Bengal Liberty, কলামিস্ট: প্রাইমা হোসেন
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, মেরিল্যান্ড স্টেট আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সহ-সভাপতি, বিশিষ্ট সমাজসেবী ও সংগঠক
বাংলাদেশের ইতিহাসে শ্রমিকের আন্দোলন কোনো নতুন ঘটনা নয়। যে শ্রমিকের ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, যে গার্মেন্টস শ্রমিকের রক্ত-ঘামে বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যে শ্রমিক সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই শ্রমিক যখন দু’মুঠো ভাতের জন্য, তার সন্তানের একটু ভালো খাবারের জন্য কিংবা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় নামে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল তার কথা শোনা। কিন্তু তার পরিবর্তে আমরা কী দেখলাম? ২০৪ জন শ্রমিক নেতা, বিশিষ্ট শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং গার্মেন্টস খাতের আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ‘ধূসর’ বানিয়ে আন্দোলনকারীদের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ! বিএনপির সরকার যেখানেই আন্দোলন হয়, সেখানেই শুধু আওয়ামী লীগ দেখতে পায়। এই নাটক বন্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগ সারা বাংলাদেশেই আছে।
প্রশ্ন একটাই—এটাকেই কি গণতন্ত্র বলে? এটাকেই কি আইনের শাসন বলে? নাকি এটাই স্বৈরতন্ত্রের আসল চেহারা?
একজন শ্রমিক মাস শেষে ১২-১৫ হাজার টাকা বেতন পান। বর্তমান বাজারে চাল, ডাল, তেল, গ্যাস, বাড়িভাড়া ও সন্তানের স্কুলের খরচ মেটাতে গিয়ে তাঁর পকেটে মাসের ১৫ তারিখের পর আর কিছুই থাকে না। তিনি না খেয়ে থাকেন, তাঁর সন্তানও না খেয়ে থাকে। এই বাস্তবতা থেকে তিনি যখন বলেন, “আমার বেতন বাড়াও, আমি বাঁচতে চাই”—এটা কি অপরাধ? এটা কি রাষ্ট্রবিরোধী কাজ? এটা কি সন্ত্রাস?
না, এটা তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। সংবিধান তাঁকে তাঁর ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করার অধিকার দিয়েছে। শ্রমিকের অধিকার আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃক স্বীকৃত। পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে শ্রমিকেরা তাঁদের বেতন ও ভাতার জন্য আন্দোলন করেন। কোথাও তাঁদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয় না। কোথাও তাঁদের পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় না।
কিন্তু বাংলাদেশে এখন যা হচ্ছে, তা ফ্যাসিজম ছাড়া আর কিছুই নয়।
ব্যাংক হিসাব জব্দ মানে কী? মানে হলো একজন মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বনটুকু কেড়ে নেওয়া। তাহলে শিল্পপতিদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেবে কেন? বাংলাদেশের কোন সংবিধানে তা লেখা আছে? সেই টাকা দিয়ে তাঁর সংসার চলে, তাঁর সন্তানের ওষুধ কেনা হয়, তাঁর মায়ের চিকিৎসা হয়। সেই হিসাব জব্দ করে দেওয়া মানে তাঁকে অনাহারে মারার চক্রান্ত। এটা শুধু আইনি ব্যবস্থা নয়, এটা অর্থনৈতিক হত্যাকাণ্ড।
আজ বিএনপি সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, আইনের শাসনের কথা বলে। কিন্তু কাজে আমরা কী দেখছি? আওয়ামী লীগের আমলে যে মিথ্যা বয়ান তৈরি করা হতো, তকমা দেওয়া হতো এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিরোধী মতকে দমন করা হতো—সেই একই কায়দায় এখন শ্রমিকদের দমন করা হচ্ছে। তার পুরোটাই মিথ্যা। সাধারণ শ্রমিকেরা বলছেন, “আমরা আওয়ামী লীগের শাসনামলে ভালো ছিলাম।” এখন মামলা, হামলা, গুম, গ্রেফতার চলছে। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক হিসাব জব্দ। এটা আরও ভয়ঙ্কর, আরও নিষ্ঠুর।
গণতন্ত্র মানে কী? গণতন্ত্র মানে জনগণের কথা শোনা। গণতন্ত্র মানে বিরোধী মতকে সম্মান করা। গণতন্ত্র মানে শ্রমিকের দাবি মানা অথবা তাঁর সঙ্গে আলোচনায় বসা। গণতন্ত্র মানে কখনোই ব্যাংক হিসাব জব্দ করে মুখ বন্ধ করা নয়।
আইনের শাসন মানে কী? আইনের শাসন মানে সবার জন্য সমান আইন। যারা হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাঁদের হিসাব জব্দ হয় না। যারা ব্যাংক লুট করেছে, তাঁদের হিসাব জব্দ হয় না। যারা শেয়ারবাজার লুট করেছে, তাঁদের হিসাব জব্দ হয় না। কিন্তু যে শিল্পপতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, হাজার হাজার মানুষ তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করে তাঁদের পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারছেন, তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তিনি টাকা তুলতে পারবেন না, তাঁর হিসাব জব্দ! এটাই কি আইনের শাসন? এটা তো আইনের শাসনের নামে আইনের অপশাসন।
ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা কী? ফ্যাসিজম হলো যখন রাষ্ট্র জনগণের কণ্ঠরোধ করে, যখন রাষ্ট্র ভয় দেখিয়ে শাসন করে, যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে শত্রু মনে করে। আজ ২০৪ জনের হিসাব জব্দ করে সরকার আসলে বাকি লক্ষ লক্ষ শ্রমিককে ভয় দেখাতে চাইছে—“দেখো, আন্দোলন করলে তোমারও এই অবস্থা হবে।” এটা ভয় দেখিয়ে শাসন করার নীতি। এটা ফ্যাসিবাদী নীতি।
শ্রমিকেরা ক্ষমতা চান না। শ্রমিকেরা সরকারের পতন চান না। শ্রমিকেরা চান শুধু দু’বেলা দু’মুঠো ভাত। শ্রমিকেরা চান তাঁদের সন্তান যেন একটু ভালো থাকে। এই সামান্য চাওয়াকে যদি সরকার রাষ্ট্রদ্রোহিতা মনে করে, তবে বুঝতে হবে সরকার জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সরকার এখন আর জনগণের সরকার নয়, সরকার এখন মালিকপক্ষের সরকার, লুটেরাদের সরকার।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের প্রশ্ন—এই বাংলাদেশের জন্য কি আমরা গণতন্ত্রের লড়াই করেছিলাম? এই বাংলাদেশের জন্য কি হাজারো মানুষ জীবন দিয়েছিল? আমরা চেয়েছিলাম একটি মানবিক বাংলাদেশ, যেখানে শ্রমিকের অধিকার থাকবে, যেখানে কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে, যেখানে পেটে ভাতের জন্য আন্দোলন করতে হবে না।
আজ সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। ২০৪ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দের এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন বৃদ্ধির দাবি মেনে নিতে হবে। অন্যথায় ইতিহাস বলবে—এটা গণতন্ত্র ছিল না, এটা ছিল স্বৈরতন্ত্রের আরেকটি নগ্ন রূপ। এটা ছিল ফ্যাসিজম।
শ্রমিকের পেটে লাথি মেরে কোনো সরকার টিকে থাকতে পারে না। ইতিহাস তার সাক্ষী।


