Bengal Liberty, নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী:
মহাকালের নির্মম নিয়মে এশিয়া উপমহাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের পতন ঘটল। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের অগ্রনায়ক এবং বারবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ (Tofail Ahmed Death) নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অনন্তলোকের পথে যাত্রা করেছেন।

তিনি দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জীবনের শেষ দিনগুলোতেও তাঁর ওপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার খড়গ নেমে এসেছিল। মিথ্যা মামলা, বানোয়াট অভিযোগ আর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকারে পরিণত করা হয়েছিল। হাসপাতালের শয্যায় যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখনও তাঁর নামে পরোয়ানা ঝুলছিল। এটি বর্তমান প্রশাসনের আইনের শাসনের এক চরম নেতিবাচক দৃষ্টান্ত— যেখানে একজন মৃত্যুপথযাত্রী প্রবীণ নেতাকেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ভেবে দমনের চেষ্টা করা হয়।এমনকি তাঁর মৃত্যুর পরও সেই বৈরিতা থামেনি। তাঁর শেষ জানাজা পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন হয়েছে। পুলিশ বাহিনী দিয়ে জানাজার মাঠ ঘিরে ফেলা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত আওয়ামী লীগের প্রায় ৬০ জন নেতাকর্মীকে বিনা অভিযোগে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে।
আজ জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন (Tofail Ahmed Death)—
এই কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ? এই কি আইনের শাসন? রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের সেবক, নাকি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ারে রূপান্তরিত হয়েছে?
তবে সমস্ত বাধা ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে তোফায়েল আহমেদের জানাজায় হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছিল। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার রাজপথ। শোকাহত মানুষের অশ্রুসিক্ত চোখ আর বজ্রকণ্ঠের স্লোগান প্রমাণ করেছে— তোফায়েল আহমেদ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি ইতিহাস, একটি অবিনশ্বর অনুভূতি। বাংলার অলিগলি ও প্রান্তরে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও স্মৃতি মিশে আছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন তিনি। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় ও স্বাধিকার আন্দোলনে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা ছিল অনন্য ও অগ্রগণ্য। এক সময়ের তুখোড় এই ছাত্রনেতা বাঙালি জাতিকে বহু সংকটে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। অথচ দুঃখজনকভাবে, বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁকে ন্যূনতম রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতেও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।

লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণের দাবি ছিল— মহান জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হোক। কিন্তু বর্তমান সরকার সেই নূন্যতম সম্মানটুকু প্রদর্শন করেনি, বরং সেখানেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। পরিবারের অভিযোগ— উপযুক্ত সুচিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে, এক প্রকার অবহেলা ও বন্দি দশার মধ্য দিয়ে তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আইনের শাসন কি তবে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত? (Tofail Ahmed Death)
আজ দেশবাসীর মনে গভীর প্রশ্ন জাগে— আইনের শাসন কি তবে বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত? মানবাধিকার কি আজ ভূলুণ্ঠিত? বাকস্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করে কালো আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। যে দলের পেছনে কোটি কোটি কর্মী-সমর্থকের আবেগ জড়িয়ে আছে, যে দল বারবার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে এবং দেশের উন্নয়নে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে, তাকে স্তব্ধ করার চেষ্টা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

দেশবাসী দেখছে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিরপেক্ষতা হারিয়ে একপেশে ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা উচিত— এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের বেতন হয় এদেশের সাধারণ মানুষের রক্ত-ঘামের করের টাকায়। ইতিহাস সাক্ষী— যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, ইতিহাস তাদের কখনো ক্ষমা করে না। ক্ষমতার দম্ভ চিরস্থায়ী নয়; আজ যারা ক্ষমতার মত্ততায় বুঁদ হয়ে আছেন, তাদের এই ভূমিকাও ইতিহাসের পাতায় কালো অক্ষরেই লিপিবদ্ধ থাকবে।
জনগণের এই ক্ষোভ ও অসন্তোষ বৃথা যাবে না। তোফায়েল আহমেদের জানাজায় জনতার যে বাঁধভাঙা জোয়ার এবং বজ্রনির্ঘোষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেখা গেছে— তা প্রমাণ করে যে অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মনের ক্ষোভ যেকোনো সময় গণজাগরণে রূপ নিতে পারে।
এই কিংবদন্তি রাজনীতিবিদের চিরবিদায়ে আমি তাঁর আত্মার মাগফেরাত ও চিরশান্তি কামনা করি। তিনি তাঁর কর্ম, ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে এবং কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
আরও পড়ুন:
দেশের ক্রান্তিকালে একটি মাত্র নাম— মুক্তির শেখ হাসিনা

