Indian Mujahideen
Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:
ভারতের আধুনিক ইতিহাসের পাতায় ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন’ (Indian Mujahideen) একটি আতঙ্কের নাম। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ধারাবাহিক বোমা হামলা চালিয়ে এই গোষ্ঠীটি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিল। তাদের কর্মকাণ্ড কেবল প্রাণহানি ঘটায়নি, বরং ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতেও গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।

উত্থানের প্রেক্ষাপট: সিমির (SIMI) উগ্র রূপান্তর(Indian Mujahideen)
ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের শিকড় প্রোথিত ছিল স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া (SIMI)-এর মধ্যে। ১৯৭৭ সালে উত্তরপ্রদেশের আলিগড়ে সিমি গঠিত হয়েছিল একটি ছাত্র সংগঠন হিসেবে। তবে আশির দশকের শেষের দিকে এটি মৌলবাদী আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ২০০১ সালে নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারে হামলার পর ভারত সরকার সিমিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
এই নিষেধাজ্ঞার পরই সিমির ভেতর একটি চরমপন্থী অংশের জন্ম হয়। তারা বিশ্বাস করত যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানিয়ে কাজ হবে না, বরং সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রাম বা জিহাদ প্রয়োজন। এই ভাবনা থেকেই রিয়াজ ভাটকাল, ইকবাল ভাটকাল এবং আব্দুল সুবহান কুরেশির মতো নেতারা ২০০৫ সালের দিকে গোপনে ‘ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন’ গঠন করেন।

প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও নেপথ্য নায়ক(Indian Mujahideen)
ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনকে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্কে পরিণত করার পেছনে চারজন ব্যক্তির ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি:
* রিয়াজ ও ইকবাল ভাটকাল: কর্ণাটকের ভাটকাল শহরের এই দুই ভাই ছিল গোষ্ঠীর মূল মস্তিষ্ক। রিয়াজ ছিল সামরিক অপারেশনের প্রধান, আর ইকবাল কাজ করত আদর্শিক ও আর্থিক দিক নিয়ে।
* ইয়াসিন ভাটকাল: তাকে বলা হতো গোষ্ঠীর মাঠ পর্যায়ের কমান্ডার। বোমা তৈরি থেকে শুরু করে বিস্ফোরণ ঘটানো পর্যন্ত প্রতিটি কাজে সে সরাসরি যুক্ত থাকত।
* আব্দুল সুবহান কুরেশি (তৌকির): একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সে ছিল গোষ্ঠীর প্রযুক্তিগত এবং আইটি বিশেষজ্ঞ। হামলার পর ইমেল পাঠানো এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল তার কাজ।
* আমির রেজা খান: লস্কর-ই-তৈবার সাথে যোগসূত্র স্থাপন এবং পাকিস্তান থেকে অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহের মূল কারিগর ছিল এই ব্যক্তি।
অপারেশনাল মেথডলজি: ধারাবাহিক বিস্ফোরণের কৌশল
ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের সবচেয়ে ভয়ানক বৈশিষ্ট্য ছিল ‘সিরিয়াল ব্লাস্ট’ বা ধারাবাহিক বিস্ফোরণ। তারা একটি নির্দিষ্ট সময় বাছত এবং কয়েক মিনিটের ব্যবধানে একটি শহরের ১০ থেকে ২০টি স্থানে বোমা ফাটাত। এর উদ্দেশ্য ছিল জনমনে সর্বোচ্চ আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করা।

প্রযুক্তির ব্যবহার(Indian Mujahideen)
আইএম ছিল ভারতের প্রথম ‘টেক-স্যাভি’ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। তারা হামলা চালানোর ঠিক আগে বা পরে সংবাদমাধ্যমকে ইমেল পাঠিয়ে দায় স্বীকার করত। এই ইমেলগুলো পাঠানোর জন্য তারা অসুরক্ষিত ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক হ্যাক করত, যাতে পুলিশ তাদের লোকেশন ট্র্যাক করতে না পারে।
রক্তক্ষয়ী হামলার ইতিহাস (২০০৭-২০১৩)
আইএম-এর কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা বুঝতে তাদের কয়েকটি বড় হামলার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন:
২০০৮: ভারতের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী বছর
২০০৮ সালে আইএম ভারতজুড়ে তান্ডব চালায়।
* মে ২০০৮ (জয়পুর): ২০ মিনিটের মধ্যে ৯টি বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে ৮০ জন মানুষ মারা যান।
* জুলাই ২০০৮ (আহমেদাবাদ): মাত্র ৭০ মিনিটে ২১টি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে ৫৬ জন প্রাণ হারান। প্রথমবারের মতো তারা হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের সামনেও বোমা রেখেছিল যাতে আহতদের সাহায্য করতে আসা মানুষও মারা যায়।
* সেপ্টেম্বর ২০০৮ (দিল্লি): দিল্লির জনাকীর্ণ কনট প্লেস এবং সংলগ্ন এলাকায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণে ৩০ জন মারা যান।
পরবর্তী বড় হামলাসমূহ
* ২০১০ পুনে জার্মান বেকারি: পুনের জনপ্রিয় এই ক্যাফেতে বিস্ফোরণে ১৭ জন নিহত হন।
* ২০১১ মুম্বই বিস্ফোরণ: মুম্বইয়ের জাভেরি বাজার এবং অপেরা হাউসে হামলা চালিয়ে তারা ২৬ জনকে হত্যা করে।
* ২০১৩ হায়দ্রাবাদ ও পাটনা: হায়দ্রাবাদের দিলসুখনগর এবং পাটনার গান্ধী ময়দানে নরেন্দ্র মোদীর জনসভার আগে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা তাদের অস্তিত্বের জানান দেয়।

বাতলা হাউস এনকাউন্টার ও পতনের শুরু(Indian Mujahideen)
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লির বাতলা হাউস এনকাউন্টার ছিল আইএম-এর ইতিহাসে একটি বড় মোড়। দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল জামিয়া নগর এলাকায় আইএম-এর একটি গোপন আস্তানায় হানা দেয়। এই অভিযানে আইএম-এর অন্যতম প্রধান সদস্য আতিফ আমিন নিহত হয় এবং বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়। যদিও এই অভিযান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, কিন্তু গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী এখান থেকেই আইএম-এর কোমর ভাঙতে শুরু করে।

বর্তমান অবস্থা ও আইনি বিচার (২০২৬-এর প্রেক্ষিতে)
২০১৩ সালে বিহারের রক্সৌল সীমান্ত থেকে ইয়াসিন ভাটকালকে গ্রেফতার করা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA)-এর জন্য একটি বিরাট সাফল্য ছিল।
* আদালতের রায়: ২০১৬ সালে প্রথমবার হায়দ্রাবাদ বিস্ফোরণ মামলায় ইয়াসিনসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৫ এবং ২০২৬-এর শুরুতে বিভিন্ন উচ্চ আদালতে তাদের মামলাগুলোর চূড়ান্ত শুনানি চলছে। ইয়াসিন বর্তমানে দিল্লির তিহার জেলে কড়া পাহারায় বন্দি।
* নিষিদ্ধকরণ: ভারত সরকার ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই গোষ্ঠীকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ: স্লিপার সেল ও ডিজিটাল র্যাডিক্যালাইজেশন(Indian Mujahideen)
বর্তমানে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন একটি সংগঠিত গোষ্ঠী হিসেবে কাজ করতে পারছে না কারণ এর শীর্ষ নেতৃত্ব হয় জেলে অথবা পাকিস্তানে পালিয়ে আছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, তাদের ছোট ছোট ‘স্লিপার সেল’ এখনও সক্রিয় থাকতে পারে। এছাড়া ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্র মতাদর্শ ছড়িয়ে তরুণদের বিভ্রান্ত করার প্রক্রিয়াটি (Online Radicalization) বর্তমানে বড় চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কেবল সীমান্ত পাহারা দিলেই চলে না, বরং দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা চরমপন্থাকেও সমূলে বিনাশ করতে হয়। ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কঠোর নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতার ফলেই আজ এই



