সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র
সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র

মা কালীর উপাসনায় সুভাষচন্দ্র এবং সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র

১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি কটকের এক ধর্মপ্রাণ বাঙালি পরিবারে সুভাষচন্দ্রের জন্ম। পিতা জানকীনাথ বসু ছিলেন প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী। মা প্রভাবতী দেবী ছিলেন গভীর ধর্মবিশ্বাসী নারী। রাজনীতির পরিসরে এসে ব্যক্তি মানুষের ধর্মীয় চিন্তায় হস্তক্ষেপ তিনি কখনোই পছন্দ করতেন না | পরবর্তীকালে যারা সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে অপব্যাখ্যা করেছেন, তারা তাকে একটি বিশেষ ধর্মীয় চিন্তার অনুসারী রাষ্ট্র নির্মাণের কান্ডারী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তব সত্য ভিন্নতর |

বসু পরিবারের গৃহদেবতার আরাধনা, দুর্গাপূজা, কালীর উপাসনা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই কেটেছিল সুভাষচন্দ্রের শৈশবের দিনগুলি। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছিলেন, ধর্ম কেবল মন্দিরের চার দেওয়ালে সীমাবদ্ধ কোনও বিষয় নয়, তা মানুষের জীবনযাপন, বিশ্বাস ও নৈতিকতার সঙ্গে মিশে থাকতে পারে। পরবর্তী জীবনে স্বামী বিবেকানন্দের রচনা তাঁর চিন্তাজগতে এক বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসে। বিবেকানন্দের মধ্যে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন এমন এক আদর্শ, যেখানে আধ্যাত্মিকতা সকল শক্তির উৎস। শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনায় মা কালীর যে গভীর উপস্থিতি, মাতৃভাবের যে অনন্য প্রকাশ এবং ঈশ্বরের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের যে দর্শন, তা তরুণ সুভাষকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর কাছে ধর্ম ক্রমশ হয়ে উঠেছিল আত্মশুদ্ধি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার পথ। বিবেকানন্দের শিক্ষা তাঁকে বুঝিয়েছিল, শক্তিহীন মানুষ কোনও বৃহৎ আদর্শের বাহক হতে পারে না। নিজের ভিতরের ভয়, দুর্বলতা ও স্বার্থপরতাকে জয় করাই প্রকৃত সাধনা। পরবর্তী সময়ে সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক জীবনেও এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়। দেশকে স্বাধীন করার সংকল্পে তিনি যে দৃঢ়তা দেখিয়েছিলেন, ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে যে কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন, তার স্বরূপ প্রকাশে এই আত্মিক অনুশাসনেরও ভূমিকা ছিল। মা কালীর প্রসঙ্গটি এখানেই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলার সমাজজীবনে কালী কেবল একজন আরাধ্য দেবী নন, তিনি শক্তি, সাহস, প্রতিবাদ ও অশুভের বিনাশের প্রতীক। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও শক্তি আরাধনার একটি বিশেষ স্থান ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ থেকে শুরু করে স্বদেশি আন্দোলনের নানা সাংস্কৃতিক প্রকাশে মাতৃভাবনা ও শক্তির ধারণা জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রভাবিত করেছিল। সেই ঐতিহ্যের মধ্যেই সুভাষচন্দ্রের বেড়ে ওঠা। তাঁর জীবনের আর একটি দিক নিয়ে আজও মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। সেটি হল উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদের রহস্যময় সাধক সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র, যিনি ভগবানজি নামেও পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে বসবাস করা এই মানুষটির প্রকৃত পরিচয় আজও ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত বিতর্ক। তাঁর সঙ্গে নেতাজির পরিচয়ের সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে বহু আলোচনা, গবেষণা এবং অনুসন্ধান হয়েছে। একদল মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র  আসলে সুভাষচন্দ্র বসু। যদিও সরকারি তদন্তে এই পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি |

ফৈজাবাদের এই নিভৃতচারী সাধকের জীবনযাপন ছিল অদ্ভুত। তিনি সাধারণ মানুষের সামনে আসতেন না, মুখ আড়াল করে রাখতেন এবং নির্বাচিত কয়েকজন মানুষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রাখতেন। তাঁর ঘরে ছিল অসংখ্য বই, সংবাদপত্র, চিঠিপত্র, টাইপরাইটার, দূরবিন, ঘড়ি এবং নানা ঐতিহাসিক সামগ্রী। তাঁর সংগ্রহে নেতাজি, আজাদ হিন্দ ফৌজ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কিত বহু উপাদান পাওয়া গিয়েছিল। সেই সঙ্গে ছিল রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভারতীয় দর্শনসংক্রান্ত নানা বই। সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলির মধ্যে একটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত সামগ্রীর মধ্যে মা কালীর একটি ছবি । এই তথ্যটি নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। কারণ নেতাজির পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশেও মা কালীর আরাধনার প্রচলন ছিল। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রর সংগ্রহে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের বই এবং মা কালীর ছবি, এই দুইয়ের অনন্য উপস্থিতি অনেকের কাছে একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

প্রশ্ন ওঠে, একজন নিভৃতচারী সাধকের জীবনে মা কালীর এই উপস্থিতি কি নিছক ধর্মীয় অনুরাগের পরিচয়, নাকি এর পিছনে রয়েছে আরও গভীর কোনও আধ্যাত্মিক অন্বেষণ? তাঁর ঘরে থাকা বইপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী থেকে বোঝা যায়, ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ছিল। এখানে নেতাজি ও সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে আলোচনার একটি সূক্ষ্ম দিক রয়েছে। দুজনের ক্ষেত্রেই রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের দর্শন, ভারতীয় আধ্যাত্মিকতা এবং মা কালীর প্রসঙ্গ উঠে আসে।

১৯৮৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ফৈজাবাদের রামভবনে সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে শেষবারের মতো দেখা যায়। তাঁর ঘর থেকে উদ্ধার হওয়া সামগ্রী সরকারি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে বিচারপতি মনোজ কুমার মুখার্জির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশন তাঁর পরিচয় নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। কমিশন বিভিন্ন নথি, হাতের লেখা, দাঁতের ডিএনএ এবং অন্যান্য উপাদান পরীক্ষা করে।

সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্রকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ কমেনি। কারণ তাঁর ঘরে পাওয়া সামগ্রী, তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান, নেতাজির জীবন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ এবং আধ্যাত্মিক বইয়ের সংগ্রহ একাধিক প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাঁর জীবন নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, ততই সামনে এসেছে এক নিভৃতচারী মানুষের অজানা জগৎ।

নেতাজির জীবনের গভীর নিরীক্ষণে  বোঝা যায়, তাঁর কাছে দেশপ্রেম সাধনা। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করার মধ্যে তিনি জীবনের সার্থকতা খুঁজেছিলেন। তাঁর জীবনদর্শনে বিবেকানন্দের শক্তির আদর্শ, আত্মবিশ্বাস এবং কর্মের প্রতি নিষ্ঠার প্রভাব স্পষ্ট। মা কালীর আরাধনার সঙ্গে এই শক্তিচেতনার একটি সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। কালী এখানে শুধু ভক্তির দেবী নন, তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস, ভয়কে জয় করার শক্তি এবং অশুভের বিনাশের প্রতীক। সেই অর্থে নেতাজির জীবন ও সংগ্রামের মধ্যে শক্তির যে প্রকাশ আমরা দেখি, তা বাংলার শাক্ত ঐতিহ্যের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা যেতে পারে। সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র র ঘরে থাকা মা কালীর ছবিও তাই কৌতূহলের একটি বিষয় হয়ে ওঠে। ছবিটি কেন সেখানে ছিল, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে এর কী ভূমিকা ছিল, তিনি কি নিয়মিত পূজা করতেন, এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে হলে তাঁর ব্যবহৃত সামগ্রী ও সংশ্লিষ্ট নথির আরও গভীর অনুসন্ধান প্রয়োজন। সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা বই পত্রের মধ্যে ছিল স্বামী অভেদানন্দের মনস্তাত্ত্বিক এবং শক্তি সাধনার গ্রন্থসমূহ। ভগিনী নিবেদিতার মা কালী প্রসঙ্গে দেওয়া বক্তৃতার প্রতিলিপি, স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা সংগ্রহ |  নেতাজি ও সন্ন্যাসী সুভাষচন্দ্র র মধ্যে মা কালীর প্রসঙ্গ আমাদের সামনে একদিকে বাংলার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্তর্লীন শক্তিচেতনার কথা তুলে ধরে। হয়তো এই কারণেই নেতাজিকে বুঝতে গেলে শুধু তাঁর রাজনৈতিক ভাষণ, সামরিক অভিযান কিংবা অন্তর্ধান-রহস্যের দিকে গভীর নিরীক্ষণে ই চলে না। ফিরে দেখতে হয় তাঁর শৈশবের ধর্মীয় পরিবেশ, বিবেকানন্দের প্রতি তাঁর আকর্ষণ, আত্মসংযমের অনুশীলন এবং শক্তির আদর্শে বিশ্বাসকে। কারণ ইতিহাসের মহান ব্যক্তিত্বরা কেবল তাঁদের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে ওঠেন না, তাঁদের অন্তর্জগতের বিশ্বাস, দ্বন্দ্ব ও সাধনার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে তাঁদের জীবনের অনেক অজানা পরিচয়। অনুগামীদের উদ্দেশ্যে বলা কথায় সন্ন্যাসী সুভাষ চন্দ্রের মুখনিঃসৃত বাণীতে মা কালী প্রসঙ্গ বারংবার উদ্ধৃত হয়েছে। দেবী কালির দৈব প্রভায় উদ্ভাসিত সুভাষচন্দ্র মনে করতেন, ধ্বংসের মধ্যেই নিহিত থাকে সৃষ্টির শক্তি | দেশের উদ্বাস্তু সমস্যা, দেশ ভাগ, দাঙ্গা পরিস্থিতি, পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা, এই সমস্ত কিছুতে পীড়িত হয়ে সন্ন্যাসীর প্রশ্ন ছিল, “তোমরা ত্যাগ করেছো কি? করোনি! তোমরা ত্যাগিদের ত্যাগ করেছ | In due course of time, Mother Kali will avenge!” মা কালীর অভিশাপ অভিসম্পাত ও ভক্তের মঙ্গল কামনায়!

Bengal Liberty