Kalyan Banerjee
Bengal Liberty : ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের ফাটল এখন প্রকাশ্য রাজপথে। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণটি ঘটিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা ছায়াসঙ্গী ও শ্রীরামপুরের চারবারের প্রবীণ সাংসদ-আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সই জাল মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী পদ থেকে তাঁর আকস্মিক সরে দাঁড়ানো এবং দলনেত্রীর উদ্দেশে দেওয়া চরম হুঁশিয়ারি— “হয় অভিষেককে রাখুন, নয় আমাদের ছেড়ে দিন”— রাজ্যের রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে।
তৃণমূলের ভরাডুবি পরিস্থিতিতে কেন বিদ্রোহী কল্যাণ : (Kalyan Banerjee)
১. দিদির ‘ছাঁকনি’ রাজনীতি (Kalyan Banerjee)
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল অভিমান স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর। তাঁর ক্ষোভ, বিগত ১৫ বছর ধরে যাঁরা দলের জন্য রক্ত-ঘাম দিলেন, তাঁদের আজ কোণঠাসা করা হচ্ছে। লোকসভায় মুখ্য সচেতক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার সময় কল্যাণ বলেছিলেন, দিদি তাঁর ওপর আস্থা রাখতে পারেননি এবং তাঁর প্রতি ‘অবিচার’ করেছেন। কল্যাণের অভিযোগ, দল বা সাংসদদের আসল অভাব-অভিযোগের কথা মমতা ও অভিষেকের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। মাঝে কিছু লোক ‘ছাঁকনি’ বা ফিল্টার হিসেবে কাজ করে আসল সত্যটা আড়াল করে রাখছে।

২. অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক সিদ্ধান্ত ও ক্ষোভ (Kalyan Banerjee)
দলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যায়, অভিষেকের ‘অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস’ ও ‘একক সিদ্ধান্তের রাজনীতি’ প্রবীণ এই নেতা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। সই জাল মামলায় শুনানি শুরুর ঠিক আগের মুহূর্তে জুনিয়র আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্যকে প্রধান করায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন কল্যাণ। তাঁর সাফ কথা, “আমি এই পেশায় ৪৫ বছর আছি। এই উদ্ধত মনোভাব মেনে নেব না।” ক্ষোভ উগরে দিয়ে কল্যাণ স্পষ্ট জানান, অভিষেকের ভুল সিদ্ধান্তের জন্যই আজ দলের এই দশা।
৩. আইপ্যাক (I-PAC) ও প্রশান্ত কিশোরের ওপর দায় (Kalyan Banerjee)
তৃণমূলের এই সাংগঠনিক বিপর্যয়ের জন্য সরাসরি প্রশান্ত কিশোর ও তাঁর সংস্থা ‘আইপ্যাক’ (I-PAC)-কে দায়ী করেছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। কল্যাণের দাবি, আইপ্যাকের ভুল ও ব্যবসায়িক রাজনীতির কারণে তৃণমূলের মূল সংগঠনটাই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আইপ্যাকের কথায় টিকিট বণ্টন হওয়ায় বহু যোগ্য ও পুরনো নেতা টিকিট পাননি। তাঁরা নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে বা বিজেপির সঙ্গে তলে তলে হাত মিলিয়ে দলের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করেছেন। কল্যাণের আক্ষেপ, এই সর্বনাশটি তিনি সময়মতো দলকে বোঝাতে পারেননি।

৪. সহকর্মী মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে চরম সংঘাত (Kalyan Banerjee)
কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের সঙ্গে কল্যাণের আদায়-কাঁচকলায় সম্পর্ক বহুদিনের। সম্প্রতি কসবার একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মহুয়া কল্যাণকে ‘নারীবিদ্বেষী’ বলে কটাক্ষ করলে কল্যাণ তীব্র পাল্টা আক্রমণ করেন। কল্যাণ প্রকাশ্যে বলেন, “আমি সব নারীকে সম্মান করি, কিন্তু মহুয়া মৈত্রকে ঘৃণা করি।” সংসদে মহুয়ার বিরুদ্ধে বিজেপি সাংসদ রাজীব প্রতাপ রুডি যখন সুর চড়িয়েছিলেন, তখন দলের উপদলনেত্রী শতাব্দী রায় কেন চুপ ছিলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
৫. ক্ষমতাচ্যুতির পর কল্যাণের বাস্তব দর্শন (Kalyan Banerjee)
ভোটের পর ক্ষমতা চলে যাওয়ার পর থেকেই কল্যাণের গলায় শোনা যাচ্ছে এক অদ্ভুত বৈরাগ্য ও বাস্তববাদী দর্শন, যা আগে তাঁর মুখে দেখা যায়নি। তৃণমূলের হার নিয়ে তিনি বিস্ফোরক ভঙ্গিতে বলেন, “উত্থান হলে পতন হবেই, তৃণমূলকে হারাল তৃণমূলই। ক্ষমতা চিরকাল কারও কাছে থাকে না, যারা এটা মানতে পারে না তারা ভুল করে।” কল্যাণের মতে, দলের নেতাদের মধ্যে ‘অহংকার’ বেশি হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা মানুষের জন্য না ভেবে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলেন।

তবে কি দল ছাড়ছেন কল্যাণ ? (Kalyan Banerjee)
দিল্লিতে কাকলি ঘোষ দস্তিদার, শতাব্দী রায়দের মতো ২০ জন সাংসদ যখন এনডিএ (NDA)-তে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়ে ‘বিদ্রোহী’ হয়েছেন, তখন কল্যাণ কিন্তু নিজেকে এখনও ‘মমতা-অনুগামী’ বলেই দাবি করছেন। তিনি বিদ্রোহীদের ‘গদ্দার’ ও ‘দোআঁশলা’ বলেও আক্রমণ করেছেন।
কিন্তু একদিকে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই, অন্যদিকে দলের ভেতরে অভিষেকের ‘উপেক্ষা’— এই দুয়ের মাঝে পড়ে প্রবীণ এই আইনজীবী সাংসদ এখন চরম একাকী ও কোণঠাসা। আর সেই কারণেই হয়তো চণ্ডীতলা থানায় বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে মাথায় চোট পাওয়ার পর রাজ্য পুলিশের ওপর ভরসা না রেখে তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, “আমার দরকার ফুরিয়ে গিয়েছে, এবার দিদিই দল চালান!”

