Core Terrorism in Pakistan
Core Terrorism in Pakistan

পারভেজ মোশাররফ(Core Terrorism in Pakistan): রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদ ও একটি বিতর্কিত অধ্যায়

Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:

পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান এবং প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফ(Core Terrorism in Pakistan) আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত সামরিক শাসক। একদিকে তিনি নিজেকে ‘আধুনিক ও উদারপন্থী’ হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তার শাসনামলেই পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে জঙ্গিবাদকে একটি কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। তার নিজের দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও স্বীকারোক্তি থেকে স্পষ্ট হয় যে, তিনি ক্ষমতার প্রয়োজনে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোকে যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি প্রয়োজনে তাদের ত্যাগও করেছেন।

Core Terrorism in Pakistan
Core Terrorism in Pakistan

স্বীকারোক্তির মাধ্যমে উন্মোচিত সত্য (Core Terrorism in Pakistan)

২০১৫ এবং ২০১৯ সালে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে মোশাররফ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্বীকার করেছেন যে, পাকিস্তান ১৯৭৯ সাল থেকে ধর্মীয় উগ্রবাদকে একটি রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। তিনি স্বীকার করেন, আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পাকিস্তান ধর্মীয় উগ্রবাদীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। সে সময় ওসামা বিন লাদেন এবং আয়মান আল-জাওয়াহিরির মতো ব্যক্তিরা পাকিস্তানের কাছে ‘নায়ক’ হিসেবে বিবেচিত হতেন। পরবর্তীতে এই গোষ্ঠীগুলোই পাকিস্তানের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

Pervez Musharraf
Pervez Musharraf

কার্গিল যুদ্ধ: একটি পরিকল্পিত অনুপ্রবেশ (Core Terrorism in Pakistan)

পারভেজ মোশাররফের সামরিক জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় হলো ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে মোশাররফ এই যুদ্ধের পরিকল্পনা করেন। কার্গিলের হিমালয় অঞ্চলে ভারতীয় ভূখণ্ডে গোপনে পাকিস্তানি সেনা এবং জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ করানো হয়। মোশাররফ একে ‘কাশ্মীরি মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই’ হিসেবে প্রচার করতে চাইলেও আন্তর্জাতিকভাবে এটি একটি বড় ধরনের উগ্রবাদী অনুপ্রবেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই যুদ্ধের ফলেই ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

Kargil War
Kargil War

কাশ্মীর ও লস্কর-ই-তৈয়বা সংযোগ (Core Terrorism in Pakistan)

মোশাররফের শাসনামলে লস্কর-ই-তৈয়বা (LeT) এবং হাফিজ সাঈদের মতো জঙ্গি নেতারা অবাধে তাদের কার্যক্রম চালিয়েছে। মোশাররফ নিজে স্বীকার করেছেন যে, পাকিস্তান লস্কর-ই-তৈয়বাকে প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করত। তার মতে, কাশ্মীরি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ছিল পাকিস্তানের ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিক এবং তাদের লড়াই ছিল বৈধ। হাফিজ সাঈদকে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে দেখতেন। এমনকি মুম্বাই হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনার পরও মোশাররফ এই গোষ্ঠীগুলোর প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখিয়েছেন।

Link With Terrorism
Link With Terrorism

ইলিয়াস কাশ্মীরি: ঘনিষ্ঠতা থেকে শত্রুতা (Core Terrorism in Pakistan)

জঙ্গি নেতা ইলিয়াস কাশ্মীরির সাথে মোশাররফের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নাটকীয়। ইলিয়াস কাশ্মীরি ছিলেন পাকিস্তানের এলিট কমান্ডো ফোর্স ‘এসএসজি’ (SSG)-এর একজন প্রাক্তন সদস্য। মোশাররফ নিজেও একই বাহিনীর সদস্য ছিলেন। নব্বইয়ের দশকে কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধে ইলিয়াস কাশ্মীরিকে বড় ‘অ্যাসেট’ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। একবার একটি অভিযানে ভারতীয় সেনার মাথা কেটে আনার জন্য মোশাররফ ব্যক্তিগতভাবে কাশ্মীরিকে ১ লক্ষ রুপি পুরস্কার দিয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।
তবে ৯/১১-এর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। মোশাররফ যখন আমেরিকার চাপে পড়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর ওপর কিছুটা কড়াকড়ি শুরু করেন, তখন কাশ্মীরি আল-কায়েদার সাথে হাত মেলান। একসময়ের ‘পছন্দের মানুষ’ ইলিয়াস কাশ্মীরি তখন মোশাররফের প্রাণঘাতী শত্রুতে পরিণত হন। ২০০৩ সালে মোশাররফের ওপর চালানো আত্মঘাতী হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই কাশ্মীরি।

Rajouri sector attack 2000
Rajouri sector attack 2000

৯/১১ পরবর্তী ‘ডাবল গেম’ (Core Terrorism in Pakistan)

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ারে হামলার পর মোশাররফ একটি জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তাকে ‘হয় আমাদের সাথে, না হয় আমাদের বিরুদ্ধে’ এই নীতিতে বাধ্য করেন। মোশাররফ লোকদেখানোভাবে আমেরিকার মিত্র সাজেন এবং আফগানিস্তানে ‘ওয়ার অন টেরর’-এ যোগ দেন। তবে তলে তলে তার গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই (ISI) তালিবান নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদান অব্যাহত রাখে। মোশাররফের এই দ্বিমুখী নীতি বা ‘ডাবল গেম’ দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

Story Behind 9/11
Story Behind 9/11

উগ্রবাদের নেতিবাচক প্রভাব ও পতন (Core Terrorism in Pakistan)

মোশাররফ যে সাপ পুষেছিলেন, একসময় সেই সাপই তাকে কামড়াতে শুরু করে। ২০০৭ সালে ইসলামাবাদের লাল মসজিদে সামরিক অভিযানের পর পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ জঙ্গিবাদ চরম আকার ধারণ করে। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তান (TTP) গঠিত হয় এবং তারা পাকিস্তানের ভেতরেই সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের ওপর হামলা শুরু করে। মোশাররফের দীর্ঘদিনের ভুল নীতি পাকিস্তানকে একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রে পরিণত করে। শেষ পর্যন্ত বিচার বিভাগীয় লড়াই এবং রাজনৈতিক চাপে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে এবং দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন।

পারভেজ মোশাররফ এমন একজন শাসক ছিলেন যিনি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে জঙ্গিবাদকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তার স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে যে, একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পাকিস্তান হাফিজ সাঈদ বা ইলিয়াস কাশ্মীরির মতো উগ্রবাদীদের জাতীয় বীর হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। তার এই অদূরদর্শী নীতি কেবল পাকিস্তানকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়নি, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে। মোশাররফের ইতিহাস মূলত ক্ষমতার জন্য উগ্রবাদকে ব্যবহারের এক চরম বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত।

আরও পড়ুন :

Rajouri sector attack 2000: রাজৌরির সেই রক্তস্নাত রাত: শহীদ জওয়ান তলেকর ও এক নৃশংসতার ইতিহাস

 

Bengal liberty
Bengal liberty

Bengal Liberty is a platform dedicated to guerrilla, unfiltered, and independent journalism. Through YouTube, its official website, and various social media channels, Bengal Liberty seeks to present citizen journalism to the public with integrity and transparency. Editor: Bittu Roy Chowdhury