নেতাজির সত্যের সন্ধানে
নেতাজির সত্যের সন্ধানে

তাইহোকুর সেই হোটেল, ১৮ আগস্টের বিমানদুর্ঘটনা এবং নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্য

১৮ আগস্ট ১৯৪৫। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্ব। জাপান কার্যত পরাজিত, এশিয়ায় তার সামরিক আধিপত্য ভেঙে পড়ছে, আর ভারতের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ওই দিন তাইহোকুর মাতসুয়ামা বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর একটি জাপানি সামরিক বিমান দুর্ঘটনায় পড়ে। সেই বিমানেই ছিলেন নেতাজি। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানেই তাঁর মৃত্যু ঘটে—এটাই বিমানদুর্ঘটনায় মৃত্যুর বহুল প্রচলিত বিবরণ। কিন্তু এই বিবরণ কি সম্পূর্ণ সত্য? নাকি যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে ঘটে যাওয়া একাধিক ঘটনার মধ্যে এমন কিছু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, যেগুলির উত্তর আজও ইতিহাসের কাছে অধরা?

তাইহোকুতে যে হোটেলে ছিলেন সুভাষচন্দ্র
তাইহোকুতে যে হোটেলে ছিলেন সুভাষচন্দ্র

 বিমানদুর্ঘটনার কাহিনি যেমন একাধিক তদন্তে বিকল্প ব্যাখ্যা এবং নতুন করে নথি পরীক্ষা করার দাবিও দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। নেতাজি নিজেই নিজের মৃত্যুর কাহিনি সাজিয়েছিলেন—এমন ধারণা এই রহস্যের সবচেয়ে নাটকীয় ব্যাখ্যাগুলির একটি। কিন্তু সেই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করার আগে দেখতে হবে, তার পক্ষে কী প্রামাণ্য দলিল রয়েছে, আর প্রচলিত বিবরণের সমর্থনে কী কী সমকালীন সাক্ষ্য পাওয়া যায়।

তাইহোকুর রেলওয়ে হোটেল এই অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অনুষঙ্গ। তৎকালীন ফরমোসা ১৮৯৫ সাল থেকে জাপানের ঔপনিবেশিক শাসনের অধীন ছিল। দ্বীপটি শুধু জাপানি প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রই ছিল না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক যোগাযোগ ও বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও তার বিশেষ ভূমিকা ছিল। তাইহোকু শহরের রেলওয়ে হোটেল ছিল সেই ঔপনিবেশিক নগরজীবনের পরিচিত স্থাপনা। রেলস্টেশনের কাছে অবস্থিত এই হোটেলটি অভিজাত অতিথিদের থাকার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৯০৮ সালে এর নতুন ভবন উদ্বোধন করা হয়। যুদ্ধের শেষ দিকে মিত্রবাহিনীর বোমাবর্ষণে ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। তাইওয়ানের ঐতিহাসিক আলোকচিত্র-সংগ্রহে হোটেলটির ছবি সংরক্ষিত রয়েছে।

নেতাজি ফরমোসায় অবস্থানকালে এক সময় এই হোটেলে থেকেছিলেন। তবে নেতাজির অন্তর্ধান-রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে শুধু একটি হোটেল নয়, তাইহোকুর মাতসুয়ামা বিমানঘাঁটি | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি জাপানি সামরিক বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের আত্মসমর্পণের প্রাক্কালে এই বিমানঘাঁটি থেকেই নেতাজির শেষ যাত্রা শুরু হয়েছিল বলে প্রচলিত বিবরণে দাবি করা হয়।

তাইওয়ানের সামরিক মানচিত্র
তাইওয়ানের সামরিক মানচিত্র

এই যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণগুলির একটি পাওয়া যায় কর্নেল হবিবুর রহমানের লিখিত বিবৃতিতে। তিনি ছিলেন নেতাজির সহযাত্রী এবং কথিত বিমানদুর্ঘটনার একমাত্র জীবিত ভারতীয় প্রত্যক্ষদর্শী। ২৪ আগস্ট ১৯৪৫ তারিখে তাইহোকু থেকে লেখা তাঁর বিবরণে বলা হয়, সাইগন থেকে যাত্রার পর বিমানটি ফরাসি ইন্দোচিনের তুরানে রাত কাটায়। ১৮ আগস্ট সকালে সেখান থেকে রওনা হয়ে বিমানটি দুপুর দুটো নাগাদ তাইহোকুতে পৌঁছয়। সেখানে প্রায় ৩৫ মিনিট বিরতির পর দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে আবার উড্ডয়ন করে। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, বিমানটি বিমানঘাঁটির সীমানা ছাড়ার আগেই সামনের দিক থেকে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা যায়। এরপর বিমানটি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই বিবরণ পরবর্তী তদন্তের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই বিবরণকে ঘিরেই পরবর্তী সময়ে নানা প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। দুর্ঘটনার সময়, বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, হাসপাতালে চিকিৎসা এবং দেহ সৎকারের ঘটনাক্রম—এসবের প্রতিটি দিক নিয়ে গবেষকরা আলোচনা করেছেন। ১৯৫৬ সালে গঠিত শাহনওয়াজ কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা বিমানদুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন। কমিটির সদস্য সুরেশচন্দ্র বসু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হননি এবং পৃথক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাঁর আপত্তির কেন্দ্রে ছিল সাক্ষ্যপ্রমাণের মূল্যায়ন, বিবরণের অসংগতি এবং বিকল্প সম্ভাবনাগুলি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা হয়েছে কি না।

পরবর্তী সময়ে বিচারপতি জি. ডি. খোসলা কমিশন বিমানদুর্ঘটনার বিবরণ সমর্থন করে। অন্যদিকে, বিচারপতি মনোজ কুমার মুখার্জির নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ২০০৫ সালে তার রিপোর্টে জানায় যে নেতাজি বিমানদুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন বলে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তবে কমিশনের সিদ্ধান্ত এবং তার যুক্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই দুই বিপরীত সিদ্ধান্তের ইতিহাসই প্রমাণ করে যে নেতাজির অন্তর্ধান নিয়ে সরকারি অনুসন্ধান একাধিকবার হয়েছে, কিন্তু সব তদন্ত একই উপসংহারে পৌঁছয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে জাপানি সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং হিকারী কিকানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজাদ হিন্দ সরকার ও জাপানি সামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় এই সংস্থার ভূমিকা ছিল। নেতাজির শেষ যাত্রার সময়ও জাপানি সামরিক কর্মকর্তারা তাঁর পরিবহণের ব্যবস্থা করেছিলেন বলে প্রচলিত বিবরণে উঠে আসে। কিন্তু তাইহোকুতে হিকারী কিকানের শাখা এতটাই দুর্বল ছিল যে সেখানে কোনও পক্ষেরই গোয়েন্দা প্রাধান্য ছিল না, কিংবা জাপান সরকার নেতাজির পরিকল্পনার কিছুই জানত না—এমন দাবি প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্দিষ্ট সামরিক নথি ও যোগাযোগের দলিল প্রয়োজন। এই ধরনের বক্তব্যকে আপাতত গবেষণার প্রশ্ন হিসেবেই দেখা উচিত।

হোটেলটির সমকালীন চিত্রের পুনঃনির্মাণ
হোটেলটির সমকালীন চিত্রের পুনঃনির্মাণ

নেতাজি যদি সত্যিই নিজের মৃত্যুর কাহিনি সাজিয়ে থাকেন, তাহলে সেই পরিকল্পনার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য কী হতে পারত? জাপানের পরাজয়ের পর মিত্রশক্তির হাতে বন্দি হওয়া এড়িয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া, নতুন কোনও রাজনৈতিক বা সামরিক শক্তির সহায়তা নেওয়া কিংবা অন্যত্র গিয়ে আত্মগোপন করা—এসব সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা অব্যাহত | পরিকল্পনাটি সত্যিই কার্যকর করতে নেতাজি নিজেই বিমানদুর্ঘটনার মৃত্যুকাহিনি সাজিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, দুর্ঘটনার বিবরণের পক্ষে রয়েছে হবিবুর রহমানের লিখিত বিবৃতি, জাপানি চিকিৎসক ও সামরিক কর্মীদের সাক্ষ্য, ১৯৪৫ সালের সামরিক যোগাযোগ এবং পরবর্তী তদন্তের নথি। ১৯৫৬ সালের তাইওয়ান সরকারি তদন্ত-প্রতিবেদনেও দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যুর সিদ্ধান্তে পৌঁছনো হয়েছিল; প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছি আমরা।

১৮ আগস্ট ১৯৪৫-এর রহস্যের তাৎপর্য তাই কেবল নেতাজির মৃত্যুর প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এটি যুদ্ধের শেষ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, গোপন সামরিক অভিযান, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের পরাজয়ের মধ্যে একজন বিপ্লবীর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের এবং আগামী পরিকল্পনার নির্দেশ দেয় । তাইহোকুর রেলওয়ে হোটেলের পুরোনো ছবিটি আমাদের সেই সময়ের বাস্তব প্রেক্ষাপটে ফিরিয়ে নিয়ে যায় |

তাইহোকুর সেই রেলওয়ে হোটেল আজ আর নেই। তার জায়গায় বদলে গিয়েছে শহর, বদলে গিয়েছে রাষ্ট্রের সীমানা, বদলে গিয়েছে যুদ্ধের মানচিত্র। কিন্তু পুরোনো ছবিটি এখনও একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—ইতিহাসের দৃশ্যমান প্রমাণের বাইরে কতটা অজানা থেকে যায় একজন জাতীরয় নেতার অগস্থ্য যাত্রা? প্রশ্ন অনেক, উত্তর জানেন স্বয়ং মহাকাল!

Bengal Liberty