Bengal Liberty: নয়ন বিশ্বাস রকি
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী
৩ নভেম্বর ২০২৬ আমেরিকায় মিডটার্ম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবি হয়েছে। ২০২৫ সালে রিপাবলিকান পার্টির সদস্যরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও কংগ্রেস—উভয় পরিষদেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন। তবে এবারের নির্বাচনে তাদের সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা উভয় পরিষদেই হাতছাড়া হয়েছে।
সিনেটে ১০০ সদস্যের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য সংখ্যা আসন্ন অধিবেশনে ৫৪ জন এবং রিপাবলিকান পার্টির সদস্য সংখ্যা ৪৪ জন হচ্ছে। আরও ৬টি আসনের ফলাফল এখনও পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তখন রিপাবলিকানরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ—৫৩ জন। ডেমোক্রেটিক সদস্য ছিলেন মাত্র ৪৫ জন এবং দুজন ছিলেন স্বতন্ত্র।
আরও খবর
শুধু সিনেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমেছে তা নয়, এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসেও তাদের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। ২০২৫ সালে ৪৩৫টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের সদস্য সংখ্যা ছিল ২১৯ জন। চারটি আসন খালি ছিল। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪৭ জনে। অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিকদের সংখ্যা ২১২ থেকে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৪৫ জনে। এখনও ৩৫টি আসনের নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য সংখ্যা আরও বাড়বে।
উভয় পরিষদে ডেমোক্রেটিক পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়ার ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাঁরা খামখেয়ালি আচরণ করতে সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হবেন।
রিপাবলিকান দলের এই ভরাডুবির প্রধান কারণ হচ্ছে—(১) দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, (২) গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং (৩) ইরান যুদ্ধ। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনও মনে করেন না যে তাঁর ইরান যুদ্ধ এই ভরাডুবির জন্য দায়ী। কিন্তু তিনি স্বীকার করুন বা না-ই করুন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান-সংক্রান্ত আগ্রাসী নীতি ও যুদ্ধ গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করেছে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। তাছাড়া প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই, এমনকি স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রেও খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এতে অসন্তুষ্ট এবং তারই প্রতিফলন ঘটেছে এই ‘নীরব বিপ্লবে’। এবারের নির্বাচনে তারা দলে দলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তাঁর নেতার তীর্যক মন্তব্য এবং খামখেয়ালি আচরণই মূলত তাঁদের ভরাডুবির জন্য দায়ী।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যাঁদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেছিলেন বা বিষোদ্গার করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মিশিগানের আব্দুর রহমান আব্দুল আল-সায়িদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলমান ইউএস সিনেটর। তাই তাঁর জীবনের ওপর ঝুঁকি আসতে পারে।
এবারের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন। বহু বাংলাদেশি-মার্কিন নাগরিককেও ভোট দিতে দেখা গেছে।
মাহিমা বেগম নামে একজন বাংলাদেশি-মার্কিন নাগরিক ভোট দিয়ে বেরিয়ে এলে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, “কেমন লাগছে? ভোট দিতে কি কোনো ঝামেলা হয়েছে?”
তিনি বললেন, “ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা খুবই ভালো ছিল। কোনো ভিড় ছিল না। কোনো সমস্যা হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশে যেখানে আমি বড় হয়েছি, গত কয়েক বছর ভোট দিতে পেরেছি, কিন্তু বর্তমানে সে দেশে আর ভোট দিতে পারিনি। ওই দেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই, পরিবেশ নেই।”
কেন পরিবেশ নেই—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “সরকার বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের নিষিদ্ধ করে রেখেছে, যা বড়ই দুঃখজনক। ওই দেশে গণতন্ত্র বলতে কিছুই নেই। তবে একবার ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিলে বাংলাদেশেও নীরব বিপ্লব ঘটবে। যাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তারা অবশ্যই ভোটযুদ্ধে জিতবে বলে আমার বিশ্বাস।”
ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের মতো দেশে লক্ষ লক্ষ নাগরিককে গৃহহীন হতে হবে না, দেশের কলকারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিকদের চাকরি হারাতে হবে না এবং অর্থনীতি যেভাবে তলানিতে চলে যাচ্ছে, তা-ও হতো না। দেশের অবস্থা খারাপ বলেই বাংলাদেশিদের বিদেশে গিয়ে অনেক প্রতিকূল পরিবেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে জীবন কাটাতে হচ্ছে। কত সম্ভাবনাময় প্রবাসী জীবন অচিরেই ঝরে পড়ছে! কত সংসার ভেঙে গেছে? তবে সরকার বাহাদুর প্রবাসীদের রেমিট্যান্স দেখে আনন্দে আত্মহারা। তাঁরা বাঁচলেন না মরলেন, তা নিয়ে তাঁদের কোনো মাথাব্যথা নেই।
গত দুই দশকে দেশের অর্থনীতি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। ফলে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি তাঁদের সঞ্চিত মূলধন নিয়ে স্বদেশে ফিরে গিয়ে বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে বর্তমানে দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হওয়ায় এবং ‘মব রাজত্ব’-এর কারণে তাঁরা তাঁদের বিনিয়োগ বিক্রি করে বিদেশে নিয়ে আসছেন। এখন দেশে বাড়িঘর ও জমিজমার দামও অনেক কমেছে এবং বিদেশে প্রতিটি বাংলাদেশ মিশনে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (Power of Attorney)-এর ছাড়পত্র গ্রহণের জন্য আবেদন বাড়ছে।
দুঃখের বিষয়, স্বল্পসংখ্যক স্বার্থান্বেষী মানুষের জন্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বাংলাদেশ আজ বিপর্যস্ত। এ দেশ অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কোনো মারামারি নেই, কোনো স্লোগান নেই, কারচুপি নেই, নেই কোনো বোমাবাজি। আপনার আইডি দেখিয়ে ব্যালটটি নিয়ে নিজের ইচ্ছামতো ভোট দেবেন—এমন সুন্দর অবস্থা কবে বাংলাদেশে হবে? কখনও কি হবে?
কবে, কখন দেশের মানুষের বোধোদয় হবে এবং দেশে সত্যিকারের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে?


