Bengal Liberty: কোনও তদন্তকারী সংস্থাই কাউকে কাগজে কলমে গ্রেফতার না দেখিয়ে বেআইনিভাবে হেফাজতে আটকে রেখে সংবিধানের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করতে পারবে না। বৃহস্পতিবার এই কথাই স্পষ্ট জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের এই রায়ের ফলে তদন্তকারী সংস্থার আটক ও গ্রেফতারির মধ্যে পার্থক্য করার দিন শেষ হয়ে গেল। আটক ও গ্রেফতারের মধ্যে কৃত্রিম পার্থক্য তৈরি করে ‘বাফার পিরিয়ড’ বা অতিরিক্ত সময় দেওয়ার যে ব্যাখ্যা অতীতে ওড়িশা, কেরল ও মাদ্রাজ হাইকোর্ট দিয়েছিল, তা খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত।
এদিন বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এবং বিচারপতি এ এস চাঁদুরকরের ডিভিশন বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় দেয়। রায়ের মূল পর্যবেক্ষণে বিচারপতি ভুঁইয়া স্পষ্ট জানান, ব্যক্তি স্বাধীনতায় সাময়িক বাধা বলে সংবিধানে কোনও ধারণা নেই। কোনও তদন্তকারী সংস্থাকে অতিরিক্ত সময় দেওয়ার জন্য আটক ও গ্রেফতারের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক। আদালতের বক্তব্য, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদে নাগরিকের যে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে, তা অলঙ্ঘনীয়। কোনও ব্যক্তিকে তল্লাশি বা বাজেয়াপ্তকরণ অভিযানের সময় আটক রাখা হলেও তাঁকে নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানোর অজুহাতে এই সময়সীমা এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
ত্রিপুরায় এনডিপিএস আইনের অধীনে মাদক পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেফতার হওয়া চার ব্যক্তির আবেদনের ভিত্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো নাগাদ তল্লাশি অভিযান চালিয়ে ১১.০৩ কেজি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে পুলিশ ও তদন্তকারী দল। সেই সময়ই চারজনকে আটক করা হয়। কিন্তু তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয় পরদিন, অর্থাৎ ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায়।
আরও খবর
সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টো থেকেই ওই চার ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। তাই ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টোর মধ্যেই তাঁদের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের সময়কে ভিত্তি করে পুলিশ তাঁদের আরও প্রায় ১৮ ঘণ্টা বিচারবিভাগীয় নজরদারির বাইরে হেফাজতে রাখে। আদালতের মতে, এই ঘটনা সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। এই সাংবিধানিক লঙ্ঘনের ভিত্তিতেই চার আবেদনকারীকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেয় শীর্ষ আদালত।
এর আগে ত্রিপুরা হাইকোর্ট অভিযুক্তদের জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল। এনডিপিএস আইনের ৩৭ ধারায় জামিনের কঠোর শর্ত এবং ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ৩৬ ধারার প্রসঙ্গেও তাঁদের যুক্তি গ্রহণ করেনি হাইকোর্ট। সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দেয়।
বিচারপতি ভুঁইয়া আরও বলেন, সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদে ব্যবহৃত ‘গ্রেফতার’ এবং ‘আটক’ শধ দুটিকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। শধ দুটিকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনও ব্যক্তির স্বাধীনতা হরণের মুহূর্ত থেকেই ২৪ ঘণ্টার সময় গণনা শুরু হবে। আদালতের আরও পর্যবেক্ষণ, কোনও বিশেষ আইন বা বিধিবদ্ধ আইন কখনও সংবিধানের ঊর্ধ্বে হতে পারে না। বরং আইনের ব্যাখ্যা এমনভাবে করতে হবে, যাতে নাগরিকের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বা কাস্টোডিয়াল ভায়োলেন্স বন্ধ করার ক্ষেত্রেও এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে আইনি মহল। কারণ, অনেক ক্ষেত্রে কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার না দেখিয়েই দীর্ঘক্ষণ পুলিশি হেফাজতে রাখা হয়। এই সময়ের মধ্যেই নির্যাতনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
আদালত ভাগলপুর অন্ধকরণ-সহ দেশের একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে জানায়, পুলিশি হেফাজতে হিংসা দেশের একটি কঠিন বাস্তবতা। সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদের সুরক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্যই হল এই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। সব মিলিয়ে, এই রায়ের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট আরও একবার স্পষ্ট করে দিল, কোনও ব্যক্তিকে আটক রাখার পর আনুষ্ঠানিক গ্রেফতারের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করে সাংবিধানিক সময়সীমা এড়ানো যাবে না। ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষায় সংবিধানের ২২(২) অনুচ্ছেদই হবে চূড়ান্ত মাপকাঠি।


