Bengal Liberty : বিশিষ্ট ভূপর্যটক শ্রী গিরীন্দ্র সরকারের লেখা ব্রহ্মদেশে শরৎচন্দ্র গ্রন্থটি যারা পড়েছেন, তারা জানবেন—লেখক গিরীন্দ্রবাবুর একটি সিয়ান্সে এসেছিলেন সুভাষচন্দ্রের পিতা জানকীনাথ বসুর বিদেহী আত্মা (Netaji Subhash Chandra Bose)। গিরীন্দ্র সরকার ছিলেন জানকীনাথ বসুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং সেই সূত্রে সুভাষচন্দ্রেরও ঘনিষ্ঠজন। আধ্যাত্মিকতার অন্যতম আধার প্রেতচর্চা। ভিক্টোরিয়ান এজ থেকেই সেই চর্চার নানা মাধ্যম নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত। মৃতের আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সিয়ান্স, প্ল্যানচেট, টেবিল-ট্যাপিং প্রভৃতি পদ্ধতি তখন পাশ্চাত্যের শিক্ষিত সমাজে যথেষ্ট আলোচিত ছিল; ভারতেও তার প্রভাব এসে পৌঁছেছিল। গিরীন্দ্র সরকারের সঙ্গে সুভাষচন্দ্রের ঘনিষ্ঠতার সূত্রে এই বিষয় নিয়ে তাঁদের আলোচনা হওয়াটা তাই একেবারে অসম্ভব নয়। জানকীনাথ বসুর বিদেহী আত্মাকে কেন্দ্র করে একটি সিয়ান্সে গিরীন্দ্রবাবুর উপস্থিতির বিবরণ এই প্রসঙ্গটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে (Netaji Subhash Chandra Bose)।

প্রেতচর্চা, আধ্যাত্মিকতা প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র (Netaji Subhash Chandra Bose)
এই ইতিহাসের উল্লেখের কারণও সেখানেই। কারণ সুভাষচন্দ্রের মতো একজন আধুনিক, যুক্তিবাদী ও রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী নেতার সঙ্গে প্রেতচর্চার প্রসঙ্গ জড়ানো অনেকের কাছেই প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। কিন্তু সুভাষচন্দ্রের ব্যক্তিত্বের অন্য একটি দিক ছিল গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসা। কৈশোর থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ঈশ্বর, আত্মা, সাধনা, ত্যাগ ও মানুষের কল্যাণ সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। গীতা, চণ্ডী, শৈব ও শাক্ত সাধনার প্রতিও তাঁর আকর্ষণের কথা জানা যায়। জীবনের নানা পর্যায়ে ধ্যান ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের উল্লেখ সমকালীন স্মৃতিতেও পাওয়া যায়। ফলে তাঁর কাছে আধ্যাত্মিকতা কোনও আকস্মিক বা পরবর্তী জীবনের বিষয় ছিল না; তাঁর চিন্তা ও জীবনদর্শনের মধ্যেই তার একটি সুস্পষ্ট ভিত্তি ছিল।
তবে আধ্যাত্মিকতা এবং প্রেতচর্চা এক বিষয় নয়। সুভাষচন্দ্র নিয়মিতভাবে প্ল্যানচেট করতেন কিংবা প্রেতচর্চায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন—এমন প্রত্যক্ষ ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সর্বসম্মতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অতএব তাঁকে নিশ্চিতভাবে ‘প্রেতচর্চাকারী’ বলে চিহ্নিত করা ইতিহাসসম্মত হবে না। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের পরিসরে পরলোক, আত্মা কিংবা অতীন্দ্রিয় জগতের প্রশ্ন একেবারেই ছিল না—এমন দাবিও সহজে করা যায় না। তাঁর সময়ের শিক্ষিত সমাজে এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা ছিল; তাঁর নিজের আধ্যাত্মিক কৌতূহলও ছিল গভীর। এই প্রেক্ষাপটেই গিরীন্দ্র সরকারের স্মৃতিবিবরণটি বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে।
আরও খবর
ভগবানজি (Netaji Subhash Chandra Bose)
এবার আসি ভগবানজি প্রসঙ্গে। ১৯৪৫ সালের আগস্টে সুভাষচন্দ্রের কথিত মিথ্যা বিমানদুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর অন্তর্ধানকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের জন্ম হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি দাবি করেছেন, নেতাজি বেঁচে ছিলেন এবং পরিচয় গোপন করে অন্যত্র জীবন কাটিয়েছিলেন। এইসব দাবির মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় অধ্যায়গুলির একটি হল অযোধ্যা-ফৈজাবাদের সন্ন্যাসী ভগবানজি, যিনি ‘গুমনামি বাবা’ নামেও পরিচিত। তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। তিনি সাধারণ মানুষের সামনে নিজের মুখ প্রকাশ করতেন না; পর্দার আড়াল থেকেই কথা বলতেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর বাসস্থান থেকে বিপুল সংখ্যক বই, চিঠি, নথি, ছবি ও নানা সামগ্রী উদ্ধার হয়। সেগুলির মধ্যে এমন কিছু উপাদান ছিল, যেগুলির সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং তাঁর পরিচিত মহলের সম্পর্কের দাবি করা হয়েছে। সেখান থেকেই প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়—ভগবানজি কি আসলে সুভাষচন্দ্র বসু?
এই দাবির পক্ষে যাঁরা দীর্ঘদিন অনুসন্ধান চালিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট সাংবাদিক শ্রী অশোক টণ্ডনের নাম উল্লেখযোগ্য। তাঁর গবেষণাধর্মী অনুসন্ধানের ভিত্তিতে তিনি বিশ্বাস করেন, ভগবানজি আর কেউ নন, স্বয়ং সুভাষচন্দ্র। তাঁর অনুসন্ধানের সূত্রেই সামনে আসে একটি প্ল্যানচেট বোর্ড। অশোকজির মতে, এই প্ল্যানচেট বোর্ডটি স্বয়ং সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের। মেরামতির জন্য এটি অযোধ্যার এক কাঠমিস্ত্রির কাছে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটি আর ফেরত নেওয়া হয়নি। অশোকজি তাঁর অনুসন্ধানের সময় এই সংবাদ পেয়ে দ্রুত জিনিসটি উদ্ধার করে সংরক্ষণ করেন। বর্তমানে সেটি তাঁর হেফাজতে রয়েছে বলে জানা যায়।

প্ল্যানচেট বোর্ড (Netaji Subhash Chandra Bose)
একটি সাধারণ কাঠের প্ল্যানচেট বোর্ড—কিন্তু ভগবানজির সঙ্গে তার সম্পর্ক সত্য হলে এর তাৎপর্য নিঃসন্দেহে গভীর। কারণ তখন প্রশ্নটি শুধু একটি বস্তু নিয়ে নয়; প্রশ্ন ওঠে, একজন রহস্যময় সন্ন্যাসীর কাছে প্ল্যানচেট বোর্ড এল কীভাবে? তিনি কি আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের কোনও পদ্ধতি অনুসরণ করতেন? প্রেতচর্চা কি তাঁর সাধনজীবনের কোনও অংশ ছিল? আর যদি ভগবানজিই সুভাষচন্দ্র হয়ে থাকেন, তবে এই বোর্ড কি তাঁর জীবনের এমন কোনও অধ্যায়ের ইঙ্গিত বহন করছে, যা এতদিন ইতিহাসের আড়ালে রয়ে গেছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও অনিশ্চিত। কোনও বস্তু কোনও ব্যক্তির ব্যবহৃত বলে দাবি করা হলেই সেই দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয় না। বোর্ডটির মালিকানা, ব্যবহারের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু রহস্যময় কোনও জীবনের অনুসন্ধানে এমন একটি বস্তু গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত যখন সেটি এমন এক ব্যক্তিকে ঘিরে পাওয়া যায়, যাঁর পরিচয় নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
ভগবানজি-রহস্য নিয়ে বিচারপতি বিষ্ণু সহায় কমিশনও তদন্ত করেছিল। বহু সাক্ষীর বক্তব্য, নথি ও উদ্ধার হওয়া সামগ্রী তদন্তের আওতায় আসে। অশোক টণ্ডন-সহ একাধিক ব্যক্তি কমিশনের সামনে তাঁদের বক্তব্য পেশ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কমিশন ভগবানজিকে সুভাষচন্দ্র বসু বলে নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠা করেনি। ফলে ইতিহাসের বিচারে ভগবানজি ও সুভাষচন্দ্র একই ব্যক্তি—এই দাবি এখনও বিতর্কের বিষয়। একইভাবে প্ল্যানচেট বোর্ডটিও যে সুভাষচন্দ্রের ব্যবহৃত ছিল, সেই দাবিকেও বর্তমানে একটি অনুসন্ধানসূত্র হিসেবেই দেখা উচিত, চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।

প্রকৃত সন্ন্যাস গ্রহণ এবং প্রেতচর্চা কি এক বিষয়? (Netaji Subhash Chandra Bose)
তবু প্রশ্নটি থেকে যায়। কারণ সুভাষচন্দ্রের জীবনে আধ্যাত্মিকতার উপস্থিতি অস্বীকার করার উপায় নেই। তিনি ছিলেন একদিকে আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তার মানুষ, অন্যদিকে ভারতীয় সাধনপরম্পরার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট এক আত্মজিজ্ঞাসু ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনে ত্যাগ, আত্মসংযম, কর্তব্য ও বৃহত্তর মানবকল্যাণের আদর্শ ছিল প্রবল। তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যেও এক ধরনের সন্ন্যাসীসুলভ কঠোরতা লক্ষ্য করা যায়। ফলে পরবর্তী কালে ‘সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র’-এর যে কিংবদন্তি তৈরি হয়েছে, তার পিছনে শুধু কল্পনা নয়, তাঁর ব্যক্তিত্বের কিছু বাস্তব বৈশিষ্ট্যও কাজ করেছে।
তবে সন্ন্যাসীসুলভ জীবনযাপন, প্রকৃত সন্ন্যাস গ্রহণ এবং প্রেতচর্চা—তিনটি এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। সুভাষচন্দ্রের আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায়, তা তাঁর অন্তর্জগতের পরিচয় দেয়; কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি প্রমাণ করা যায় না যে তিনি প্ল্যানচেট বা প্রেতচর্চায় নিয়মিত যুক্ত ছিলেন। একইভাবে ভগবানজির কাছে কোনও প্ল্যানচেট বোর্ড পাওয়া গেলে সেটিও একা তাঁর পরিচয় নির্ধারণ করতে পারে না।

প্রেতচর্চার সত্যতা নিয়ে বিজ্ঞান তার নিজস্ব প্রশ্ন রাখবে। আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব কি না, প্ল্যানচেটের অভিজ্ঞতার প্রকৃতি কী—এসবের ব্যাখ্যা মনোবিজ্ঞান, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার নিজস্ব পরিসরে ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নটি অন্যরকম: কোনও ঘটনা ঘটেছিল কি না, ঘটলে তার সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, এবং সেই ঘটনার পক্ষে কী নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে।
সুভাষচন্দ্রের ক্ষেত্রে এই অনুসন্ধান আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর জীবন ও অন্তর্ধান—দুই-ই ভারতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যগুলির মধ্যে পড়ে। তাঁর রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে অসংখ্য দলিল রয়েছে; কিন্তু তাঁর অন্তর্জগতের বহু অংশ এখনও ব্যক্তিগত স্মৃতি, চিঠিপত্র ও বিচ্ছিন্ন সূত্রের ওপর নির্ভরশীল। সেই কারণেই গিরীন্দ্র সরকারের সিয়ান্সের বিবরণ কিংবা অশোক টণ্ডনের সংরক্ষিত প্ল্যানচেট বোর্ডের মতো উপাদান কৌতূহল সৃষ্টি করে।
হয়তো প্ল্যানচেট বোর্ডটি সত্যিই কোনও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। হয়তো তার সঙ্গে ভগবানজির সম্পর্কের দাবির পিছনে আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন। হয়তো ভগবানজি সুভাষচন্দ্র ছিলেন, হয়তো ছিলেন না। ইতিহাস এখনও তার চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—সুভাষচন্দ্রকে শুধু রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর সম্পূর্ণ ব্যক্তিত্বকে ধরা যায় না। তাঁর মধ্যে ছিলেন এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসু মানুষ, যিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার নানা স্তর সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু ছিলেন।

সেই সুভাষের দিকে তাকালে তাঁর জীবনের রহস্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। রাজনীতির দৃশ্যমান ইতিহাসের বাইরে তাঁর ছিল এক নিভৃত অন্তর্জগৎ; আর সেই অন্তর্জগতের সঙ্গে যখন ভগবানজি, সন্ন্যাস, প্ল্যানচেট ও প্রেতচর্চার মতো রহস্যময় সূত্র এসে যুক্ত হয়, তখন প্রশ্নটি নতুন মাত্রা পায়।
শেষ পর্যন্ত তাই ‘সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রের প্রেতচর্চা’ কোনও সরল সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি অনুসন্ধানের একটি ক্ষেত্র। এখানে বিশ্বাস আছে, স্মৃতি আছে, দাবি আছে, বস্তুগত সূত্র আছে—কিন্তু চূড়ান্ত উত্তর এখনও অধরা। আর হয়তো এই অধরাই সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে রহস্যের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
ইতিহাস তাঁর কর্মকে সংরক্ষণ করেছে, কিংবদন্তি সংরক্ষণ করেছে তাঁর অন্তর্ধানকে, আর তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন আমাদের সামনে রেখে দিয়েছে এক গভীর প্রশ্ন—ইতিহাসের যে সুভাষচন্দ্রকে আমরা চিনি, তাঁর অন্তরের মানুষটিকে কি আমরা সত্যিই সম্পূর্ণ চিনেছি?
হয়তো কোনওদিন কোনও নতুন দলিল, বিস্মৃত স্মৃতিকথা কিংবা অজানা বস্তু সেই অন্ধকারে আলো ফেলবে। ততদিন পর্যন্ত সেই পুরনো প্ল্যানচেট বোর্ড, গিরীন্দ্র সরকারের সিয়ান্সের বিবরণ এবং ভগবানজিকে ঘিরে থাকা রহস্য আমাদের মনে করিয়ে দেবে—সুভাষচন্দ্রের রহস্য আজও বিদ্যমান
আরও পড়ুন :
https://bengalliberty.com/2026/08/21/netaji-subhash-chandra-bose-9/


