India Bangladesh border
Bengal Liberty, বিট্টু রায়চৌধুরী:
এক উদ্বাস্তুর ‘হয়তো’ ধারণা!
রাস্তার ওপর সাদা দাগ এঁকে লক্ষ্মণরেখা টেনে দিয়েছেন সীমান্তরক্ষীরা। অদৃশ্য এই কাঁটাতারের দু’প্রান্তে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটা পরিবার। একপ্রান্তের মানুষগুলো বাংলাদেশের নাগরিক, অপরটা ভারতের। সাক্ষাতের মাহেন্দ্রক্ষণে খণ্ডিত পরিবারের সকলের চোখে আবেগের জল। পাশ থেকে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক সেনা বাংলায় বলে উঠলেন― ‘‘লাইনের বাইরে যেন পা না-যায়। দু’দিকে দাঁড়িয়ে যেমন হাত মেলাচ্ছেন, তেমনই করুন India Bangladesh border। কেউ কাউকে কোনও জিনিস দেবেন না।’’
বিএসএফ জওয়ানের নির্দেশ শুনে কিছুটা সজাগ হয়ে গেলেন পরিবারের প্রত্যেকে। সেনার নির্দেশ লঙ্ঘন হচ্ছে না তো? কথা বলতে গিয়ে বারবার পায়ের দিকে নজর দিয়ে মনে-মনে এই প্রশ্নটাই করছিলেন প্রত্যেকে। পাশে দাঁড়িয়ে হিন্দিভাষী আরেক সীমান্তরক্ষী। পারিবারিক মিলন দৃশ্য দেখে তিনি তাঁর মাতৃভাষায় বলে উঠলেন, ‘‘আমরা বারণ করি ঠিকই। কিন্তু, আবেগটাকে অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই। এতদিন পর একটা পরিবার মিলছে।’’
কাঁটাতারের দু’পারে এক পরিবারের গল্প

এমন ভারাক্রান্ত মুহূর্তের মাঝে ওপার বাংলা থেকে ভেসে আসছে আযানের সুর। বর্ডারের তোয়াক্কা না-করা পাখির দল দু’দেশের আকাশ পথে নিবিঘ্নে বিচরণ করে চলেছে। এসবের মাঝে আচমকাই পাহাড়ি পাথর বোঝাই প্রকাণ্ড ট্রাকের তীব্র শব্দে ভাবনার জগৎ থেকে আমায় বেরিয়ে আসতে হ’ল।
ওই পরিবারেরই সবচেয়ে প্রবীণ সদস্য কেঁদেই চলেছেন। পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন তাঁর ছোট ছেলে। কিছুক্ষণ পর কান্নার কারণ জানতে পারলাম। লক্ষ্মণরেখা ওপ্রান্তে মুখোমুখি থাকা প্রৌঢ় ব্যক্তিটি বৃদ্ধার বড় ছেলে। যিনি ’৭১-এ বাংলাদেশে থেকে গিয়েছেন। একই মাতৃগর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া দুই ভাই আজ দু’টি পৃথক দেশের বাসিন্দা!
সম্পূর্ণ দৃশ্যটা চাক্ষুষ করলাম উত্তরবঙ্গের ফুলবাড়ি এলাকার ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তে পৌঁছে। দিনটা ছিল, ২০২৪-এর ২ এপ্রিল, মঙ্গলবার। সময়, বিকেল ৪টে থেকে ৪:৩০। খবর নিয়ে জানা গেল, প্রতি সপ্তাহের মঙ্গল এবং শনিবার সীমান্তের ‘নো-ম্যানস ল্যান্ড’-এ সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। চলে ‘বিটিং দ্য রিট্রিট’ সামরিক অনুষ্ঠান। এই সুযোগে দু’বাংলার মানুষ, বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া বন্ধু, মা-সন্তান, ভাই-বোন, বাবা-ছেলে বা পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ সেরে ফেলেন।

জাতি, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের জেরে আজ এমনভাবে কত পরিবার ভারতের মতো বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, সেই পরিসংখ্যান আমার কাছে নেই। তবে, ১৯৭১ সালের পর দেশটা যদি আবার এক হ’ত, অথবা নেহরু, জিন্না ‘পার্টিশন’ নিয়ে চর্চায় না-যেতেন এবং সুভাষচন্দ্র বসু রাষ্ট্র ক্ষমতা নিজের কাঁধে তুলে নিতেন, তা-হলে এই করুণ ছবির হয়তো অস্তিত্ব থাকত না। হয়তো!
