সৈকত নিয়োগী : কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুব সহজ। অথচ সেই সহজ উত্তরই কখনও কখনও দশকের পর দশক ধরে অমীমাংসিত থেকে যায় (Netaji Subhash Chandra Bose)। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অন্তর্ধান নিয়ে আমাদের ইতিহাসে এমনই এক রহস্য আজও রয়ে গেছে। ষাটের দশকে ঠাকুর বালক ব্রহ্মচারী মহারাজ গড়ে তুলেছিলেন ‘নেতাজি সুভাষ স্কোয়াড’। বাইরে থেকে দেখলে এটি ছিল মানুষের সেবার একটি সংগঠন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বিপন্ন মানুষের সাহায্য করা। কিন্তু এই কাজের ভিতরে ছিল নেতাজির কর্মাদর্শের প্রতি গভীর আনুগত্য। বালক ব্রহ্মচারী মহারাজ বিশ্বাস করতেন, নেতাজির কাজ থেমে যায়নি (Netaji Subhash Chandra Bose)। তিনি এমন কথাও বলতেন-“আমি একটা ফুল ছুঁড়লে তা নেতাজির পায়ে গিয়ে পড়বে।” কথাটি কি শুধুই ভক্তির প্রকাশ? নাকি এর পিছনে ছিল এমন কোনো তথ্য, যা তিনি প্রকাশ্যে বলতে চাইতেন না?

এই প্রশ্নের উত্তর আজও আমাদের কাছে স্পষ্ট নয় (Netaji Subhash Chandra Bose)
তবে উত্তরপ্রদেশের সেই সন্ন্যাসীর শেষ আবাসস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কিছু নোট এই পুরনো প্রশ্নটিকেই যেন আবার সামনে নিয়ে আসে। সেই নোটগুলির মধ্যে বালক ব্রহ্মচারী মহারাজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কিছু উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, অন্তত এতটুকু বোঝা যায় যে, তাঁর কাজকর্ম সম্পর্কে উত্তরপ্রদেশের সেই সন্ন্যাসীকে অবহিত করার চেষ্টা হয়েছিল।

তাহলে কি বালক ব্রহ্মচারী মহারাজের সঙ্গে ভগবানজির কোনো যোগাযোগ ছিল? (Netaji Subhash Chandra Bose)
এখানে একটু থামতে হয়। কারণ ইতিহাসে অনুমান আর প্রমাণ এক জিনিস নয়। যে বিষয়ে প্রমাণ নেই, সেখানে নিশ্চিত করে কিছু বলা ঠিক হবে না। বরং যতটুকু নথি পাওয়া যায়, যতটুকু সূত্র মেলে, ততটুকুই অনুসরণ করা উচিত।
আরও খবর
এই নোটটির হাতের লেখা নিয়ে যে দাবি রয়েছে, তা আরও কৌতূহলের। বিশ্বস্ত সূত্রের মতে, লেখাটি দমদমের পরিচিত ব্যক্তিত্ব বিশ্বনাথ রায়ের। পূর্ববঙ্গের জমিদার পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল বলে জানা যায়। তিনি ছিলেন নেতাজির একান্ত অনুরাগী। কলকাতায় হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণ আন্দোলনের সময়ও তিনি আর্থিক ও জনবল দিয়ে আন্দোলনকে সাহায্য করেছিলেন বলে জানা যায়।
নোটটি পড়লে মনে হয়, বালক ব্রহ্মচারী মহারাজ শুধু নেতাজিকে শ্রদ্ধা করতেন না, অন্তরালে থাকা সুভাষচন্দ্রের সামাজিক কাজের সঙ্গেও নিজেকে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর গড়ে তোলা ‘নেতাজি সুভাষ স্কোয়াড’-এর সদস্যদের সেই কাজে সমর্পণ করার ইচ্ছাও যেন প্রকাশ পেয়েছে।

আর এখানেই গল্পটি অন্যদিকে মোড় নেয় (Netaji Subhash Chandra Bose)
নোটে উঠে আসে বিপ্লবী বারীন্দ্রকুমার ঘোষের নাম। অগ্নিযুগের এই বিপ্লবী নেতা ছিলেন বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক। শ্রীঅরবিন্দের ছোট ভাই বারীন ঘোষ ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত থেকে বিপ্লবী আন্দোলনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি দীর্ঘ কারাবাসের শাস্তিও ভোগ করেন। পরবর্তী জীবনে তাঁর রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তায় নানা পরিবর্তন এলেও নেতাজি সুভাষচন্দ্রের প্রতি তাঁর আগ্রহ ও শ্রদ্ধার কথা বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
বালক ব্রহ্মচারী মহারাজের সঙ্গে বারীন ঘোষের ঘনিষ্ঠতার সূত্রটিই এই রহস্যের ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। নোটে ইঙ্গিত রয়েছে, বারীন ঘোষের মাধ্যমেই ঠাকুর নেতাজির সংস্পর্শে থাকা কয়েকজন সহযোদ্ধার কথা জানতে পেরেছিলেন।
কারণ বারীন ঘোষ ১৯৫৯ সালে মারা যান। ফলে নোটে যদি তাঁর মৃত্যুর পরের কোনো ঘটনার উল্লেখ থাকে, তাহলে নোটটির সময়কালও ১৯৫৯ সালের পরের। আর তখনই স্বাভাবিকভাবেই আরও একটি প্রশ্ন সামনে আসে-

বারীন ঘোষ কি জানতেন, নেতাজি দেশে ফিরে এসেছেন?তবে কি তিনি জানতেন যে সেই সুভাষচন্দ্র প্রকাশ্যে নয়, অন্য পরিচয়ে, সন্ন্যাসীর বেশে কোথাও আত্মগোপন করে আছেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানা নেই।
ভগবানজি সুভাষচন্দ্র ছিলেন—এই দাবিকে সামনে রাখলেই অবশ্য রহস্যের সমাধান হয় না। বরং তখনই আসল অনুসন্ধান শুরু হয়। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা, তাঁর কাছে থাকা নথি, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা মানুষজন এবং তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক—সবকিছুকেই গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতে হবে |

বালক ব্রহ্মচারী মহারাজের মতো একজন ব্যক্তি কেন নেতাজির নামে সংগঠন গড়েছিলেন? কেন তিনি এমন কথা বলতেন যে তাঁর ছোড়া ফুল নেতাজির পায়ে গিয়ে পড়বে? কেন তাঁর কর্মকাণ্ডের সঙ্গে উত্তরপ্রদেশের সেই সন্ন্যাসীর নাম জড়িয়ে পড়ে? আর বারীন ঘোষের সূত্রই বা কোথায় গিয়ে মেলে?এগুলো হয়তো কাকতালীয়, হয়তো নয়।
ইতিহাসের অণুবীক্ষণে এই ছোট ছোট সূত্রগুলিকে এখন সর্বতোভাবে রক্ষার প্রয়োজন। এই প্রশ্নের সমাধান সূত্র হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের পথ খুলে দিতে পারে।
উত্তরপ্রদেশের সেই সন্ন্যাসী সত্যিই সুভাষচন্দ্র ছিলেন কি না, তার উত্তর এখনো আমাদের জানা নেই | আর সেই প্রশ্নের সঙ্গে বালক ব্রহ্মচারী মহারাজ, বারীন ঘোষ এবং সেই রহস্যময় নোটের যোগসূত্র-ইতিহাসের পাতায় এক নতুন অনুসন্ধানের পথ খুলে দিয়েছে।
রহস্যের সমাধান হয়তো এখনও অনেক দূরে। কিন্তু সূত্রটি কি আমাদের চোখের সামনেই ছিল?

আরও পড়ুন :
https://bengalliberty.com/2026/08/20/jadavpur-university-2/


