Anti Music
Bengal Liberty: যতবার ‘অ্যান্টি মিউজিক’ বা প্রথাবিরুদ্ধ সংগীত নিয়ে কিছু লিখতে গিয়েছি, ততবার-ই আমার মনে হয়েছে, শিল্প বিপ্লব না-ঘটলে হয়তো এমন জ্যঁর আবিষ্কার-ই হ’ত না (Anti Music)। মেশিনের কর্কশ, ভারী-ভারী যন্ত্রপাতির টুংটাং, ঠকঠক শব্দের মধ্যেও সংগীত খুঁজে পাওয়া সম্ভব! শুধুমাত্র ইচ্ছে, সাধনা, সাহস, এবং কানের প্রগতি প্রয়োজন। ১৯১৩ সালে ‘ফিউচারিস্ট’ আন্দোলনের শরিক লুইগি রুসোলো ‘দ্য আর্ট অফ নয়েজ’ নামে একটি ইশতেহার রচনা করেন।
সেখানে তাঁর দাবি― শিল্প বিপ্লব সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন জটিল শব্দ শোনার কান তৈরি করে দিয়েছে। প্রচলিত সংগীতের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শব্দগুলো মিশে যা তৈরি হচ্ছে, সেটা জাদুর থেকে কিছু কম নয়। ডেনমার্কের ‘অ্যান্টি মিউজিক’ বিশেষজ্ঞ তরবেন সানগ্লিড এবং মারে শ্যাফার-ও একই মত পোষণ করেছেন। এছাড়াও, এই ঘরানার সংগীত নিয়ে ব্রিটিশ প্রাবন্ধিক জন ডোরান-ও মতামত পেশ করেছেন (Anti Music)। তবে, সেটা জানার আগে ‘অ্যান্টি মিউজিক’ কি, সেটা নিয়ে প্রথমে চর্চা করে নেওয়া যাক।

যে সংগীত প্রথাবিরুদ্ধ, সুর-তাল থেকে বেরিয়ে বিকল্প অস্বস্তিকর আবহ শ্রোতাদের সামনে তৈরি করে, তাকেই আমরা এক কথায় ‘অ্যান্টি মিউজিক’ আখ্যা দিয়ে থাকি। এই সংগীতের নেপথ্যে নির্দিষ্ট দর্শন থেকে থাকে। বস্তুত, কোন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এমন জ্যঁর প্রকাশ পাচ্ছে, সেটার ওপর ভিত্তি করেই ‘অ্যান্টি মিউজিক’-এর মূল্যায়ন করা উচিত হবে (Anti Music)। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, শব্দ সংগীত বা নয়েজ মিউজিক, আঁভাগার্দ, জাপানয়েজ, ইত্যাদি ‘অ্যান্টি মিউজিক’ বা প্রথাবিরুদ্ধ সংগীতের অঙ্গ।
জন ডোরানের মতে― শব্দ সংগীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও ব্যাকরণ নেই। এই ঘরানার সংগীত তৈরি করতে গেলে একজন শিল্পীকে ‘শব্দ’ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে হবে। সঙ্গে চাই দক্ষতা এবং নিষ্ঠা।

সূচনাটা হয়েছিল উগো পিয়াত্তি, লুইগি রুসোলো এবং ফিলিপ্পো মারিনেত্তির হাত ধরে। সময়টা, ১৯১০-’১৩ সাল। এই ৩ বছর ধরে উভয়ের প্রচেষ্টায় ‘ইন্তোনারুমরি’ নামে একটি নয়েজ মেশিন বা শব্দ যন্ত্র নির্মিত হয়। এরপর থেকে কর্কশ শব্দ এবং সংগীতের যৌথ মিশেলে চলতে থাকে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা।
উল্লেখ্য, রুসোলো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের পক্ষে ছিলেন। আর, সেই সুবাদে তিনি তাঁর কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৎকালীন সরকারের থেকে আর্থিক সাহায্য-ও পেয়েছিলেন। সেই সময়ে ফ্যাসিস্ট ইশতেহারের (Fascist Manifesto) সহ-লেখক তথা ইতালির কবি এবং ফিউচারিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ফিলিপ্পো মারিনেত্তির সঙ্গে রুসোলো ধারাবাহিকভাবে একাধিক কাজ করে চলেছেন।

দীর্ঘ ৪ বছর বিস্তারিত গবেষণার পর ১৯১৭ সালের ‘গ্র্যান কনসার্টো ফিউচারিস্টিকো’-তে ইন্তোনারুমরির সাহায্যে প্রথাবিরুদ্ধ সংগীত উপস্থাপনা করেন রুসোলো। তিনি আগে থেকেই জানতেন যে, এই ধারার সংগীত শোনার মতো কান শ্রোতাদের তৈরি হয়নি। ফলে, শেষ পর্যন্ত দর্শক এবং শ্রোতাদের একটা অংশের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয় রুসোলোর ফিউচারিস্ট দলকে। অবশ্য, এই ঘটনার ৩ বছর আগে ১৯১৪ সালের এপ্রিলে ফিউচারিস্ট সংগীতের প্রথম অনুষ্ঠানে যৌথভাবে অংশ নেন মারিনেত্তি এবং রুসোলো (Anti Music)।
এখানেও ইন্তোনারুমরি যন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়। শোনা যায়, ১৯১৯ সালে বার্লিনে-ও অ্যান্টি সিমফনিক কনসার্টে ইন্তোনারুমরির সাহায্যে সংগীত পরিবেশন করেন রুসোলো। পরবর্তীতে তাঁর সমস্ত বাদ্যযন্ত্র নানা কারণে নষ্ট হয়ে যায়। তবে, সেগুলোর একাধিক স্কেচ বা ছবি এখনও পর্যন্ত বর্তমান। এছাড়াও, সংশ্লিষ্ট যন্ত্রগুলোর দ্বারা রেকর্ড হওয়া কিছু শব্দ সংগীত-ও ইন্টারনেটে মিলবে।

‘অ্যান্টি মিউজিক’-এর অগ্রগতির ক্ষেত্রে ‘আঁভাগার্দ’, ‘ডাডা’ গোষ্ঠীর শিল্পীদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাঁদের হাত ধরে এই ঘরানার সংগীত বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা বেয়ে একাধিক দেশে পৌঁছে গিয়েছে। যেমন― আমেরিকা, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস।
’৭০ সালের শুরু থেকে সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত জাপানে ‘অ্যান্টি মিউজিক’-এর নামে নয়েজ বা শব্দ সংগীত তার প্রভাব বৃদ্ধি করে চলেছে। যাকে আমরা ‘জাপানয়েজ’ বলে থাকি। এই জ্যঁরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীরা হলেন― মার্জবো, হিজোকায়দান, হানাটারাশ, মেল্ট ব্যানানা। ইন্দোনেশিয়াতে এই জ্যঁরের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইনসেন নয়েজ মিউজিক’।
নয়েজ ছাড়াও গোটা বিশ্বজুড়ে ‘অ্যান্টি মিউজিক’ আরও একাধিক পদ্ধতি এবং ধারায় বিভক্ত। যেমন― আঁভাগার্দ সংগীত শিল্পী শার্লট মুরম্যান চেলোর মাধ্যমে প্রথাবিরুদ্ধ শব্দ এবং সংগীতের জন্ম দিয়ে গিয়েছেন (Anti Music)। এক্ষেত্রে, ১৯৭২ সালে লন্ডনে আয়োজিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কার্নিভাল অফ এক্সপেরিমেন্টাল সাউন্ড’ নামক অনুষ্ঠানটির কথা আমাদের প্রায় সকলের-ই জানা।
আরো পড়ুন:-
Argentina : বিশ্বকাপে স্বপ্নভঙ্গ, সাথে বিপুল আর্থিক দুর্নীতি! বারবার বিতর্কে আর্জেন্টিনা
যেখানে, শার্লট মুরম্যান নগ্ন অবস্থায় বরফের একটি বৃহৎ খণ্ডকে চেলোর মতো বজানোর মধ্যে দিয়ে ‘আইস মিউজিক’ তৈরি করেছেন। পাশাপাশি, অন্যান্য ক্ষেত্রে তিনি মিসাইল, টেলিভিশন দিয়ে চেলো নির্মাণ করে একের পর এক প্রথাবিরুদ্ধ সংগীতের সূচনা করে গিয়েছেন।
শেষের আগে লিখে দেওয়া ভালো যে, শিল্প বিপ্লব না-ঘটলে এবং নানা ধরনের আঁভাগার্দ আন্দোলন না-থাকলে হয়তো ‘অ্যান্টি মিউজিক’ বিশ্ব সংগীত অভিধানে নিজের স্থান করে নিতে পারত না। এবং, আমিও বিষয়টা নিয়ে লেখার আগ্রহ পেতাম না।

