Bengal Liberty : বর্ণবৈষম্যের অন্ধকার থেকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মঞ্চ, দীর্ঘ কয়েক দশকের লড়াইয়ের স্বীকৃতি পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী নাভি পিল্লাই। শুক্রবার তাঁকে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করার ঘোষণা করল নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান দেওয়া হল তাঁকে । ৮৫ বছর বয়সি এই আইনজ্ঞের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক একটি দলিল।
বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই থেকেই উত্থান
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। বর্ণবৈষম্যের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই বেড়ে ওঠা তাঁর। সেই সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের অধিকার ছিল ভীষণভাবে সীমাবদ্ধ। বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের জন্য আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করেই আইনের জগতে নিজের জায়গা তৈরি করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে নাটাল প্রদেশে নিজস্ব আইনজীবী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রথম মহিলা হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন পিল্লাই। বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার অধিকার রক্ষার লড়াইয়েও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন নাভি পিল্লাই।
রুয়ান্ডার গণহত্যা থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা
দক্ষিণ আফ্রিকার আদালত থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় পৌঁছনোর যাত্রাপথে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন পিল্লাই। ১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপতি হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে যুক্ত অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ওই ট্রাইব্যুনালের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব সামলান তিনি। ১৯৯৮ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক মামলায় যৌন হিংসাকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে গণ্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির প্রতিষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারে এই সিদ্ধান্ত নতুন দিশা দেখায়।
আরও খবর

আন্তর্জাতিক মঞ্চে নাভি পিল্লাইয়ের সাম্প্রতিক কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ইজরায়েল ও অধিকৃত প্যালেস্টাইনি অঞ্চল নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জের তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দেওয়া। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ওই কমিশনের চেয়ারপার্সন ছিলেন তিনি। ২০২৫ সালে কমিশন গাজায় প্যালেস্টাইনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে ইজরায়েল এই অভিযোগ ও প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক এখনও যথেষ্ট গভীর।
কেন নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন নাভি পিল্লাই
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক আইনকে শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচারে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সাহস, সততা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে কমিটি। আন্তর্জাতিক আদালত ও বিচারব্যবস্থা যখন বিভিন্ন রাজনৈতিক চাপের মুখে, তখন আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের পক্ষে তাঁর দীর্ঘ লড়াই বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
এই সম্মান পাওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি সিরিল রামাফোসা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁর মতে, পিল্লাইয়ের এই স্বীকৃতি মানবিক মর্যাদা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং শান্তির প্রসারে তাঁর অবদানের এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আফ্রিকার পঞ্চম ব্যক্তি হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন নাভি পিল্লাই। পাশাপাশি, এই সম্মান পাওয়া প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকান মহিলা হিসেবেও ইতিহাস গড়লেন তিনি। আগামী ১০ ডিসেম্বর অসলোয় আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে নোবেল শান্তি পুরস্কার। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই দিয়ে যে যাত্রার শুরু, সেই যাত্রাই আজ আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠল।


