Bengal Liberty, কলামিস্ট: নয়ন বিশ্বাস রকি
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী
আজ বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিকেরা এক ভয়াবহ সময় পার করছেন। যে শ্রমিকের ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে, যে শ্রমিকের হাতে তৈরি পোশাক বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে নিয়ে যায়, আজ সেই শ্রমিকই নিজের ঘরে নিরাপদ নন।
১৯৭১ সালে যেমন হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে গ্রামে গ্রামে হানা দিত, আজ ঠিক তেমনভাবেই প্রতিটি গার্মেন্টস এলাকায় রাতের অন্ধকারে বাসায় বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পুলিশ যাচ্ছে, দলীয় নেতা-কর্মীরা যাচ্ছে, খোঁজা হচ্ছে গার্মেন্টস কর্মীদের। পরিচয় একটাই—তাঁরা শ্রমজীবী, তাঁরা সাধারণ মানুষ, তাঁরা হয়তো ভিন্নমতের, হয়তো নিরীহ। তবুও তাঁদের ওপর নেমে আসছে নির্যাতন।
আরও খবর
এটা কোনো রাজনীতি নয়, এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। একজন শ্রমিক সারাদিন ১০-১২ ঘণ্টা কারখানায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করে। রাতে যখন একটু শান্তিতে ঘুমাতে যাবেন, তখন তাঁর দরজায় কড়া নাড়ে আতঙ্ক। তাঁর স্ত্রী, তাঁর মেয়ে, তাঁর মা-বোন আতঙ্কে কাঁপেন। গার্মেন্টস এলাকাগুলোতে আজ নারীদের ওপর নেমে এসেছে এক কালো রাত।
দলীয় নেতা-কর্মীদের হামলা এবং পুলিশ বাহিনীর নির্যাতন—এই দুইয়ের চাপে পিষ্ট হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকেরা। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির দুর্বৃত্ত মা-বোনদের ওপর বিভিন্ন ধরনের অত্যাচার, হয়রানি, এমনকি যৌন হয়রানির মতো জঘন্য কাজও শুরু করেছে বলে অভিযোগ উঠছে। একজন মা যখন তাঁর মেয়েকে নিয়ে রাতে নিজের বাসায় নিরাপদ বোধ করেন না, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা কি এজন্যই মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম? বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা কি এই ছিল? মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী হিসেবে আমি বলতে চাই, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদাররা যা করেছিল, আজ যদি নিজ দেশের মানুষ নিজ দেশের শ্রমিকদের ওপর তার চেয়েও ভয়াবহ নির্যাতন চালায়, তাহলে এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।
গার্মেন্টস শ্রমিকেরা কোনো দলের সম্পত্তি নন। তাঁরা এই দেশের সম্পদ। তাঁরা কারও দয়া চান না; তাঁরা চান ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা এবং সম্মান। তাঁদের বাসায় বাসায় গিয়ে খোঁজা, তাঁদের ভয় দেখানো, তাঁদের নির্যাতন করা—এটা শিল্পকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র।
মনে রাখতে হবে, একটি কথা চিরন্তন সত্য—শিল্প বাঁচলে দেশ বাঁচবে, আর শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে।
আজ যদি শ্রমিককে বাঁচতে না দেওয়া হয়, তাহলে কাল কারখানা চলবে কীভাবে? আজ যদি শ্রমিকের মা-বোন নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সেই শ্রমিক মন দিয়ে কাজ করবেন কীভাবে? আজ যদি ভয়ে শ্রমিকেরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান, তাহলে রপ্তানি আসবে কোথা থেকে?
তাই আমি সরকার, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল—সবার কাছে আহ্বান জানাই, দয়া করে শ্রমিকদের ওপর এই নির্যাতন বন্ধ করুন। গার্মেন্টস এলাকায় রাতের অন্ধকারে এই তাণ্ডব বন্ধ করুন। নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। পুলিশকে জনগণের বন্ধু হতে দিন, আতঙ্কের কারণ বানাবেন না।
শ্রমিকেরা রাজনীতির হাতিয়ার নন, তাঁরা দেশের প্রাণ। তাঁদের বাঁচান, তাহলেই দেশ বাঁচবে।


