সাধারণ পরিবারের সন্তান তৌফিক
সাধারণ পরিবারের সন্তান তৌফিক

ন্যায্য মজুরির দাবিতে প্রাণ হারানো তৌফিক: দায় কার?

ঢাকার অদূরের কোনো এক নিভৃত গ্রামের সাধারণ পরিবারের সন্তান তৌফিক। অভাবের সংসার, বাবা-মায়ের চোখে একরাশ স্বপ্ন, ছোট বোনের পড়াশোনা, ভাইয়ের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর দায়িত্ব একদিন নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সে এসেছিল ঢাকায়। উদ্দেশ্য একটাই—গার্মেন্টসে কাজ করে পরিবারের প্রিয়জনদের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দেওয়া। সে কোনো বিলাসিতা চায়নি, চায়নি প্রাসাদ কিংবা দামি গাড়ি। চেয়েছিল শুধু ন্যায্য মজুরি আর একটু সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার।

কিন্তু তা আর হলো না। তৌফিক আজ লাশ হয়ে ফিরল গ্রামের বাড়িতে।

যে ছেলেটি হাসিমুখে বিদায় নিয়ে ঢাকায় এসেছিল, সেই ছেলেটিই আজ সাদা কাফনে মোড়ানো নিথর দেহ হয়ে ফিরে গেল মায়ের কোলে। মা আজও বিশ্বাস করতে পারছেন না, তাঁর বুকের মানিক আর কখনো ‘মা’ বলে ডাকবে না। বাবার কাঁধে আজ ছেলের লাশ—এই দৃশ্যের চেয়ে বড় কষ্ট পৃথিবীতে আর কী হতে পারে? ছোট বোনটি এখনো বুঝতে পারছে না, ভাইয়া কেন ঘুমিয়ে আছে, কেন আর উঠে দাঁড়াচ্ছে না!

তৌফিক তো কোনো অপরাধ করেনি। সে কারও সম্পদ লুট করতে যায়নি। সে গিয়েছিল নিজের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে। যে শ্রমে তার ঘাম ঝরে, যে ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যায়, যে শ্রমের বিনিময়ে মালিকপক্ষ কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়, সেই শ্রমের ন্যায্য মূল্যই চেয়েছিল সে। এটাই কি তার অপরাধ ছিল?

দায় কি সেই ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা শ্রমিককে মানুষ হিসেবে নয়, বরং যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে? দায় কি সেই মালিকপক্ষের, যারা শ্রমিকের রক্ত-ঘামে বিলাসবহুল জীবনযাপন করে, অথচ শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দিতে গেলেই তাদের হিসাবের খাতা শূন্য হয়ে যায়? দায় কি সেই রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্র শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে? নাকি দায় আমাদের সবার, যারা নীরবে এই অন্যায় দেখে যাই, অথচ প্রতিবাদ করার সাহস দেখাই না?

তৌফিকের পরিবারের স্বপ্ন আজ কালবৈশাখীর ঝড়ে ভেঙে তছনছ হয়ে গেছে। যে ঘরে একদিন ঈদের আনন্দ ছিল, যে ঘরে তৌফিকের পাঠানো টাকায় নতুন জামা কেনার স্বপ্ন বোনা হতো, সেই ঘরে আজ শুধুই কান্নার রোল। মায়ের চোখের জল আর শুকায় না। বাবার দীর্ঘশ্বাসও থামে না।

তৌফিক একা নয়। তৌফিকের মতো হাজারো তৌফিক রয়েছে এই দেশে, যারা প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যাদের ঘামে দেশের পোশাকশিল্প আজ বিশ্বদরবারে সম্মানিত। অথচ সেই শ্রমিকদের জীবনের যেন কোনো মূল্যই নেই। তাদের মৃত্যুতে কারও যেন কিছুই আসে যায় না। দুদিন সংবাদপত্রে খবর হয়, তারপর সবাই ভুলে যায়।

কিন্তু তৌফিকের মা ভুলতে পারবেন না। তাঁর বাবা ভুলতে পারবেন না। তাঁদের বুকের ভেতরে যে আগুন জ্বলছে, তা কোনো দিন নিভবে না।

আমরা কি তৌফিকের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার চাইতে পারি না? আমরা কি তার পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারি না? আমরা কি সম্মিলিতভাবে বলতে পারি না—আর কোনো তৌফিক যেন এভাবে লাশ হয়ে বাড়ি ফিরে না আসে?

তৌফিক চলে গেছে, কিন্তু তার রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যায় না। তার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে যাবে—ন্যায্য মজুরি কোনো ভিক্ষা নয়, এটি শ্রমিকের মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার আদায় করতে গিয়ে যদি আরও তৌফিককে জীবন দিতে হয়, তবে সেই দায় ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করবে না।

তৌফিক, তুমি ঘুমাও শান্তিতে। তোমার স্বপ্ন আমরা পূরণ করতে পারিনি—এ আমাদের ব্যর্থতা। কিন্তু তোমার এই আত্মত্যাগ একদিন এ দেশের শ্রমিকদের মুখে হাসি ফোটানোর পথ দেখাবে—এটাই আমাদের বিশ্বাস।

Bengal Liberty