Mohun Bagan
Bengal Liberty : প্রতি বছর ২৯ জুলাই শুধু একটি ফুটবল ক্লাবের জয়োৎসব নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, সাহস এবং স্বাধীনতার চেতনার এক অবিস্মরণীয় স্মৃতিকে সম্মান জানানোর দিন (Mohun Bagan Day)। তাই এই দিনটি কেবল ‘মোহনবাগান দিবস’ নয়, বরং ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম গর্বের অধ্যায়। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক আইএফএ শিল্ড (IFA Shield) জয়ের মাধ্যমে সমগ্র দেশের কাছে পরাধীন ভারতবাসীর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই কারণেই আজও ২৯ জুলাই এলেই আবেগে ভাসেন কোটি কোটি সবুজ-মেরুন সমর্থক (Mohun Bagan Day)।
১৮৮৯: এক ক্লাবের জন্ম থেকে কিংবদন্তির সূচনা
১৮৮৯ সালের ১৫ আগস্ট উত্তর কলকাতায় ভূপেন্দ্রনাথ বসু ও যতীন্দ্রনাথ বসুসহ একদল ক্রীড়াপ্রেমীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব।
সেই সময় ভারতীয়দের জন্য ক্রীড়াক্ষেত্রে সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ব্রিটিশ শাসনের দাপটে ফুটবল খেলাটিও ছিল মূলত ইউরোপীয়দের দখলে। কিন্তু প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মোহনবাগান দেশীয় ফুটবলারদের প্রতিভা তুলে ধরার লক্ষ্যে এগিয়ে চলে। ধীরে ধীরে কলকাতার গণ্ডি পেরিয়ে গোটা দেশের মানুষের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এই সবুজ-মেরুন শিবির।
১৯১১: খালি পায়ে ইংরেজদের হারিয়ে বদলে যাওয়া ইতিহাস

গৌরবময় অধ্যায় (Mohun Bagan Day)
ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় নিঃসন্দেহে ১৯১১ সালের আইএফএ শিল্ড ফাইনাল। ২৯ জুলাই কলকাতার ময়দানে মুখোমুখি হয়েছিল মোহনবাগান এবং ব্রিটিশ সেনা দল ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট। সেই সময় ইংরেজ ফুটবলাররা আধুনিক বুট পরে খেললেও মোহনবাগানের অধিকাংশ ফুটবলার মাঠে নেমেছিলেন খালি পায়ে (একমাত্র সুধীর চট্টোপাধ্যায় বুট পরে খেলেছিলেন)। ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়লেও হাল ছাড়েনি মোহনবাগান। প্রথমে শিবদাস ভাদুড়ীর অসাধারণ গোল ম্যাচে সমতা ফেরায়, আর শেষ মুহূর্তে অভিলাষ ঘোষের জয়সূচক গোল স্তব্ধ করে দেয় ইংরেজদের। ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে আইএফএ শিল্ড জিতে ইতিহাস গড়ে মোহনবাগান।
এই জয় শুধু একটি ট্রফি জেতার গল্প ছিল না; ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে পরাধীন ভারতীয়দের আত্মবিশ্বাসকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিল এই সাফল্য। দেশের নানা প্রান্তে মোহনবাগানের এই জয়কে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। তাই ১৯১১ সালের সেই দল আজও ‘ইমর্টাল ইলেভেন’ (অমর একাদশ) নামে পরিচিত।

কেন এত বিশেষ ২৯ জুলাই? (Mohun Bagan Day)
‘মোহনবাগান দিবস’-এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে সেই ঐতিহাসিক শিল্ড জয়ের স্মৃতি। প্রতি বছর এই দিনে ক্লাব তাঁবুতে হাজার হাজার সমর্থকের ভিড় জমে। শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয় শহিদ ও প্রাক্তন কিংবদন্তিদের প্রতি। ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয় বিভিন্ন সম্মাননা (যেমন: ‘মোহনবাগান রত্ন’) এবং নতুন মরশুমের ফুটবলারদের শুভসূচনা ঘটে। সবুজ-মেরুন সমর্থকদের কাছে এই দিনটি এক মহোৎসব—যেখানে ইতিহাস, আবেগ এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন এক সূতোয় বাঁধা থাকে।
ভারতীয় ফুটবলে মোহনবাগানের অবদান (Mohun Bagan Day)
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি মোহনবাগান। অসংখ্য জাতীয় লিগ, ফেডারেশন কাপ, ডুরান্ড কাপ, আইএফএ শিল্ডসহ বিভিন্ন ঘরোয়া ট্রফি জিতে নিজেদের সাফল্যের ঝুলি সমৃদ্ধ করেছে এই ক্লাব। শৈলেন মান্না, চুনী গোস্বামী, পি কে বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত ভট্টাচার্য, গৌতম সরকার থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের বহু তারকা ফুটবলার এই ক্লাবের জার্সি গায়ে দেশের ফুটবলকে সমৃদ্ধ করেছেন।

মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট (Mohun Bagan Day)
বর্তমানে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট নাম নিয়ে ইন্ডিয়ান সুপার লিগেও (ISL) অন্যতম সফল দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে ক্লাবটি। অতীতের ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক ভারতীয় ফুটবলেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে সবুজ-মেরুন ব্রিগেড।
আবেগ, ঐতিহ্য এবং আত্মপরিচয়ের নাম মোহনবাগান
মোহনবাগান শুধুমাত্র একটি ফুটবল ক্লাব নয়, এটি একটি চিরন্তন অনুভূতি। ১৯১১ সালের সেই খালি পায়ের লড়াই আজও ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসে অনুপ্রেরণার উৎস। সময় বদলেছে, ফুটবলের ধরন বদলেছে, কিন্তু সবুজ-মেরুন জার্সির প্রতি সমর্থকদের ভালোবাসা বিন্দুমাত্র কমেনি। তাই প্রতি বছরের ২৯ জুলাই ফিরে আসে নতুন করে ইতিহাসকে স্মরণ করার, গর্ব করার এবং আগামী দিনের সাফল্যের স্বপ্ন দেখার দিন হিসেবে।
খালি পায়ে ইংরেজদের হারিয়ে যে রোমাঞ্চকর যাত্রার সূচনা হয়েছিল, সেই উত্তরাধিকার আজও সগর্বে বহন করে চলেছে মোহনবাগান। আর সেই কারণেই মোহনবাগান দিবস শুধু একটি ক্লাবের উৎসব নয়—এটি ভারতীয় ফুটবল এবং বাঙালির আত্মমর্যাদার এক অমর উদ্যাপন। সব শেষে একটাই কথা: “আমাদের সূর্য সবুজ-মেরুন! জয় মোহনবাগান! অমর একাদশ অমর রহে।”

আরও পড়ুন :
India New Fielding Coach : টি দিলীপের জায়গায় কে হলেন ভারতের নতুন ফিল্ডিং কোচ?

