Pele
বিট্টু রায়চৌধুরী, Bengal Liberty: নাইজেরিয়া গৃহযুদ্ধ (১৯৬৭-১৯৭০) আফ্রিকার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ঙ্করতম এবং রক্তাক্ত অধ্যায়। ৬ জুলাই ১৯৬৭-তে বায়াফ্রা প্রদেশের পৃথকীকরণ নিয়ে গৃহযুদ্ধের সূচনা ঘটে। চলে ১৫ জানুয়ারি ১৯৭০ পর্যন্ত, টানা ৩ বছর। এই সময়ের মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ বিয়াফ্রান অধিবাসীর খাদ্যাভাবে মৃত্যু হয়। (Pele)
নাইজেরিয়ার লেখক চিনুয়া আচেবের ‛দেয়ার ওয়াজ অ্যা কান্ট্রি: অ্যা পারসোনাল হিস্ট্রি অব বিয়াফ্রা’ এই গৃহযুদ্ধের দিনপঞ্জি। বায়াফ্রা ছিল আচেবের নিজ এলাকা। ফলে, যুদ্ধের ভয়াবহতা সরাসরি প্রত্যক্ষ করতে পেরেছিলেন তিনি। বইটি পড়লে যুদ্ধের অন্ধকার দিকগুলো অবশ্যই আঁচ করতে পারবেন পাঠকগণ। সেই যাই হোক, এবার আসল কথায় আসা যাক।

অনেকের মতে, এই সময়কালের মধ্যে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধ-বিরতি সম্ভব হয়েছিল। এবং, সমগ্র ঘটনার মূলে ছিলেন, কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে। সি.এন.এন, বি.বি.সি, টাইম ম্যাগাজিন, দ্য টেলিগ্রাফের মতো পাশ্চাত্য সংবাদ মাধ্যমগুলোরও একই দাবি। যদিও, বিষয়টার প্রেক্ষিতে এই মুহূর্তে একাধিক প্রশ্ন, জল্পনা, পাল্টা যুক্তি রয়েছে। আজও অনেকে মানতে নারাজ যে, পেলের জন্যই যুদ্ধ-বিরতি বাস্তবায়িত হয়েছিল। এক্ষেত্রে দু’টি কারণকে সামনে রাখা হয়। প্রথমত, ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত পেলে তাঁর প্রথম আত্মজীবনী, ‛‛আমার জীবন এবং এই সুন্দর খেলা’’-তে (My Life and the Beautiful Game) এই ঘটনার কথা উল্লেখ করেননি। দ্বিতীয়ত, তৎকালীন স্থানীয় দুই প্রথম শ্রেণির সংবাদপত্র নাইজেরিয়ান ডেইলি টাইমস, নাইজেরিয়ান অবজার্ভার-এও পেলের এই কৃতিত্বের কথা উল্লেখ নেই। যদিও, সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০০৭ সালে ‛‛পেলে: আমার আত্মজীবনী’’-তে (PELE: THE AUTOBIOGRAPHY) ফুটবল সম্রাট ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধ-বিরতির বিষয়টা উত্থাপন করেন। তাঁর কথায়, ‛‛প্রদর্শনী ম্যাচের জন্য গৃহযুদ্ধ থামানো হবে বলে খেলোয়াড়দের জানানো হয়েছিল। এক্ষেত্রে ব্রাজিলের দুশ্চিন্তার শেষ ছিল না। নাইজেরিয়া থেকে আমাদের বলা হয়, খেলার সময় বায়াফ্রানরা কোনওভাবেই আক্রমণ করবেন না।’’
একদিকে যখন পেলে তাঁর দ্বিতীয় আত্মজীবনীতে যুদ্ধ-বিরতির কথা উল্লেখ করেছেন, তখন ‛আফ্রিকা ইজ অ্যা কান্ট্রি’ নামে মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইট দাবি করছে, ঘটনাটিকে অতিরঞ্জিত করে দেখানো হচ্ছে।
কি ঘটেছিল সেদিন? (Pele)
‛আফ্রিকা ইজ অ্যা কান্ট্রি’-তে ওলাওজো আইয়েগাবোইয়ারের তরফে পেশ করা তথ্য মোতাবেক, ৬-এর দশকের শেষে ব্রাজিলের ফুটবল ক্লাব ‛স্যান্টোস এফ.সি’ আফ্রিকা মহাদেশের কঙ্গো, ঘানা, মোজাম্বিক, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়াতে ট্যুর করছে। ক্লাবটির মূল আকর্ষণ ছিলেন পেলে। নাইজেরিয়াতে স্থানীয় ফুটবল টিমের বিরুদ্ধে প্রদর্শনী ম্যাচ খেলতে হাজির স্যান্টোস।
১৯৬৯-এর ৪ ফেব্রুয়ারি, বেনিন শহরে আয়োজিত প্রদর্শনী ম্যাচে স্যান্টোস ২-১ গোলে নাইজেরিয়ার স্থানীয় একাদশকে পরাজিত করে। যদিও, এই ম্যাচের কারণে যুদ্ধ-বিরতির যে তত্ত্ব খাড়া করা হচ্ছে, সেটা কাল্পনিক। ওলাওজো লিখছেন, পশ্চিমী মিডিয়া যুদ্ধ-বিরতির ক্ষেত্রে পেলেকে কৃতিত্ব দেয়। তবে, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে এই মর্মে কোনও খবর প্রকাশিত হয়নি। ওলাওজো’র ভাষায়―‛‛The ceasefire story is a myth, despite the reports of this story on websites like CNN, Time, The Guardian, The Telegraph, Goal.com, Wikipedia, Globoesporte.com, etc. There is no reported Nigerian evidence of this story. Two key Nigerian newspapers – Nigerian Daily Times (Lagos) and Nigerian Observer (Benin) – were researched for this piece. There was no mention of a civil war ceasefire for a Santos match in the 1969 issues of these two newspapers.’’

ফরাসি-ব্রাজিলিয়ান ক্রীড়া সাংবাদিক মাইকেল লরেন্স জানাচ্ছেন, ‛আমি বিষয়টা নিয়ে সেই অর্থে নিশ্চিত নই। তবে, ২০০৭ সালে লেখা পেলে তাঁর জীবনীতে ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ-বিরতির কথা উল্লেখ করেন। সেদিন নাইজেরিয়া প্রশাসন জানিয়েছিল, কোনওভাবেই গৃহযুদ্ধের প্রভাব স্যান্টোসের ওপর পড়বে না। সেই সময় বিশাল সেনা বাহিনী সমগ্র রাস্তায় মোতায়েন ছিল। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কোথাও গিয়ে যেন মাইকেল লরেন্সের বয়ান ওলাওজো আইয়েগাবোইয়ারের তত্বকে খণ্ডন করছে।
যুক্তি, পাল্টা যুক্তি তো থাকবেই। তবে, বাস্তবে যদি ৪৮ ঘণ্টা যুদ্ধ-বিরতি হয়, তার কৃতিত্ব বর্তায় স্যান্টোস এফ.সি-র ওপর। পেলে ক্লাবের মূল আকর্ষণ ছিলেন ঠিকই। কিন্তু, নাইজেরিয়া প্রশাসন চাইছিল, স্যান্টোসের ওপর যাতে কোনওভাবে আক্রমণ নেমে না-আসে। ফলে, রাস্তায় এত মিলিটারি, পুলিশ। বলা বাহুল্য যে, এই সময়ের মধ্যে নাইজেরিয়ায় একটাও গুলি চলেনি, বোমা-ও ফাটেনি।

