নেতাজির প্রতিকৃতি-সংবলিত মুদ্রার সংবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের অনুসন্ধান
নেতাজির প্রতিকৃতি-সংবলিত মুদ্রার সংবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের অনুসন্ধান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বের আভাস

ভগবানজীর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পাওয়া সংবাদপত্রের এক ছিন্নপত্র
ভগবানজীর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পাওয়া সংবাদপত্রের এক ছিন্নপত্র

সম্প্রতি উত্তরপ্রদেশ সফরে গিয়ে আমরা তেমনই একটি দলিলের সন্ধান পেয়েছি। গবেষক কুনাল বসু, সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত এবং আমি, সৈকত নিয়োগী, ভগবানজি ওরফে গুমনামি বাবার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা ১৯৭১ সালের একটি সংবাদপত্রের কাটিং হাতে পাই। সংবাদটির শিরোনাম, ‘Notes with Netaji’s picture’। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করিমগঞ্জ সীমান্তের ওপার থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, মুক্ত বাংলাদেশ নিজস্ব মুদ্রার নোট প্রকাশ করেছে, যার একদিকে রয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ছবি। আরও বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে পাকিস্তানি মুদ্রার প্রচলন ছিল না।

সংবাদটির উপর লাল কালিতে দাগ টানা। বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে নেতাজির ছবি-সংবলিত নোটের বিবরণটিকে। ভগবানজির ব্যক্তিগত সংগ্রহে এই সংবাদটির উপস্থিতি আমাদের কাছে তাই নিছক একটি পুরনো কাগজ পাওয়ার ঘটনা নয়। বরং এটি এমন একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নেতাজির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং ভগবানজির পরিচয়-সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিতর্ক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতাজির প্রতিকৃতি কি সত্যিই কোনও স্বাধীনতাকামী বাঙালি গোষ্ঠীর মুদ্রায় স্থান পেয়েছিল? যদি পেয়ে থাকে, তবে তার পিছনে কী ছিল—শ্রদ্ধা, রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা, না কি একটি নতুন রাষ্ট্রের সংগ্রামে পূর্ববর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকারকে স্মরণ করার সচেতন উদ্যোগ?

উত্তরপ্রদেশের পুরানি বস্তিতে রাজা ময়দানে এখানে এক শেরেস্তাখানা ছিল, যেখানে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র থাকতেন
উত্তরপ্রদেশের পুরানি বস্তিতে রাজা ময়দানে এখানে এক শেরেস্তাখানা ছিল, যেখানে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র থাকতেন

কাটিংটির উপরের অংশে রয়েছে আর একটি খবর। শিরোনাম, ‘Tagore’s house at Selaidah smashed’। সংবাদে বলা হয়েছে, পূর্ববঙ্গের শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ি পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অর্থাৎ একই সংবাদপত্রের পাতায় পাশাপাশি রয়েছে দুটি সংবাদ—একদিকে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর আক্রমণ, অন্যদিকে মুক্ত বাংলাদেশের মুদ্রায় নেতাজির প্রতিকৃতি ব্যবহারের খবর। ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন! রবীন্দ্রনাথ যেখানে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের অন্যতম প্রধান প্রতীক, নেতাজি সেখানে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং আপসহীন সংগ্রামের প্রতীক। ১৯৭১ সালের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে এই দুই ব্যক্তিত্বের স্মৃতি যেন বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার দুই ভিন্ন অথচ পরিপূরক দিককে সামনে নিয়ে আসে।

সংবাদটির dateline-এ রয়েছে ‘KRISHNAGAR, APRIL 12’। অর্থাৎ ১২ এপ্রিল কৃষ্ণনগর থেকে সংবাদটি পাঠানো হয়েছিল বলে বোঝা যায়। তবে সংবাদপত্রটির নাম ও প্রকাশের নির্দিষ্ট তারিখ এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ১৯৭১ সালের এপ্রিল ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। ১০ এপ্রিল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের উদ্যোগে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে সেই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। স্থানটির নামকরণ করা হয় মুজিবনগর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হলেও তিনি তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং তাজউদ্দীন আহমদ হন প্রধানমন্ত্রী। এই সরকারই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বাংলাপিডিয়ার বিবরণে এই ঘটনাগুলির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়।

আমাদের হাতে থাকা সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছিল ১২ এপ্রিল, অর্থাৎ মুজিবনগর সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণের পাঁচ দিন আগে। এই কালানুক্রমিক তথ্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, তখনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলমান, রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে উঠছে এবং মুক্তাঞ্চলগুলিতে স্বাধীনতার প্রতীক ও পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। সংবাদে ‘Free Bangla Desh’ কথাটির ব্যবহারও সেই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি। বাংলাদেশের নিজস্ব সরকারি মুদ্রা প্রথম চালু হয় ৪ মার্চ ১৯৭২। বাংলাদেশ ব্যাংকের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দিকের নোটগুলির মধ্যে এক টাকার নোটে বাংলাদেশের মানচিত্র এবং একশো টাকার নোটে মানচিত্রের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ছিল। অতএব ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে নেতাজির ছবি-সংবলিত যে নোটের কথা সংবাদে বলা হয়েছে, সেটিকে বাংলাদেশের স্বীকৃত সরকারি মুদ্রা বলা যায় না। সেটি কোনও মুক্তাঞ্চলে ব্যবহৃত প্রতীকী নোট, স্থানীয় উদ্যোগে প্রকাশিত মুদ্রা অথবা কোনও সংগঠনের তৈরি বিশেষ নোট হতে পারে। এর প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করতে হলে মূল নোটের নমুনা, মূল্যমান, মুদ্রণপ্রণালি এবং সমকালীন অন্যান্য দলিল পরীক্ষা করা অপরিহার্য। কিন্তু এই সতর্কতা সংবাদটির গুরুত্বকে নষ্ট করে না; বরং অনুসন্ধানের ক্ষেত্রটিকে আরও নির্দিষ্ট করে।

প্রশ্ন হল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতাজির নাম ও ছবি কেন বিশেষ তাৎপর্য বহন করতে পারে? এর উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯৪০-এর দশকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্বে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ সরকার এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের মাধ্যমে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক আন্তর্জাতিক সশস্ত্র সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সিঙ্গাপুরে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেন তিনি। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নামকরণ করেন শহিদ ও স্বরাজ দ্বীপ। ১৯৪৪ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে ইম্ফল-কোহিমা অভিযানে অংশ নেয়। সামরিক দিক থেকে সেই অভিযান সফল হয়নি, কিন্তু ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের মনস্তত্ত্বে তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

আজাদ হিন্দ ফৌজের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার রাজনৈতিক বার্তা। ব্রিটিশ শাসনের অধীনে থাকা ভারতীয় সেনাসদস্যদের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে সামরিক সংগঠনের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন নেতাজি। তাঁর বাহিনীতে হিন্দু, মুসলমান, শিখ ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে লড়াই করেছিলেন। রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট গঠনের মাধ্যমে নারীদেরও সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। নেতাজির কাছে জাতীয় ঐক্য কোনও বক্তৃতার বিষয় ছিল না; তা ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের অপরিহার্য শর্ত। এই কারণেই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছিল।

১৯৪৫ সালের পর নেতাজির অন্তর্ধান ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী রহস্যের জন্ম দেয়। কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিলুপ্ত হয়নি। ১৯৪৫-৪৬ সালের আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচারকে কেন্দ্র করে কলকাতা-সহ ভারতের বিভিন্ন শহরে যে গণবিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, তা ব্রিটিশ শাসনের ভিতকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ঐতিহাসিক গবেষণায় এই বিচার এবং তার পরবর্তী সামরিক অসন্তোষকে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর আনুগত্যের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভির বিদ্রোহও সেই বৃহত্তর অস্থিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অর্থাৎ নেতাজির সামরিক অভিযান প্রত্যক্ষভাবে সফল না হলেও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব ভারতীয় স্বাধীনতার শেষ পর্যায়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়েছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এই উত্তরাধিকারের সম্পর্কও তাই নতুন করে বিবেচনা করা দরকার। পূর্ববঙ্গের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাংশে ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্নে যে অসন্তোষ জন্ম নিয়েছিল, তা ক্রমে একটি স্বতন্ত্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় সেই দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিক অধ্যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান সেই রাজনৈতিক সংকটকে মুক্তিযুদ্ধে রূপান্তরিত করে। বাঙালি তখন বুঝেছিল, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রক্ষার লড়াই শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে পৌঁছেছে।

এই সময়ে নেতাজির আদর্শের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা ছিল জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। উভয় সংগ্রামেই সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, সামরিক সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে আজাদ হিন্দ ফৌজ ও মুক্তিবাহিনীর মধ্যে সরাসরি সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা ছিল, এমন কোনও প্রমাণ বর্তমানে পাওয়া যায়নি। ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই সীমারেখা বজায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু আদর্শগত অনুপ্রেরণা ও জনমানসে নেতাজির জনপ্রিয়তার প্রশ্নটি আলাদা। সেটিই আমাদের অনুসন্ধানের মূল ক্ষেত্র।

পুরানি বস্তির রাজা ময়দানের কাছে এই পথ দিয়ে একদিন হেঁটে গিয়েছেন সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্র
পুরানি বস্তির রাজা ময়দানের কাছে এই পথ দিয়ে একদিন হেঁটে গিয়েছেন সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্র

এই প্রসঙ্গে কলকাতার ৩৮/২ এলগিন রোডের নেতাজি ভবনের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৭ সালে শিশিরকুমার বসুর উদ্যোগে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় নেতাজি রিসার্চ ব্যুরো। পরবর্তী সময়ে নেতাজির স্মৃতি, দলিল, চিঠিপত্র, আলোকচিত্র এবং ব্যক্তিগত ব্যবহারের নানা সামগ্রী নিয়ে সেখানে গড়ে ওঠে একটি সংগ্রহশালা। ১৯৭১ সালে এই বাড়িই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ বাংলাদেশের দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেতাজির পৌত্র এবং ইতিহাসবিদ সুগত বসু এই বিস্মৃত অধ্যায়ের কথা তুলে ধরেন।

সুগত বসুর বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বহু ছাত্র, কৃষক ও যুবক নেতাজি ভবনে আসতেন। তাঁরা নেতাজির সংগ্রামের ইতিহাস জানতে চাইতেন এবং সেই ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা পেতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও সেই সময় নেতাজি ভবনে এসেছিলেন বলে সুগত বসু জানান। তাঁর মা কৃষ্ণা বসুর ডায়েরিতে সংরক্ষিত একটি স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, একদিন কুষ্টিয়ার পাঁচজন যুবক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র নেতাজি ভবনে এসেছিলেন। যুদ্ধের ক্লান্তি ও হতাশা তাঁদের মুখে স্পষ্ট ছিল। কৃষ্ণা বসু তাঁদের নেতাজি সংগ্রহশালা ঘুরিয়ে দেখান। সুগত বসুর ভাষ্যে, নেতাজির জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর তাঁদের মধ্যে যেন নতুন প্রাণ ফিরে এসেছিল।

এই ঘটনাটি আমাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে নেতাজির প্রভাব কোনও রাজনৈতিক বক্তৃতা বা স্মৃতিচারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা তরুণদের কাছে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছিল মানসিক শক্তির উৎস। নেতাজি ভবনের ভূমিকা আরও প্রত্যক্ষ ছিল। শিশিরকুমার বসু ভবনের নিচতলার একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য ওষুধ এবং চিকিৎসার সরঞ্জাম সরবরাহের কাজে ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। কৃষ্ণা বসু এই কাজে বিপ্লবী বীণা দাস ভৌমিকের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন বলেও সুগত বসু ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। ফলে নেতাজির বাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্মৃতিসৌধ ছিল না; ১৯৭১ সালে তা হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে মানবিক সহযোগিতার একটি সক্রিয় কেন্দ্র।

সুগত বসু আরও জানিয়েছেন, ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষ রবিবার তিনি তাঁর বাবা শিশিরকুমার বসুর সঙ্গে নেতাজি ফিল্ড হাসপাতালে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে তাঁরা যশোর রোড ধরে সীমান্তের দিকে এগিয়ে যান এবং একসময় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। ১৯৭২ সালে শিশিরকুমার বসুর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতের কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এই ঘটনাগুলি নেতাজির পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ককে একটি বাস্তব ঐতিহাসিক ভিত্তি দেয়। বিশেষত বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বসু পরিবারের যোগাযোগ দুই বাংলার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

এখানে মনে রাখা দরকার, নেতাজির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সম্পর্ককে একরৈখিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁদের সংগ্রামের সময়কাল আলাদা, রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। কিন্তু বাঙালির জাতীয় আত্মপরিচয়, স্বাধীনতার অধিকার এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের প্রশ্নে তাঁদের ভাবনার মধ্যে কিছু মৌলিক সাদৃশ্য ছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রত্যক্ষ আদর্শগত উৎস হিসেবে নেতাজিকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও দলিলের প্রয়োজন। কিন্তু ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতাজি ভবনে আগমন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় বসু পরিবারের সক্রিয় সহযোগিতার তথ্য এই ঐতিহাসিক সম্পর্ককে অবশ্যই নতুন গুরুত্ব দেয়।

এবার আবার ফিরে আসা যাক সেই সংবাদপত্রের কাটিংটির কাছে। ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিলের সংবাদে নেতাজির ছবি-সংবলিত নোটের উল্লেখ এবং একই সময়ে নেতাজি ভবনের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার তথ্য পাশাপাশি রাখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি তরুণদের কাছে নেতাজি কি কেবল অতীতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নায়ক ছিলেন, নাকি তাঁর প্রতিকৃতি ও আদর্শকে ব্যবহার করে তাঁরা নিজেদের সংগ্রামের সঙ্গে একটি বৃহত্তর ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের যোগসূত্র স্থাপন করতে চেয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি। তবে সংবাদপত্রের কাটিংটি এবং সুগত বসুর বক্তব্য—দুটি আলাদা সূত্র থেকেই বোঝা যায়, ১৯৭১ সালে নেতাজির স্মৃতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের পরিসরে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিল।

ভগবানজির ব্যক্তিগত সংগ্রহে এই সংবাদটির উপস্থিতি তাই আরও একটি অনুসন্ধানের দাবি রাখে। লাল কালিতে চিহ্নিত অংশটি কে চিহ্নিত করেছিলেন, কখন করেছিলেন, কেন করেছিলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। সংবাদপত্রটির মূল নাম ও প্রকাশের তারিখ শনাক্ত করা গেলে আরও অনেক তথ্য সামনে আসতে পারে। করিমগঞ্জ সীমান্তের ওপারে কথিত নোটটির কোনও নমুনা বাংলাদেশের সংগ্রহশালা, ব্যক্তিগত সংগ্রহ অথবা পুরনো মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের কাছে রয়েছে কি না, তাও খুঁজে দেখা প্রয়োজন। নোটটি পাওয়া গেলে তার কাগজ, ছাপার ধরন, প্রতিকৃতির উৎস, মূল্যমান এবং মুদ্রণস্থল পরীক্ষা করে তার প্রকৃত পরিচয় নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

ভগবানজি ওরফে গুমনামি বাবার পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতেও এই দলিলটির গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে নেতাজি-সম্পর্কিত অসংখ্য উপাদানের উপস্থিতি গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। কিন্তু এই একটি সংবাদপত্রের কাটিং থেকে ভগবানজির পরিচয় সম্পর্কে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। বরং তাঁর সংগ্রহে থাকা অন্যান্য সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, নোটবই ও ব্যক্তিগত নথির সঙ্গে এই দলিলটির তুলনামূলক বিচার করা উচিত। ইতিহাসের অনুসন্ধানে কোনও দলিলকে তার প্রমাণের সীমার বাইরে নিয়ে যাওয়া যেমন অনুচিত, তেমনই সম্ভাবনাময় কোনও সূত্রকে অবহেলা করাও ঠিক নয়।

আমাদের হাতে থাকা এই কাটিংটি তাই একটি নতুন গবেষণার সূচনা। কুনাল বসু, সৌম্যব্রত দাশগুপ্ত এবং আমি সৈকত নিয়োগী এই দলিলটিকে যথাযথ তথ্য, মূল সংবাদপত্রের পরিচয় এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রসহ ভবিষ্যতে নেতাজি-সংক্রান্ত কোনও তদন্ত কমিশনের সামনে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করছি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রবীণ সংগঠক, মুদ্রা সংগ্রাহক এবং ঐতিহাসিক দলিলের রক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই নোটটির অস্তিত্ব সম্পর্কে আরও তথ্য সংগ্রহের প্রয়োজন রয়েছে।

ইতিহাসের কাছে আমাদের দাবি আবেগের নয়, প্রমাণের। তবু ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে একটি প্রতিকৃতি, একটি স্মৃতি কিংবা একটি পুরনো সংবাদপত্রের পাতাও অসাধারণ অর্থ বহন করে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ সামরিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন—এমন কোনও প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কিন্তু তাঁর আদর্শ যে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করেছিল, নেতাজি ভবন যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাস্তব সহায়তার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল এবং বসু পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ যে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার প্রামাণ্য সূত্র আমাদের সামনে রয়েছে।

তাই ১৯৭১ সালের এই সংবাদপত্রের কাটিংকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সংবাদ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি হয়তো আমাদের সামনে খুলে দিতে পারে দুই বাংলার স্বাধীনতার ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়। যে মানুষটি একদিন আজাদ হিন্দ ফৌজের পতাকা হাতে নিয়ে বলেছিলেন, স্বাধীনতা অর্জন করতে হয় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, তাঁর প্রতিকৃতি যদি সত্যিই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কোনও প্রতীকী মুদ্রায় স্থান পেয়ে থাকে, তবে তা হবে এক প্রজন্মের স্বাধীনতার স্বপ্নের সঙ্গে আর এক প্রজন্মের আত্মত্যাগের এক বিরল সংযোগ।

ভগবানজির সংগ্রহে থাকা সেই হলদে হয়ে যাওয়া কাগজটির দিকে তাকালে তাই মনে হয়, ইতিহাসের সব উত্তর হয়তো এখনও আমাদের হাতে এসে পৌঁছয়নি। কিছু উত্তর অপেক্ষা করে থাকে আরও অনুসন্ধানের জন্য। আর সেই অনুসন্ধানের পথেই হয়তো একদিন স্পষ্ট হয়ে উঠবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর স্মৃতি, প্রভাব এবং উত্তরাধিকারের প্রকৃত ইতিহাস।

Bengal Liberty