Mamata Banerjee Dharna
সিদ্ধার্থ দে, Bengal Liberty: বাংলার রাজনীতিতে ‘ধর্ণা’ এবং ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’—এই দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক। যখনই তৃণমূল কংগ্রেস কোনও বড় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন হয়েছে, তখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজপথকে বেছে নিয়েছেন প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে। আগামী ৬ মার্চ কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে তাঁর এই ধর্ণাবস্থান সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চলেছে। তবে এবারের ইস্যু ভিন্ন, শ্লোগান আরও জোরালো— “নাগরিকদের ভোটাধিকার, এই আমাদের অঙ্গীকার।”
SIR বনাম গণতন্ত্র: সংঘাতের মূলে কী (Mamata Banerjee Dharna)?

শাসক দল তৃণমূলের অভিযোগ, বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্র সরকার SIR বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন -এর মাধ্যমে বাংলার গণতন্ত্রকে কণ্ঠরোধ করতে চাইছে। তৃণমূলের দাবি, এই ব্যবস্থার আড়ালে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এবং এলাকাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন ধ্বংস করার চক্রান্ত চলছে। গত ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই মুখ্যমন্ত্রী এই SIR-এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। তাঁর সাফ কথা ছিল, বাংলায় কোনওভাবেই এই নিয়ম কার্যকর হতে দেবেন না।
কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লড়াইটা শুধু আইনি নয়, বরং অনেক বেশি আবেগ ও অধিকারের। ধর্ণার মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবারও সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা দিতে চান যে, তিনিই একমাত্র নেত্রী যিনি দিল্লির শাসনের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে পারেন।
সিঙ্গুর আন্দোলনের ছায়া: ২০ বছরের বৃত্ত পূর্ণ (Mamata Banerjee Dharna)?

২০০৬ সালে সিঙ্গুরে টাটার ন্যানো কারখানার বিরুদ্ধে মমতার ২৬ দিনের আমরণ অনশন বাংলার রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ঠিক ২০ বছর পর, ২০২৬-এর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আবারও সেই মেট্রো চ্যানেলে ধর্ণায় বসা এক গভীর প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে।

সেদিন ইস্যু ছিল জমি, আজ ইস্যু ভোটাধিকার। ২০০৬ সালে তিনি ছিলেন বিরোধী নেত্রী, আজ তিনি তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী। তবুও আন্দোলনের ধরণ একই রয়ে গেছে। সমালোচকদের মতে, যখনই প্রশাসনিক বা আইনি পথে কোনও সমাধান আসে না, তখনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জন আবেগকে উসকে দিতে রাজপথে নামেন। জোড়াসাঁকো থেকে পদযাত্রা, দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন এবং সর্বশেষ সুপ্রিম কোর্টে আবেদন—সব পথেই যখন আশানুরূপ ফল মেলেনি, তখনই তিনি ফিরে গিয়েছেন তাঁর ‘কমফোর্ট জোন’ অর্থাৎ ধর্ণামঞ্চে।
জনমত ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব (Mamata Banerjee Dharna)!

বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে এই SIR নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
উন্নয়নপন্থী পক্ষ: সমাজের একাংশ মনে করছেন, SIR-এর মতো প্রকল্প বাংলায় বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারত। কর্মসংস্থান এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য এই ধরণের সংস্কার প্রয়োজন।
অধিকারকামী পক্ষ: অন্যদিকে, গ্রামীণ ও শহরতলীর মানুষের বড় অংশ মুখ্যমন্ত্রীর সুরেই সুর মেলাচ্ছেন। তাঁদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের মাধ্যমে আসলে সাধারণ মানুষের ক্ষমতা সংকুচিত করা হবে।
বিরোধীদের দাবি, তৃণমূল আসলে উন্নয়নের বিরোধী। সিঙ্গুর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, যখনই রাজ্যে কোনও বড় কর্মকাণ্ড হওয়ার কথা উঠেছে, তখনই তৃণমূল প্রতিবাদের নামে তাতে বাধা সৃষ্টি করেছে।
ভবানীপুর ও অভিষেকের দাবি: ধোঁয়াশা কোথায় (Mamata Banerjee Dharna)?

গতকাল, রবিবার সাংবাদিক সম্মেলনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন, ভবানীপুর থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ১ লক্ষের বেশি ভোটে জিতবেন। কিন্তু রাজনীতির অন্দরমহলের খবর বলছে অন্য কথা। শোনা যাচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রী এবার হয়তো ভবানীপুর থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করবেন না।
যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর থেকে না দাঁড়ান, তবে অভিষেকের এই দাবি কি কেবল কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার কৌশল? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনও বড় রাজনৈতিক চমক? এই প্রশ্নই এখন ঘোরাফেরা করছে রাজনৈতিক মহলে।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন: বাংলা কোন দিকে (Mamata Banerjee Dharna)?

সবশেষে প্রশ্ন একটাই— আগামী বিধানসভা নির্বাচনে বাংলা কোন পথ বেছে নেবে?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি এই ধর্ণার মাধ্যমে সফলভাবে ‘ভোটাধিকার বিপন্ন’ হওয়ার ভীতি মানুষের মনে গেঁথে দিতে পারেন, তবে তা তৃণমূলের পালে হাওয়া দেবে।
সুপ্রিম কোর্টে ধাক্কা খাওয়ার পর ধর্ণায় বসাটা কতটা কার্যকরী হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মানুষ কি উন্নয়ন নাকি আন্দোলন—কোনটিকে অগ্রাধিকার দেবে, সেটাই দেখার।
আরও পড়ুন (Mamata Banerjee Dharna)-
Women Safety Initiative Kolkata:ভোটের মুখে নারী নিরাপত্তা ইস্যুতে সক্রিয়তা, ‘পিঙ্ক বুথ’ ঘোষণায় প্রশ্নের মুখে মমতা সরকার!
Rajya Sabha Election 2026: রাজ্যসভা নির্বাচনে তৃণমূলের বড় চমক, প্রার্থী হচ্ছেন রাজীব কুমার! কোয়েল-বাবুল-মেনকা গুরুস্বামীকেও উচ্চকক্ষে পাঠাচ্ছেন মমতা
আগামী ৬ মার্চের ধর্ণা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি ২০২৬-এর নির্বাচনের মহড়া। ২০ বছর আগের সেই লড়াকু মেজাজ ফিরিয়ে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করতে চান তিনি আজও ‘বাংলার মেয়ে’ এবং রাজপথের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেত্রী। তবে বাংলার মানুষ এবার উন্নয়ন আর আন্দোলনের সংঘাতের মাঝে কাকে বেছে নেয়, তা সময়ই বলবে।
