Mamata Meets CV Ananda Bose
Bengal Liberty Desk, ১১ মার্চ, কলকাতা: রাজনীতিতে স্মৃতি বড় অদ্ভুত জিনিস, কখনও খুব দীর্ঘস্থায়ী, কখনও আবার সুবিধাভোগী। খুব বেশি দিন হয়নি, প্রকাশ্যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে যিনি বলেছিলেন “রাজভবনে আর যাব না, রাস্তায় ডাকলে কথা বলব”, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই শেষ পর্যন্ত একা গিয়ে বিদায়ী রাজ্যপালকে নামি দামী ফুল দিয়ে বিদায় জানালেন। রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন একটাই, এ কি শুধুই সৌজন্য?
যে রাজভবন এবং রাজ্যপালকে ঘিরে একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে রাজ্য রাজনীতিকে উত্তপ্ত করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী, সেই সিভি আনন্দ বোসের বিদায়ের মুহূর্তে তাঁর এই সৌজন্য সাক্ষাৎ অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। একাধিকবার রাজ্যপালের “ভিডিও আছে ভিডিও আছে” বলে কড়া সুর চড়িয়েছেন মমতা, এবার হঠাৎ সুর এত নরম কেন? তাহলে কি তাসের ঘরের একটা তাস পড়ে গেল?
আচমকা ইস্তফা আনন্দ বোসের (Mamata Meets CV Ananda Bose)
সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন সিভি আনন্দ বোস। নিজের ইস্তফাপত্রে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে প্রণাম জানিয়ে তিনি পদত্যাগের কথা জানান। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ধন্যবাদও জানান দায়িত্ব পালনের সময় সহযোগিতার জন্য। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন তামিলনাড়ুর বর্তমান রাজ্যপাল আর এন রবি। এত কিছুর মধ্যেই বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যপাল বদল এবং মুখ্যমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ রীতিমত ভাবাচ্ছে সকলকে।
After concluding our five-day dharna at Dharmatala, I took a moment to personally meet C. V. Ananda Bose, the Hon’ble Ex Governor of West Bengal, ahead of his departure tomorrow.
Dr. Bose is an erudite and distinguished individual, and during his tenure I had the opportunity to… pic.twitter.com/EZiBPeaWF2
— Mamata Banerjee (@MamataOfficial) March 10, 2026
শ্লীলতাহানির অভিযোগে ঝড় তুলেছিলেন মমতাই (Mamata Meets CV Ananda Bose)
গত কয়েক মাসে রাজভবন বনাম নবান্ন সংঘাত এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই রাজ্যপালের বিরুদ্ধে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছিলেন। রাজ্যপালের বিরুদ্ধে একাধিকবার শ্লীলতাহানির অভিযোগ তুলেছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী।একটি সভা থেকে তিনি বলেছিলেন, “রাজভবনে আমি আর যাব না। রাস্তায় ডাকলে কথা বলব, কিন্তু রাজভবনে নয়। যা কীর্তি কেলেঙ্কারি শুনছি আপনার পাশে বসাটাও পাপ। ” শ্লীলতাহানির অভিযোগ সামনে এনে তিনি আরও কঠোর সুরে বলেন, অভিযোগকারী তরুণীর কান্না তিনি ভিডিওতে দেখেছেন এবং সেই ঘটনার পর রাজভবনে যাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।
বিল আটকে রাখার অভিযোগ (Mamata Meets CV Ananda Bose)

সংঘাতের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। বিভিন্ন বিল দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকার অভিযোগ তুলেছিল রাজ্য সরকার। বিশেষ করে হাওড়া সংক্রান্ত একটি বিল নিয়ে স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কেন রাজ্যপাল সই করছেন না এবং তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ এবং বর্তমান তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ তৎকালীন এই বিল সমস্যার কারণে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছিলেন, ‘অন্যায্যভাবে বিল আটকে রেখেছেন রাজ্যপাল’।
রাজভবনে ‘পিস রুম’ খোলা (Mamata Meets CV Ananda Bose)
অন্যদিকে পঞ্চায়েত ভোটের সময় রাজ্যজুড়ে হিংসার অভিযোগের প্রেক্ষিতে রাজভবনে ‘পিস রুম’ চালু করেছিলেন সিভি আনন্দ বোস। সেখানে সাধারণ মানুষ সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারতেন। সাধারণত, ২৩ সালে পঞ্চায়েত ভোট নিয়ে হিংসার ঘটনাতে ভোট সংক্রান্ত বিষয়ে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন অভিযোগ জানতে এবং সেগুলির বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ করতেই রাজভবনে খোলা হয়েছিল সাহায্য কক্ষ। “পিস রুম” প্রসঙ্গে তীব্র কটাক্ষ করেছিলেন তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ। তাঁর কথায়, “আসলে রাজ্যপাল তিনি এখন নিজেকে বিজেপি, আইএসএফ, বামফ্রম, কংগ্রেসের মিলিঝুলি চেয়ারম্যান। উনি এখন রামফ্রন্টের চেয়ারম্যান। পিস রুমকে ক্যান্টিন করুন, চারটে দলের নেতাকে ডালভাত খাওয়াবেন।” আর আজ সেই রাজ্যপালের বিদায় বেলায় তাঁকে ফুলের স্তবক দিয়ে সংবর্ধনা জানিয়ে ছবি পোস্ট করেন ফেসবুকে।
রাজভবন থেকে ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ চালানোর অভিযোগ (Mamata Meets CV Ananda Bose)
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বারংবার সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, SIR প্রক্রিয়ার নামে বাংলায় এমন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে যা কার্যত সমান্তরাল প্রশাসন চালানোর প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।
আচমকা সৌজন্যে প্রশ্ন আরও তীব্র

এই প্রেক্ষাপটে বিদায়ী রাজ্যপালের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ রাজনীতির অন্দরে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।যে রাজভবনে যাওয়াকে তিনি একসময় প্রায় নৈতিক প্রশ্নে দাঁড় করিয়েছিলেন, সেই তিনিই বিদায়ের মুহূর্তে একা গিয়ে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানালেন। এখন প্রশ্ন, রাজ্যপালের বিরুদ্ধে মমতার এবং তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ এতটাই গুরুতর হয়, তবে এই সৌজন্যের প্রয়োজন কোথায়?
আরও পড়ুন-
Dharmatala Protest Kolkata : ধর্মতলার মঞ্চ থেকে কেন্দ্রকে কড়া আক্রমণ মমতার, রাজ্যপাল বদল নিয়ে এবার সরাসরি সরব তৃণমূল নেত্রী
Mamata on CV Ananda Bose Resigns: রাজ্যপাল ইস্তফা দিতেই সংঘাত চরমে, কেন্দ্রের ‘একতরফা’ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ মমতা!
একটা তুরুপের তাস হাতছাড়া মমতার?
রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এতদিন রাজ্যপালকে ঘিরে নানা অভিযোগ তুলে যে চাপের রাজনীতি তৈরি করা হয়েছিল, তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে সেই চাপের হাতিয়ার কার্যত হাতছাড়া হয়ে গেল?
রাজনীতিতে কৌশল বদল নতুন নয়, কিন্তু অবস্থানের এমন নাটকীয় পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়। একদিকে কঠোর অভিযোগ, অন্যদিকে বিদায়ের মুহূর্তে সৌজন্যের ফুল! এতদিন রাজ্যপালকে ঘিরে তৈরি করা রাজনৈতিক চাপের সমীকরণ তাঁর পদত্যাগের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে পড়েছে। আর সেই কারণেই হয়তো শেষ মুহূর্তে বদলে গেছে রাজনৈতিক ভাষাও।ফলে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, এটা কি নিছক সৌজন্য? না কি রাজনৈতিক দাবার ছকে হঠাৎ করেই বদলে গেছে চাল?
