকাতাকে তিনি কোনওদিন মন থেকে হারাননি। শুধু ফিরে আসার পথ বন্ধ ছিল। আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি কতবার মনে মনে প্রশ্ন করেছি কলকাতাকে, আমি তোমার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হল? তবে আজ আমি উত্তর চাইতে আসিনি। আজ বলতে এসেছি, আমি ফিরে এসেছি।” তিনি আরও বলেন, “আমার চোখে জল আছে, মনে অভিমান আছে। কিন্তু দু’হাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। চলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝের ১৯ বছর আমাকে কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।” দীর্ঘ নির্বাসনের কথা স্মরণ করে লেখিকার কণ্ঠে ধরা পড়ে হারিয়ে ফেলা ঠিকানার বেদনা। তাঁর ভাষায়, “আমি কলকাতায় ফিরে এসেছি-এই একটি বাক্য উচ্চারণ করতে আমার ১৯ বছর লেগে গেল। প্রতিদিন একটি করে ঠিকানা হারানোর যন্ত্রণা অনুভব করেছি আমি।”

“ইতিহাস মনে রাখে”,বাম সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, শুভেন্দুকে ধন্যবাদ (Taslima Nasreen)
নিজের বক্তব্যে তসলিমা অতীতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও তুলে ধরেন। ২০০৭ সালে ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাসকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির জেরে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল। সেই সময় রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় ছিল এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেই অধ্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে তসলিমার মন্তব্য, “আজকের দরজা খোলা প্রমাণ করে অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে কারা দরজা বন্ধ করেছিল, কারা খুলল।” মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান তিনি। অপরদিকে অনুষ্ঠানের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, “যতবার খুশি আপনি আসবেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।” এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে কলকাতায় বারবার আসার এক নতুন আস্থা খুঁজে পেলেন লেখিকা।
আরও খবর

নির্বাসনের স্মৃতি থেকে নতুন শুরুর ঘোষণা (Taslima Nasreen)
নিজের জীবনের সঙ্গে অগস্ট মাসের গভীর সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তসলিমা। তিনি বলেন, “আজ ১ অগস্ট। আমার জন্মের মাস, আমার নির্বাসনের মাস এবং আজ থেকে অগস্টই হল আমার প্রত্যাবর্তনের মাস।” ১৯৯৪ সালের ৮ অগস্ট বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, “রাষ্ট্র আমাকে দেশ থেকে সরিয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমার ভেতর থেকে তো দেশকে সরাতে পারেনি।” ইউরোপ তাঁকে নিরাপত্তা, আশ্রয় ও নাগরিকত্ব দিলেও কখনও ‘আপনত্ব’ দিতে পারেনি বলেও জানান তিনি। তাঁর কথায়, ঘর কেবল নিরাপত্তায় তৈরি হয় না- ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি আর মানুষের ভালোবাসাই প্রকৃত ঠিকানা গড়ে তোলে।
প্রায় ২০ বছর পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু এক লেখিকার শহরে ফেরা নয়, এটি স্মৃতি, অভিমান, ভালোবাসা ও ইতিহাসের এক আবেগঘন পুনর্মিলনের মুহূর্ত, যার প্রতিটি শব্দে ধরা পড়ল হারিয়ে ফেলা সময়ের দীর্ঘশ্বাস এবং ফিরে পাওয়ার আনন্দ।

আরও পড়ুন :
https://bengalliberty.com/2026/08/01/taslima-nasrin-in-kolkata/


