Maradona
বিট্টু রায়চৌধুরী, Bengal Liberty: হাতে-পায়ে চে, ফিদেলের ট্যাটু, পরনে জলপাই রঙের ওপর লাল তারা প্রিন্ট করা টুপি। নীল-সাদা জার্সি এবং মুখে সিগার (Maradona)। একজন কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন ফুটবলার হিসাবে দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা দশকের পর দশক ধরে ফুটবলের পাশাপাশি রাজনীতির ময়দানে রীতিমতো দাপট দেখিয়ে গিয়েছেন। যতবার ল্যাটিন আমেরিকার ওপর মার্কিন কর্তৃত্ববাদ থাবা বসিয়েছে, ততবারই সিংহের মতো গর্জে উঠেছেন ফুটবলের রাজপুত্র। যেমন, ট্রাম্প প্রথম আমলে ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাক গলানোর তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন দিয়েগো। এখানেই শেষ নয়, বুশকে হিটলারের সঙ্গে তুলনা করতেও দু’বার ভাবেননি এই বোহেমিয়ান ফুটবলারটি।

মার্কিন বিরোধী মারাদোনা (Maradona)
ভেনেজুয়েলার সমাজবাদী নেতা নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে মারাদোনার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। তিনি মাদুরোর নির্বাচনী প্রচারেও অংশ নিয়েছিলেন। সম্প্রতি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলদারি মেনে নিতে পারেননি মারাদোনা। তাই, একটি প্রেস কনফারেন্স করে তিনি সরকারকে একহাত নিয়েছিলেন তিনি। আর্মান্দো মারাদোনা বলেছিলেন, ‘‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের দুনিয়ার শেরিফ বলে মনে করে। বিশ্বের সব থেকে শক্তিশালী বোমাটি ওদের কাছে আছে! সেই বোমা তারা যে-কোনও সময় যে-কোনও জায়গায় ফেলে আসতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন ট্রাম্প, আমরা এটা কিছুতেই হতে দেব না।’’

এই প্রথম নয়, ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনার মার দেল প্লাটায় ‘সামিট অফ দ্য আমেরিকাস’-এর আয়োজন হয়েছিল। সেই সময় আর্জেন্টিনায় জর্জ ডব্লিউ বুশের উপস্থিতির বিরোধিতা করেন মারাদোনা। তিনি একটি টি-শার্ট পরেছিলেন। যেখানে সাফ প্রিন্ট করা ছিল, ‛STOP BUSH’। উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে, ‘BUSH’-এর ‘S’-টিকে স্বস্তিকা চিহ্নের রূপ দেওয়া হয়। আমরা সবাই জানি, সংশ্লিষ্ট চিহ্নটি হিটলারের নারকীয় শাসন বোঝাতে ব্যবহার করা হয়।
২০০৭ সালের আগস্টে, ভেনেজুয়েলার একটি সাপ্তাহিক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে মারাদোনা বলেছিলেন, ‘আমি আমেরিকার সবকিছুকেই ঘৃণা করি। যতটা ঘৃণা করা যায়, সর্বশক্তি দিয়ে করি।’

ফিদেল মারাদোনার ‛দ্বিতীয় পিতা’ (Maradona)
কিউবায় চিকিত্সাধীন অবস্থায় তাঁর সঙ্গে ফিদেল কাস্ত্রোর সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফিদেল কাস্ত্রোকে তিনি ‘দ্বিতীয় পিতা’ হিসাবে সম্মধন করতেন। কাজেই, হাভানায় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বাঁ-পায়ে কাস্ত্রোর মুখ ট্যাটু করিয়েছিলেন দিয়েগো। সেই ট্যাটু কাস্ত্রোকেও দেখিয়েছিলেন। আর ফিদেলের সহযোদ্ধা চে’র ট্যাটু তো বহু আগেই মারাদোনার হাতে জায়গা করে নিয়েছিল।

‛আমি চ্যাভিস্তা’― দাবি করেছিলেন মারাদোনা (Maradona)
ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট তথা সমাজতন্ত্রী হুগো চাভেজের ভয়ঙ্কর সমর্থক ছিলেন মারাদোনা। চাভেজের সঙ্গে তিনি একাধিকবার দেখা করেছেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সেই সমস্ত আলোচনায় তাঁর ‛দ্বিতীয় পিতা’ ফিদেলও ছিলেন। চাভেজ নিজেকে কোনওদিন কমিউনিস্ট বলে দাবি করেননি। উলটে, তিনি অনেকটাই ভাববাদী ছিলেন। ভগবানে বিশ্বাস রাখতেন। দেশের প্রতি তাঁর এতটাই ভালোবাসা ছিল যে, ভেনেজুয়েলার সংবিধান সবসময় তাঁর পকেটে থাকত। আসলে চাভেজ সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক সিস্টেমে বিশ্বাস রাখতেন। মারাদোনার ক্ষেত্রেও একই অবস্থান দেখা যায়। ঈশ্বরের প্রতি তাঁর আস্থা থাকা সত্ত্বেও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, মানব-মুক্তির ক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রই একমাত্র পথ। ফিদেল যেমনটা বলেছিলেন, ‘হয় সমাজতন্ত্র, নয় মৃত্যু।’
কলম্বিয়া’র মার্কসবাদী বিদ্রোহী সংগঠন ‘ফার্ক’ ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সশস্ত্র বিপ্লবের পথে হেঁটে চলেছে। জানা যাচ্ছে, সংশ্লিষ্ট গ্রুপটি শান্তির জন্য ময়দানে নেমে ফুটবল খেলার আয়োজন করেছিল। সেখানে তারা মারাদোনাকে পাশে চেয়েছিলেন।

জ্যোতি বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ (Maradona)
বাম আমলে তৎকালীন ক্রীড়া মন্ত্রীর উদ্যোগে কলকাতায় এসেছিলেন মারাদোনা। জ্যোতি বসুর সঙ্গে ১০ মিনিট বৈঠকও করেছিলেন। দুই কিংবদন্তীর কথোপকথনে উঠে এসেছিল ফিদেল, চে, ল্যাটিন আমেরিকার রাজনৈতিক প্রসঙ্গ।
মারাদোনা কোনওদিনও দাবি করেননি যে, তিনি কমিউনিস্ট। মার্কসবাদের দর্শন সম্পর্কে তিনি সেই অর্থে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। কিন্তু, আজীবন মার্কিন কর্তৃত্ববাদকে রীতিমতো ঘৃণা করেছেন মারাদোনা। ধারাবাহিকভাবে ল্যাটিন আমেরিকার ওপর মার্কিনী দাদাগিরি তীব্র সমালোচনা করে গিয়েছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর ব্যক্তিগত জীবন এবং খেলা নিয়ে অনেক বিতর্ক ছিল ঠিকই। তবে, মার্কিন বিরোধী মনোভাব এবং সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর নেতাদের প্রতি ভালোবাসা ফুটবলের রাজপুত্রকে অজান্তেই কমিউনিস্ট করে তুলেছিল।



