ভুক্তভোগী মানুষের আর্তনাদ
ভুক্তভোগী মানুষের আর্তনাদ

এটা আন্দোলন নয়, এটা ভুক্তভোগী মানুষের আর্তনাদ

যে শ্রমিক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘাম ঝরিয়ে ইট ভাঙে, রিকশা চালায়, গার্মেন্টসে সেলাই করে বা মাঠে ধান কাটে—সে আজ রাস্তায় কেন? সে কি রাজনীতি বোঝে? সে কি ক্ষমতার অঙ্ক বোঝে? না, সে বোঝে শুধু একটা জিনিস—তার ঘরে আজ ভাত নেই, হাঁড়িতে চাল নেই। তার শিশুটা রাত থেকে কেঁদে কেঁদে খালি পেটে ঘুমিয়ে গেছে।

একজন মা যখন দেখেন তার সন্তান ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করছে আর তার হাতে দেওয়ার মতো কিছুই নেই, তখন সেই মায়ের মনে কী চলে? সেই মা কি ঘরে বসে থাকতে পারেন? পারেন না। তিনি রাস্তায় নামেন। তাঁর এই রাস্তায় নামা কি আন্দোলন? না, এটা মাতৃত্বের আর্তনাদ।

বাজারে যান, দেখুন অবস্থা কী! চালের দাম আকাশছোঁয়া। ডাল, তেল, পেঁয়াজ, আলু—যেটাতে হাত দেবেন, সেটাই আগুন। গ্যাসের দাম বাড়তি। একটা সিলিন্ডার কিনতে এখন শ্রমিকের অর্ধেক মাসের বেতন চলে যায়। যে গ্যাস দিয়ে রান্না হবে, সেটাই যদি কিনতে না পারে, তবে রান্না হবে কী দিয়ে? মানুষ কি কাঁচা চাল চিবিয়ে খাবে?

দুধের দামও চড়া। একটা শিশুর জন্য এক পোয়া দুধ কিনতে গেলেও এখন ভাবতে হয়। যে দুধ শিশুর অধিকার, যে দুধ দিয়ে তার শরীর গড়ে উঠবে, তা আজ বিলাসিতা হয়ে গেছে। একজন বাবা যখন সন্তানের জন্য দুধ কিনতে না পেরে খালি হাতে ঘরে ফেরেন, তখন তাঁর বুকের ভেতরটা কেমন করে ভেঙে যায়—তা কি আপনারা কখনো অনুভব করেছেন?
সব দিকেই শুধু বাড়তি আর বাড়তি। বিদ্যুৎ বিল বাড়তি, বাড়িভাড়া বাড়তি, ওষুধের দাম বাড়তি, বাসভাড়া বাড়তি। শুধু বাড়ে না একটা জিনিস—শ্রমিকের মজুরি। তাঁর ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের সঠিক দাম মেলে না। পাঁচ বছর আগে যে বেতন ছিল, আজও সেই বেতনই আছে। অথচ জিনিসের দাম বেড়েছে তিন-চার গুণ।

তাহলে মানুষ কী করবে? মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে। এই মৃত্যু কি স্বাভাবিক মৃত্যু? না, এটা একটা পরিকল্পিত মৃত্যু, এক ধরনের অর্থনৈতিক হত্যা। যে মানুষ দিনরাত কাজ করেও দু’বেলা খেতে পারে না, তার চেয়ে বড় অভিশাপ আর কী হতে পারে?
আপনারা বলেন, দেশ উন্নত হচ্ছে। ফ্লাইওভার হচ্ছে, মেট্রোরেল হচ্ছে, বড় বড় দালান উঠছে। কিন্তু এই উন্নয়ন কার জন্য? যে শ্রমিক এই ফ্লাইওভার বানাল, সে কি একবেলা পেট ভরে খেতে পারে? যে শ্রমিক মেট্রোরেলের পিলার তুলল, তার ঘরে কি আজ ভাত আছে? উন্নয়নের ইটের নিচে চাপা পড়ে আছে শ্রমিকের ক্ষুধা আর কান্না।

এই শ্রমিকেরা কোনো দল চায় না, কোনো নেতা চায় না। তাঁরা চান দু’মুঠো ভাত এবং একটু সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে। তাঁরা চান সন্তান যেন না খেয়ে ঘুমোটে না যায়, বৃদ্ধ মা-বাবা যেন বিনা চিকিৎসায় মারা না যান। এটা কি খুব বেশি চাওয়া? এটা কি অন্যায় চাওয়া?
তাই দয়া করে এই মানুষগুলোকে আন্দোলনকারী বলবেন না। এদের সন্ত্রাসী বলবেন না। এরা আপনারই ভাই, আপনারই বোন, আপনারই প্রতিবেশী। এরা ভুক্তভোগী। এরা ক্ষুধার্ত। এদের পেটে ভাত দিন, বাঁচার অধিকার দিন। দেখবেন, এরা আর রাস্তায় নামবে না। ঘরে ফিরে যাবে, কাজে ফিরে যাবে।

কারণ, ক্ষুধার্ত মানুষের কোনো রাজনীতি নেই। ক্ষুধার্ত মানুষের একটাই দাবি—ভাত। ভাত দাও, বাঁচতে দাও।
এটা আন্দোলন নয়, বেঁচে থাকার শেষ আকুতি। এই আকুতিকে বুঝুন। এই আর্তনাদকে শুনুন। নইলে একদিন এই আর্তনাদই হয়ে উঠবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ।

Bengal Liberty