BNP
BNP

বর্তমানে চট্টগ্রামের ক্রাইসিস কি, সেন্টমার্টিন কক্সবাজার যদি বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যায় ভবিষ্যতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সাজেকে কি হচ্ছে কৌশল করে কি পর্যটক শূন্য করা হচ্ছে

Bengal Liberty : কলামিস্ট, নয়ন বিশ্বাস রকি
_সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী

বাংলাদেশের পর্যটনের রাজধানী বলা হয় বৃহত্তর চট্টগ্রামকে। সেই চট্টগ্রাম আজ এক গভীর সংকটে। একদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাজেক ভ্যালি, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের বুকে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন। দুটি জায়গাই আজ পর্যটকশূন্য। যদি এই ধারা চলতে থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে সেন্টমার্টিন-কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

সাজেকে কি হচ্ছে? কৌশল করে পর্যটকশূন্য করার ষড়যন্ত্র?

পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় গন্তব্য সাজেক ভ্যালি আজ ১৪ দিন ধরে অচল। গত ১১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ ও ‘সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন’ তিন দফা দাবিতে খাগড়াছড়ি-সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ডেকেছে।

তাদের অভিযোগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-সন্তু গ্রুপ) এর সশস্ত্র সদস্যরা মাচালং, থলছড়া, ভুইয়োছড়ি, লাম্বাবাক এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে শতাধিক সাধারণ পাহাড়ি পরিবারকে উচ্ছেদ করেছে।

এর জের ধরে গত ২২ অক্টোবর ২০২৫ বুধবার সকাল ৬টায় অবরোধকারীরা সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিং শুরু করে। ওইদিন সাজেকে আটকা পড়েন ২,৯৩৩ জন পর্যটক। পরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ এসকর্টে তাদের খাগড়াছড়িতে সরিয়ে আনা হয়। উজোবাজার এলাকায় এসময় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর দফায় দফায় গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।

এই ঘটনার পর ২১ অক্টোবর ২০২৫ সন্ধ্যা ৭টায় রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক ভ্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি আজও পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্যের লড়াই, চাঁদাবাজি এবং নিরাপত্তা সংকটকে ব্যবহার করে সাজেককে কৌশলে পর্যটকশূন্য করা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রায় ৩০০ রিসোর্ট-কটেজ, হাজারো পরিবহন শ্রমিক ও ৩০ হাজার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। এটি শুধু পর্যটন সংকট নয়, এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা সংকট।

অন্যদিকে সেন্টমার্টিনে চলছে ভিন্ন সংকট। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ২২ অক্টোবর ২০২৫ এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি বছরে ৯ মাস বন্ধ থাকে।

২০২৫-২৬ মৌসুমের নিয়ম ছিল এমন:
নভেম্বর মাসে শুধু দিনের বেলা ভ্রমণ (রাত্রিযাপন নিষিদ্ধ) ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে দৈনিক সর্বোচ্চ ২,০০০ পর্যটক রাত্রিযাপন- ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সম্পূর্ণ বন্ধ

সরকারের যুক্তি, ১৯৯৯ সালে ৫৯০ হেক্টর এলাকাকে Ecologically Critical Area (ECA) ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বীপে ৬৮ প্রজাতির প্রবাল, ২৩৪ প্রজাতির মাছ, ৫ প্রজাতির ডলফিন আছে, যা অপরিকল্পিত পর্যটনে ধ্বংস হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের মায়া বে ২০১৮ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ৪ বছর বন্ধ রেখে ৯৫% ধ্বংস হওয়া প্রবালকে ৩০% পর্যন্ত ফিরিয়ে এনেছিল। একই তত্ত্বে বাংলাদেশও হাঁটছে।

ফলাফলও এসেছে। প্রথম আলোর ১৩ আগস্ট ২০২৬ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ মাস পর্যটকশূন্য থাকায় সৈকতে লাল কাঁকড়া, গাঙচিল, কাছিমের বিচরণ বেড়েছে, দূষণ কমেছে।

কিন্তু এর মানবিক মূল্য ভয়াবহ। দ্বীপের ১২ হাজার বাসিন্দার মধ্যে প্রায় ৫ হাজার মানুষ সরাসরি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। গত মৌসুমে মাত্র ১ লক্ষ ১৭ হাজার পর্যটক এসেছে, যা আগের তুলনায় ৬০% কম। ২০০-র বেশি হোটেল-রিসোর্টে তালা ঝুলছে। একজন রেস্টুরেন্ট মালিক ২০ লক্ষ টাকার রেস্টুরেন্টে এখন ১০ টাকার ক্যারাম খেলিয়ে দিনে ৪০০ টাকা আয় করছেন।

সেন্টমার্টিন বন্ধ মানে কক্সবাজার অচল। আগে টেকনাফ থেকে জাহাজ ছাড়ত ২ ঘণ্টায় সেন্টমার্টিন যাওয়া যেত। এখন নিরাপত্তার কারণে জাহাজ ছাড়ে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে, সময় লাগে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা। খরচ দ্বিগুণ, পর্যটক আসছে না।

২০২৫ সালের অক্টোবরে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও পর্যটন উপদেষ্টা আব্দুল আউয়াল মিন্টু নিজেরাই স্বীকার করেছেন, নিষেধাজ্ঞা পুনর্বিবেচনা করা হবে।

আন্তর্জাতিক পর্যটন নীতি বলে, Conservation without alternative livelihood is failure. অর্থাৎ বিকল্প জীবিকা ছাড়া সংরক্ষণ টেকে না। সেন্টমার্টিনে সেটাই হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ক্রাইসিস তাই তিনমুখী – পাহাড়ে নিরাপত্তা সংকট, সাগরে পরিবেশ সংকট, আর সমতলে ব্যবস্থাপনা সংকট। সাজেকে অস্ত্রের ঝনঝনানি আর সেন্টমার্টিনে নিষেধাজ্ঞার খড়গ – দুটোই পর্যটককে ভয় দেখাচ্ছে।

সরকার যদি দ্রুত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন, সাজেকে স্থায়ী সেনা ক্যাম্প ও স্থানীয়দের সঙ্গে সমঝোতা এবং সেন্টমার্টিনে ইকো-ট্যুরিজম মডেল ও স্থানীয়দের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত না করে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন-সাজেক শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবে। তখন তা মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

Pushpak Bhattacharya
পুষ্পক ভট্টাচার্য

পুষ্পক ভট্টাচার্য একজন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করার পর ২০২৬-এ Bengal Liberty-তে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ এবং ক্রীড়া সাংবাদিকতার প্রতি বিশেষ আগ্রহ। দেশ-বিদেশের সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং খেলাধুলার নানা বিষযয়ের প্রতি বিশেষ ঝোঁক। ব্যস্ততার বাইরে বই ও সিনেমা সঙ্গী।