Bikini movement
Bikini movement

Bikini Movement: বিকিনি আন্দোলন এবং পারমাণবিক বোমা!

বিট্টু রায়চৌধুরী, Bengal Liberty: ৬ মার্চ ২০২৪, দুপুর ১২টা, স্থান গোয়ার বাগা সৈকত। চত্বরে প্রবেশ করতেই নজরে এলো, এক বিদেশিনী বিকিনি পরে রৌদ্রস্নান (Sun Bath) নিচ্ছেন। ভারতের বিকিনির প্রচলন প্রায় নেই বললেই চলে (Bikini movement)। কারণ, ছেলেবেলা থেকেই আমাদের মস্তিষ্কে এই পোশাকটি নিয়ে ‘ট্যাবু’ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তার জেরেই হয়তো ‘অ্যান ইভিনিং ইন প্যারিস’ (১৯৬৭) চলচ্চিত্রে শর্মিলা ঠাকুরের বিকিনি পরিধানের দৃশ্যটি দেখে সবাই ‘রে রে’ করে উঠেছিলেন। তারপর, একে-একে জিনাত আমান, হেলেন, পারভিন ববি, ডিম্পল কাপাডিয়ার মতো বলিউড নায়িকার বিকিনি পরিহিত শরীর দেখে অনেকেই নিন্দার ঝড় তুলেছিলেন। কেউ-কেউ আবার রাতের স্বপ্নে সংশ্লিষ্ট অভিনেত্রীদের দেখে পাশবালিশে চুমু-ও খেয়েছেন! ‘বিকিনি ট্যাবু’ এখনও পর্যন্ত আমাদের মননে জোরালোভাবে বেঁচে আছে। তাই, আজও আমরা সেলুলয়েড বা বাস্তবে কোট-আনকোট ‘বিকিনি মহিলা’ দেখলেই চোখে মেপে ‘ছিঃ’ বলে মুখ ঘুরিয়ে স্নানাগারে ঢুকে মৈথুনে লিপ্ত হয়ে পড়ি (Bikini movement)। অবশ্য, কিছু ব্যাতিক্রম তো রয়েছেই। না-হলে গোয়ায় হয়তো ওই বিদেশিনী দু’চোখ বন্ধ করে এতটা নিশ্চিন্তে সূর্যস্নান নিতে পারতেন না।

ইতিহাস মোতাবেক, বিকিনি নামক সাঁতারের এই পোশাকটি নানা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েই বিবর্তিত হয়েছে। সিসিলি-তে অবস্থিত ভিলা রোমানা দেল ক্যাসেলের অন্দরে এক মোজাইকে বিকিনি পরা মহিলাদের খেলাধূলার ছবি আমরা চাক্ষুষ করি। এছাড়াও, ইন্টারনেটে দেওয়া তথ্য জানাচ্ছে, প্রাচীন গ্রিস, পম্পেই এবং তাম্র যুগে মহিলাদের মধ্যে বিকিনির প্রচলন ছিল যথেষ্ট। যদিও, সেই সময় ‘টু-পিস’ এই স্বল্প পোশাককে কেউ ‘বিকিনি’ বলে আখ্যা দেননি।

Bikini Movement
Bikini Movement

সময়টা ১৯০৭। অস্ট্রেলির মহিলা সাঁতারু অ্যানেট কিলারম্যান খানিকটা বিকিনির মতো দেখতে পোশাক পরার জন্য বস্টনে গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে ১৯১০ সালে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে দিয়ে মহিলারা সাঁতারের জন্য ছোট পোশাকটি পরার অধিকার অর্জন করেন। ওই সময় ফ্যাশন ডিজাইনার কার্ল জ্যান্টজেন নতুন করে ‘সুইমিং কস্টিউম’ প্রকাশ্যে আনেন। উল্লেখ করতেই হচ্ছে যে, আজও সাঁতারের পোশাক নির্মাণের ক্ষেত্রে জ্যান্টজেন একটা প্রতিষ্ঠান। পরের দিকে লাস্টেক্স-নাইলনের যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে সাঁতারের পোশাক শরীরের সঙ্গে আরও চিপকে যেতে শুরু করে।

এবার ফেরা যাক আধুনিক বিকিনি নির্মাণ এবং নামকরণের দিকে। ’৪৬ সালের কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যবনিকা পড়েছে কয়েক মাস আগে। গোটা বিশ্ব জুড়ে ঠান্ডা যুদ্ধের বাতাবরণ। সোভিয়েতকে টেক্কা দিতে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত বিকিনি অ্যাটল দ্বীপে ‘অপারেশন ক্রসরোডস’-এর নামে ধারাবাহিকভাবে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই বছর-ই ফরাসি অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার লুই রিয়ার্ড দুই প্রস্থ কাপড় দ্বারা একটি পোশাক নির্মাণ করেন, যার একটি অংশ কাঁচুলি মতো, বক্ষাবরণ হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আরেকটি উরুসন্ধি এবং নিতম্বকে ঢেকে রাখে। জামাটির নকশা মূলত সাঁতারকে গুরুত্ব দিয়েই তৈরি হয়। বিকিনি অ্যাটল দ্বীপের নামেই এই স্বল্প পোশাকের নামকরণ হয় ‘বিকিনি’। চলচ্চিত্র পরিচালক কৌশিক মুখোপাধ্যায় ওরফে (কিউ) তাঁর ‘Q কীর্তি’ পুস্তকে লিখছেন, ‘অ্যায়সা জামা বানিয়েছেন ভদ্রলোক, ফুল অ্যাটমবোমা। উনি জানতেন এই নতুন পোশাক বোমার মতো লক্ষ্যভেদ করবে। করলও।’ এখানে বলতেই হচ্ছে, বোমার মতো লক্ষ্যভেদের পাশাপাশি লুই রিয়ার্ড জানতেন, সংশ্লিষ্ট পোশাকটি ফ্যাশন দুনিয়ায় পারমানবিক বোমার মতো বিস্ফোরণ ঘটাবে। এবং, দিনের শেষে তাঁর ভবিষ্যৎবাণী-ও মিলে গেল। বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে প্রত্যেক বছর বিকিনি নামক বস্ত্রটি বিলিয়ন-বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ব্যবসা করে চলেছে।

Bikini Movement
Bikini Movement

বিকিনির প্রকারভেদ (Bikini movement)

বিকিনির প্রকারভেদ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই নাম নিতে হয় ‘মনোকিনি’র। ১৯৬৪ সালে পুরুষতান্ত্রিক দমনমূলক সমাজের বিরুদ্ধে গর্জিয়ে ডিজাইনার রুডি গার্নরিচ প্রথম মনোকিনি-র নকশা চূড়ান্ত করেন। এটির বিশেষত্ব হ’ল, নিতম্বকে আড়াল করে রাখলেও নারীর বক্ষ-যুগল উন্মুক্ত রাখে। ’৬৪ সালের ৩ জুন নিউইয়র্কের ফ্যাশন পত্রিকা ‘উইমেনস ওয়‍্যার ডেইলি’-তে মার্কিন মডেল পেগি মফিটের মনোকিনি পরিহিত অবস্থায় একটি ছবি প্রকাশ্যে আসতেই গোটা বিশ্বে ‘হই-হই’ পড়ে যায়। গোটা মার্কিন সাম্রাজ্য যখন প্রতি-সংস্কৃতি আন্দোলনের জেরে রীতিমতো উত্তপ্ত, তখন এমন পোশাক প্রকাশ্যে আসা যৌন বিপ্লবকে উচ্চস্তরে নিয়ে যেতে বাড়তি অক্সিজেন জুগিয়ে দেয়। ওই বছরই সান ফ্রান্সিসকোর ‘টপলেস নাইটক্লাব’-এ নর্তকী ক্যারল অ্যান ডোডা মনোকিনি পরে গোটা রক্ষণশীল সমাজকে হিলিয়ে দিয়েছিলেন।

পরবর্তীতে সময় ফ্যাশনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মনোকিনি-র পাশাপাশি সিকিনি, ট্যানকিনি, ক্যামকিনি, ত্রিকিনি, থং বিকিনি, বন্দু টপ পৃথিবীতে ব্যাপক সাড়া ফেলে।

৬-এর দশকে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে বিকিনির প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। হিন্দি সিনেমার কথা তো শুরুতেই উল্লেখ করেছি। তবে, তৎকালীন সময় ইউরোপ এবং মার্কিন চলচ্চিত্রের প্রায় বেশিরভাগ দৃশ্যে-ই অভিনেত্রীদের বিকিনি পরা অবস্থায় পর্দা কাঁপাতে দেখা গিয়েছে। যেমন― ১৯৬২ সালে ‘ডক্টর নো’ নামক বন্ড ফিল্মের নায়িকা তথা ‘সেক্স সিম্বল’ উরসুলা অ্যানড্রেসের সাদা বিকিনি দেখে পাগল হয়ে গিয়েছিল ইউরোপিয় এবং মার্কিনবাসীগণ। একই সময় মেরিলিন মনরো, জায়ন ম্যান্সফিল্ড, লুইজিনা লল্লোব্রিজিদার মতো জাঁদরেল অভিনেত্রীরা বিকিনি পরে সেলুলয়েডে দাপিয়ে বেড়ালেন।

সিনেমার পাশাপাশি সেই সময় জনপ্রিয় একাধিক পত্র-পত্রিকায় বিকিনির ছবি প্রচ্ছদে ছাপা শুরু হয়। উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৬২ সালের জুন মাসে প্রথমবারের জন্য ‘প্লে-বয়’-তে বিকিনি পরিহিত এক মডেলের শরীরের নিম্নাংশ প্রকাশিত হতে দেখে মানুষের চোখ কপালে ওঠে। অবশ্য, পরবর্তী সংখ্যাগুলোয় এই পোশাক পরা মহিলাদের ছবি ছাপানো ছিল কার্যত ‘জল-ভাত’।

সংগীতের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিকিনির যোগ মিলবে। ১৯৬০-এ ব্রায়ান হাইল্যান্ডের ‘ইটসি বিটসি টিনি উইনি ইয়োলো পোলকা ডট বিকিনি’ গানটি মহিলাদের এই বস্ত্র ক্রয় করার জন্য অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

আলোকচিত্র এবং রং-তুলির ক্ষেত্রে বিকিনি ক্রমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। উইলেম ভ্যান ডের ক্রিকেনের ‘গার্ল ইন ব্ল্যাক বিকিনি’ ক্যানভাসটি বর্তমানে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ঝকমক করছে।

এই মুহূর্তে সুইমিংয়ের পাশাপাশি ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল ভলিবল ফেডারেশন’-এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক মহিলা খেলোয়াড়রাও বিকিনির আদলে নির্মিত ‘সুইম স্যুট’ ব্যবহার করতে পারেন।

Bikini Movement
Bikini Movement

কেবলমাত্র ইউরোপ বা আমেরিকা নয়, ভারত বর্ষের ইতিহাস, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে-ও বিকিনির প্রভাব আমরা চাক্ষুষ করি। যেমন― বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের ‘নৌকাখণ্ড’-তে কৃষ্ণের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে রাধার কাঁচুলি খুলে যমুনায় ভাসিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অজন্তা-ইলোরা, খাজুরাহো, কোণার্ক সূর্য মন্দিরের ভাস্কর্যে কাঁচুলি পরিহিত লাস্যময়ীর দেখা মেলে।

পারমাণবিক বোমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বেব্যাপী বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বিকিনি নামক এই পোশাকটি। যার ফলে, আমরা প্রতিবছর ৫ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বিকিনি দিবস হিসাবে পালন করে থাকি। যদিও, ট্যাবু বা ছুঁৎমার্গ থাকার জেরে প্রাচ্যের দেশগুলোতে এই দিনটির গুরুত্ব আজও নেই। ভবিষ্যতে হবে কি-না, জানা নেই।

[embedyt] https://www.youtube.com/watch?v=XDXRjOtAdvY[/embedyt]

Bengal liberty
Bengal liberty

Bengal Liberty is a platform dedicated to guerrilla, unfiltered, and independent journalism. Through YouTube, its official website, and various social media channels, Bengal Liberty seeks to present citizen journalism to the public with integrity and transparency. Editor: Bittu Roy Chowdhury