Afghanistan Pakistan tension
স্বর্ণার্ক ঘোষ, Bengal Liberty: ২০২১ সালে আফগানিস্তানে উত্থান হয় তালিবানের। তখন বুক ভরা আশা চকচক করছে পাকিস্তানের চোখে মুখে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বুক ফুলিয়ে বললেন পরাধীনতার শৃঙ্খলা ভাঙল আফগানরা। কিন্তু সেই বুক ভরা আশা আজ রাতের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে ইসলামাবাদের। গত এক মাস ধরে রক্তক্ষয়ী সংঘাত অব্যাহত পাক আফগান সীমান্তে। গত ১৬ই অক্টোবর ৪৮ ঘন্টার যুদ্ধ বিরোধী সিদ্ধান্ত নেয় দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রই। কিন্তু সে গুড়ে বালি! ইসলামাবাদের একপাক্ষিক ঔদ্ধতে সেই শান্তি চুক্তির পথ রীতিমতো ভেস্তে গিয়েছে। সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধে ইতিমধ্যেই দুপক্ষেরই শতাধিক হতাহত। যদিও মাত্র কুড়ি পঁচিশ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছিল পাক সেনা ও সে দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলি। পরে সেই দাবি নস্যাৎ করে দিয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবজারভেশন রিপোর্ট।
মেশিনগান, রকেট লঞ্চার দিয়ে প্রথম পর্বের লড়াইয়ের পর গত পরশু থেকেই পাক-আফগান সীমান্তে সোভিয়েত জমানার স্কাড মিসাইল ও ট্যাঙ্ক বহর মোতায়েন শুরু করেছে তালিবান যোদ্ধারা। সীমান্ত সংঘাতে পর ভারী ট্যাঙ্ক মোতায়েন করেছে দুপক্ষই। ধারেও ভারে পাকিস্তান আফগানিস্তানের তুলনায় শক্তিশালী হলেও তালিবানদের মুখোমুখি হয়ে কিন্তু বড়সড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে ইসলামাবাদের। রাজনৈতিক আত্মসম্মাণ মর্যাদা রক্ষার্থে তা মুখে না বললেও স্যাটেলাইট ইমেজে ধরা পড়েছে সেই সমস্ত ছবি।
এদিকে দিন যত যাচ্ছে ততই কিন্তু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দুর্বিষহ হয়ে উঠছে ইসলামাবাদের। কারণ এই মুহূর্তে একদিকে দেশের ভেতরেই তেহরিক ই লাব্বাইক ধ্বংসাত্মক আন্দোলনে চলছে। তাদের দাবি, গাজা শান্তি চুক্তি আসলে মিথ্যা। এটির মাধ্যমেই আমেরিকা ওই অঞ্চলে ইজরায়েলকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলবে। আর মার্কিন সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে পাকিস্তানের মার্কিন পন্থী পুতুল সরকার। এই দাবির পক্ষেই ইসলামাবাদের মার্কিন দূতাবাসে প্রতিবাদ জানানোর দাবি তুলেছে দলটি।
এই কট্টর ইসলামিক গোষ্ঠীর পেছনে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তাহেরিক-ই-ইনসাফের উস্কানি রয়েছে বলে দাবি পাক সেনা ও ক্ষমতাসীন দলগুলোর। গত সাত দিন ধরে চলা এই জঙ্গি আন্দোলনে বিপর্যস্ত ও দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে আইন-শৃঙ্খলা। মৃত্যু হয়েছে একাধিক পুলিশকর্মীর। রক্তাক্ত লাহোর ও ইসলামাবাদের রাস্তা। এই ঘটনার জেরে লাহোর ইসলামাবাদ ও রাওলপিন্ডির মত শহর রীতিমতো লকডাউন। ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ও পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহ না হওয়ার ফলে রীতিমত্ত বিপর্যস্ত সাধারণ জীবন যাপন। হু হু করে বাড়ছে নিত্য পণ্যের দাম ও সেই সঙ্গে কালোবাজারি বেড়ে যাওয়ায় রীতিমত খাদ্য দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রান্তে।
অন্যদিকে,অক্টোবরের শুরু থেকেই পিওকেতে চলা নাগরিক অধিকার আন্দোলনেও বিপর্যস্ত পাক প্রশাসন। তার অন্যতম কারণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চনা লাঞ্ছনা দ্রব্যমূল্য আগুনে বৃদ্ধি আর পাক সেনাদের নির্বিচারে অত্যাচার দুর্বিষহ করে তুলেছে, আজাদ কাশ্মীরের দরিদ্র মুসলমান মানুষদের জীবনযাত্রা। সেই অত্যাচার আর সইতে না পেরেই রাস্তায় নেমে পড়েছে তারা কাতারে কাতারে। গত বছরও একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল তবে পরিস্থিতি এবার আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলেই দাবি পাকিস্তানের। আজাদ কাশ্মীরে ভয়াবহ আন্দোলনে ইতিমধ্যেই বলি হয়েছে ২৫ এর ওপর পাক সেনা ও পুলিশ কর্মী। সেনা ও পুলিশের গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে পুলিশের ইউনিফর্ম রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে ঝুলিয়ে রাখার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ওখানে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে ওই অঞ্চলে পুলিশ মোতায়েন করাই একরকম অসম্ভব হয়ে পড়ছে ইসলামাবাদের পক্ষে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও অফিসিয়াল টুইট অনুযায়ী, তালিবান থামতে চাইছে না। এদিকে থামবার পাত্র নয় তালিবান। আফগান শীর্ষ নেতৃত্ব আমির মুত্তাকী থেকে জবিবুল্লাহ সবারই দাবি, এই আফগান মাটিতে একদা ব্রিটিশ থেকে সোভিয়েত আমেরিকা থেকে নাটো কেউ রক্ষা পায়নি আর পাকিস্তান তখন ছাড়….! তাই পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার দাবি তুলেছে পাকিস্তান। আর মধ্যস্থতার জন্য আমেরিকা, সৌদির দারস্থ হয়ে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের আর্জি জানিয়েছে আসিফ মুনিররা। শোনা যাচ্ছে গত ৯ অক্টোবর কাবুলে হেয়ার স্ট্রাইক এর সময় ভুলবশত চীনের একটি প্রকল্পে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে পাক বিমানবাহিনী। তাই বেজিংও এই নিয়ে পাকিস্তানের ওপর যথেষ্টই নারাজ…।
সুতরাং ঘরে বাইরে মিলিয়ে পাকিস্তানের পরিস্থিতি এখন এমন দিকেই গিয়েছে, যাকে চলতি বাংলায় বলে জলে কুমির ডাঙায় বাঘ। প্রতি মাসেই ২০০ থেকে তিনশ জন নাগরিক ও সেনা কর্মীর মৃত্যু রীতিমত কবরস্থানে পরিণত করছে ভারতের এই প্রতিবেশী ইসলামিক দেশটিকে। একদিকে যখন পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তান অন্যদিকে পূর্ব সীমান্তে ভারত ও ঘরের ভেতর বালুচ বিদ্রোহী ও টিএলপি দের নিয়ে রীতিমতো “আত্মহত্যা”র পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। এই “সুন্দরবনীয়” পরিস্থিতি মোকাবেলা করার ক্ষমতা ও মিথ্যা আস্ফালন জিন্না ও ইয়াহিয়া খানের উত্তরসূরীদের কতদিন থাকে সেটাই দেখার….। তবে বিদ্রোহ শুধু নয়। হাতে মারার পাশাপাশি পাকিস্তানকে ভাতে মারতেও চেষ্টা কসুর রাখছে না তালিবানরা। ভারতের দেখানো পথে হেঁটেই সম্প্রতি আফগানিস্তান দিয়ে বয়ে চলা কাবুল নদীর উপর কুনার বাঁধ নির্মাণের কথা ঘোষণা করেছে আফগান সরকার। এই নদীটি আফগানিস্তান তাজিকিস্তান সীমান্তের আমু দরিয়া, শির দরিয়া হয়ে দক্ষিণে পাকিস্তানের মধ্যে দিয়ে আরব সাগরে প্রবাহিত হয়। এই নদীর ওপরই পাকিস্তানের জীবনযাত্রার একটা বড় অংশই নির্ভরশীল ছিল। যা এবার সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হতে চলেছে।
গত এপ্রিলে কাশ্মীরের পহেলগাঁয়ে বর্বররোচিত জঙ্গি হানার পর ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক চূড়ান্ত অবনতি হয়েছে ইসলামাবাদের। পাকিস্তান মদতপুষ্ট সন্ত্রাবাদীদের এই হামলায় তৎক্ষণাৎ জবাব দেয় ভারতও। ১৯৬০ সালে দুই দেশের স্বাক্ষরিত সিন্ধু নদ চুক্তি Indus river treaty একতরফাভাবে বাতিল করেছে ভারত। পদক্ষেপটি আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও চুক্তিটির তাৎপর্য ও প্রভাব অপরিসীম। কারণ চুক্তির সাথে জড়িত বিস্তীর্ণ এলাকার অর্থনীতি খাদ্য ও মানুষের প্রাণ জীবনযাত্রা। আর এই ‘সিন্ধু সভ্যতা’ই আপাতত প্রথম ও প্রধান টার্গেট ভারতের।
জওহরলাল নেহেরুর আমলে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে বলা হয়, কাশ্মীর উপত্যকার তিনটি প্রধান নদী চেনাব, ঝিলাম ও শতদ্রু তিনটি নদীর বেশিরভাগই প্রায় ৭০ শতাংশ জল পাকিস্তান পাবে। ভাটির দেশ হওয়ায় সেই সিংহভাগ জল দিয়েই এতদিন পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ৬৫ % মানুষ কৃষি কাজ চালিয়ে আসছিল পাকিস্তান। এই নদীর জলেই ৯০ % বিদ্যুৎ উৎপাদন, জলবিদ্যুত তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ সব চলছিল রমরমিয়ে। কিন্তু এবার আর না। চুক্তি বাতিলের ফলে ভাতেও মারবে ভারত আর পানিতেও।
এদিকে লাহোর, করাচি ও মুলতানের মত বড় বড় শহরগুলির বিদ্যুৎ উৎপাদন সরবরাহের ব্যবস্থা হতো এই নদীর জল থেকেই। এবার তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রীতিমতো ধাক্কা খাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেই সংক্রান্ত প্রকল্প গুলিও। ফলে আগামী দিনে অন্ধকারে ঢুকবে এই শহরের অধিকাংশের জীবনযাত্রা। বন্ধ হতে পারে কল কারখানা। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের সবচেয়ে সচ্ছল প্রদেশ পাঞ্জাব। আর এই নদীর জলে গড়ে ওঠা একাধিক প্রকল্প ও অর্থনীতি থেকেই নিজেদের পকেট ফুলিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কর্তাব্যক্তি তথা জেনারেল ব্রিগেডিয়াররা। কারণ সিন্ধুর জলে পাঞ্জাবের পেট যত ফুলেছে, ততোই রুগ্ন হয়েছে সে দেশের অন্যান্য প্রদেশ গুলি। যেমন সিন্ধু প্রদেশ। যার রাজধানী করাচি। আবার রোগে ক্লিষ্ট বালুচিস্তান। যারা মাঝে মাঝেই খবরের শিরোনাম দখল করে।
এই প্রকল্পটি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত হয়েছিল। ফলে এই চুক্তির যেকোনো মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে এই ইস্যু নিয়ে অতীতেও পাকিস্তান বিশ্বব্যাংকের দরবারে বহুবার ধর্না দিলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ভারতের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত টু শব্দটিও করেনি আমেরিকা স্থিত বিশ্ব ব্যাংক। শোনা যায়, ইমরান খান বিষয়টি নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি মধ্যস্থতায় আসার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্যাপ্টেন ক্ষমতাচ্যুত হতেই সব উলটপালট হয়ে যায়। সেই নিয়ে পাক মিডিয়া অতীতেও বহুবার মরা কান্না না কেঁদেছে। ফলে এবারও বিশ্ব ব্যাংকের শরণাপন্ন হলে তার অন্যথা হবে না বলেই মনে করা যেতে পারে। সুতরাং পাকিস্তানের ওই রুদালিপনা অব্যাহত থাকলে আখেরে তাতে কারও যায় আসবে না। কারণ ভারতের ঘোষিত এই ‘জল যুদ্ধে’র সামনে পাকিস্তান সত্যিই অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে….।
আর জল না পাওয়ায় ভৌগলিক কারণবশত স্বাভাবিকভাবেই শুকিয়ে যাবে নদী। শীত গ্রীষ্ম বর্ষায় শুষ্ক নদীর ফলে চাষবাসের উপযোগী থাকবেনা কোনও জমিই। খাদ্য সংকট বড়সড়ো আকার ধারণ করতে পারে বলে ইতিমধ্যেই হা হুতাশ শুরু করেছে জিও নিউজ কিংবা Ary নিউজের মতো পাকিস্তানের তাবড় মিডিয়া। কারণ ধান গমের সঙ্গে জোয়ার বাজরা ফলন ধাক্কা খেলেই খাদ্যপণ্যের দাম হবে লাগাম ছাড়া। যেখানে কিছুদিন আগেই আটার জন্য দাঙ্গা লেগেছিল সেখানেই এবার খাদ্যের জন্য ‘গৃহযুদ্ধ’ লাগার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না…।
সুতরাং তখন জল, খাদ্য, বিদ্যুৎ, অথবা আটা ময়দা বাজরার ক্ষেতে ‘পারমাণবিক বোমা’ কিভাবে চাষ করে সেটাই দেখার…।

