Bangladesh Awami League Banned 2026
Bengal Liberty, নয়ন বিশ্বাস রকি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক:
বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে (Bangladesh Awami League Banned 2026) বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল-২০২৬’ পাশের মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে বিএনপি সরকার। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশের ভিত্তিতে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে সংসদে এই বিল পাস করা হয়। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র ও দেশে বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গীদের দেশবিরোধী চক্রান্তে আওয়ামী লীগ সরকারকে উৎখাত করা হয়। ক্ষমতা দখল করে সরকার উৎখাতে মূল পরিকল্পনাকারী ড. ইউনূস। তার পরিকল্পনায় এবং নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত সামনে আসে। তার পথ ধরেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার সুযোগ হিসেবে বিষয়টিকে কাজে লাগায়। অর্থাৎ ইউনূসের পথে হাঁটলেন তারেক।

গণতান্ত্রিক চর্চা বনাম প্রতিহিংসার রাজনীতি
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার প্রশ্নটি ঘিরে বর্তমান রাজনীতি ক্রমেই আরও সংঘাতমুখী হয়ে উঠছে। অনেকের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী না করে বরং প্রতিহিংসার রাজনীতিকে উসকে দিল। বিশেষ করে ড. ইউনুসের অবস্থান ও তারেক রহমানের রাজনৈতিক কৌশল—এই দুইয়ের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল সম্পর্ক স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কি সত্যিই কোনো সমস্যার সমাধান, নাকি এটি নতুন করে দ্বন্দ্বের জন্ম দেবে—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য শুভ নয়।
জনগণের ম্যান্ডেট ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বৈপরীত্য (Bangladesh Awami League Banned 2026)
বাংলাদেশের জনগণসহ বিশ্ববাসী জানেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়নি। দেশে সাম্প্রদায়িক, ধর্মভিত্তিক ও মৌলবাদী রাজনীতির বিস্তার রোধে আওয়ামী লীগের লক্ষ লক্ষ কর্মী-সমর্থক বিএনপি’কে ভোট দিয়েছেন। সবাই আশা করেছিলেন, ড. ইউনূসের অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিনাশী বিভক্তিমূলক রাজনীতির লাগাম টানা হবে। ওই নির্বাচনে বিএনপি’র অন্যতম শ্লোগান ছিল ‘ভোট দিবেন ধানের শীষে, দেশ গড়ব মিলেমিশে’। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষের সমর্থিত দেশের সবথেকে পুরনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে তারা কীভাবে “মিলেমিশে দেশ গড়বে” তা বোধগম্য নয়।

মব-সংস্কৃতি ও অন্তবর্তী সরকারের বিতর্কিত অধ্যাদেশ
বিএনপি অন্তবর্তী সরকারের অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করছে। কিন্তু অন্তবর্তী সরকারের অনেক অধ্যাদেশ, গণভোট, জুলাই সনদকে তো সরকার আমলে নিচ্ছে না। তাছাড়া, অন্তবর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কীভাবে নিষিদ্ধ করেছিল? সরকারের মদদে হৃষ্টপুষ্ট গৃহপালিত মব-বাহিনীকে বিরিয়ানির প্যাকেট আর শীতল পানি সরবরাহ করে আন্দোলনের নাটক সাজানো হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৯ মে যমুনার সামনে সাজানো এই আন্দোলনে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবিরসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও যোগ দেয়। এর মাধ্যমে তারা একদিকে যেমন একাত্তরে তাদের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে, অপরদিকে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ভোটের সুবিধা আদায়ের পরিকল্পনা করে। একটি মব-আন্দোলনের মুখে সরকার গভীর রাতে প্রজ্ঞাপন দিয়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। বস্তুত, অন্তবর্তী সরকার নিজেই ছিল কথিত এই আন্দোলনের নেপথ্য কারিগর।
তারেক রহমানের ইউ-টার্ন: অতীত প্রতিশ্রুতি ও বর্তমান বাস্তবতা (Bangladesh Awami League Banned 2026)
বিএনপি সব সময় নিজেদেরকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারক-বাহক বলে গর্ববোধ করে। বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। অনেকে আশা প্রকাশ করেছিলেন, পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে শক্তিশালী করবেন। বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের কয়েকদিন পরেই তিনি টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা তিনি সমর্থন করেন না।’ তিনি বিশ্বাস করেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোন দল রাজনীতি করবে আর কোন দল বর্জিত হবে, তা নির্ধারণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা জনগণের এবং তা ব্যালটের মাধ্যমেই হওয়া উচিত।

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করে দেশে আইনের শাসন ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর প্রথম অগ্রাধিকার। অতঃপর নির্বাচনে জয়লাভের পর তিনি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘জনগণ যদি কাউকে গ্রহণ করে, জনগণ যদি কাউকে স্বাগত জানায়, তবে যে কারো রাজনীতি করার অধিকার আছে।’ তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, ‘শেখ হাসিনার সন্তানদের রাজনীতিতে ফেরার বিষয়টি কোনো আইনি বাধা বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয় হওয়া উচিত নয়; বরং এটি সম্পূর্ণভাবে জনগণের ম্যান্ডেট বা সমর্থনের ওপর নির্ভর করে।’ জাতীয় সংসদে আইন করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের সাথে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

জনমত উপেক্ষা: আওয়ামী লীগমুক্ত নির্বাচনের নেপথ্য কৌশল
বিএনপি’র ৩১ দফা, নির্বাচনি ইশতেহার ও প্রচারণার কোথাও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি বা বক্তব্য ছিল না। এমনকি জামায়াতে ইসলামীও অনুরূপ কোনো বক্তব্য দেয়নি। বরং সবাই আওয়ামী লীগের ভোট টানার রাজনীতি করেছে। বস্তুত, নির্বাচনে কোনো দলেরই এ বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি ছিল না। সুতরাং এ বিষয়ে জনগণেরও কোনো ম্যান্ডেট নেই। এখন জাতীয় সংসদে সরকারি দল ও তাদের আস্থাভাজন বিরোধী দল মিলেমিশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আইন প্রণয়ন করলে তাকে আর যা-ই হোক, জনমতের প্রতিফলন বলা যায় না। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করলে ফলাফল অন্যরকম হতে পারতো। আবার জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখ্যানও করতে পারতো। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার এবং আওয়ামী-বিরোধী শক্তি কোনো ঝুঁকি নেয়নি। নিজেদেরকে নিরাপদ রাখতে তারা পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগমুক্ত নির্বাচন করেছে।
ইতিহাসের শিক্ষা: নিষিদ্ধ করে কি আদর্শ মোছা যায়? (Bangladesh Awami League Banned 2026)
রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার রাজনীতি নতুন নয়। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার পর আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। ১৯৬৪ সালে মুসলিম পরিবার আইনের বিরোধিতার কারণে আইয়ুব খান জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। স্বাধীনতার বিরোধিতা করায় ১৯৭২ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করে। সবশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ০১ আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামি ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়।

উল্লেখিত কোনো নিষেধাজ্ঞাই অনন্তকাল টিকে থাকেনি। অনেক ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার পর কোনো কোনো রাজনৈতিক দল বিপুল বিক্রমে প্রত্যাবর্তন করেছে। সুতরাং রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে সাময়িক সুবিধা পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল পাওয়ার দৃষ্টান্ত খুব বেশি নেই। মুসলিম লীগ কিংবা ফ্রিডম পার্টিকে নিষিদ্ধ করে নয়, জনগণই বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল দু’টিকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিষয়ে সরকার জনগণের উপর আস্থা রাখতে পারেনি।
প্রতিহিংসার বৃত্ত ও আগামীর শঙ্কা (Bangladesh Awami League Banned 2026)
বাংলাদেশের রাজনীতি বরাবরই সংঘাতময় ও প্রতিহিংসামূলক। যারা ক্ষমতায় থাকেন তারা তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিষয়ে চূড়ান্তরকম অসহিষ্ণুতা দেখান। প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির অবসান হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার একটি শুভ সূচনা করতে পারতো। কিন্তু তারা কেবল রাজনৈতিক বিভক্তি নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, স্বাস্থ্য, বিনিয়োগ, উৎপাদন প্রতিটি ক্ষেত্রেই চরম ব্যর্থতার সাক্ষর রেখে গেছে। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও শক্তিশালী গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির চর্চা না হওয়া সত্যিই হতাশার। এখন মানুষ তাকিয়ে আছে বর্তমান সরকারের দিকে। রাজনৈতিক বিভক্তি ও প্রতিহিংসা উন্নয়নের সুযোগকে সীমিত করবে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলে স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠী হয়ত খুশি হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই।
Democracy or Decree? The Ban, the Indemnity, and the Future of Bangladesh https://t.co/dZJje9QuhW
— Bangladesh Awami League (@albd1971) April 12, 2026
জনগণের ভালোবাসাই শেষ কথা (Bangladesh Awami League Banned 2026)
আমি মনে করি, এভাবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিল পাশ—এটি নিছক একটি আইনগত পদক্ষেপ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনা হলো বহুমতের সহাবস্থান। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি দল। এই দলটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বা আইনি অভিযোগ থাকলে তা বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত, কোনো রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়।
ইতিহাস বলছে, কোনো দলকে নিষিদ্ধ করে দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা যায় না। আজ যদি একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, কাল অন্য দলও একই পরিণতির শিকার হতে পারে। পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোটি কোটি সমর্থকের দল, মাঠে রয়েছে লাখো কর্মী, দলটির প্রতি রয়েছে ১৮ কোটি মানুষের ভালোবাসা। সকলের ভালোবাসা নিয়েই ফিরবে আওয়ামী লীগ। এই ভালোবাসাই ফিরাবে আওয়ামী লীগকে। কোন নিষেধাজ্ঞাই আটকাতে পারবে না জনগণের এই দলকে।
আরও পড়ূন:
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী (Bangladesh Politics 2026): স্বচ্ছ রাজনীতিকের ওপর অস্বচ্ছ থাবা
