Lionel Messi Statue
Bengal Liberty, ১ জুন ২০২৬ :লিওনেল মেসি শুধু একটি নাম নন, বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়।(Lionel Messi Statue) তাঁর নিখুঁত পাসিং, শুটিং এবং অসাধারণ নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা ফুটবলকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। দুনিয়ার কোটি কোটি ফুটবল অনুরাগী মেসিকে একঝলক দেখার জন্য ব্যাকুল। সেই কোটি কোটি সমর্থকদের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন ভারতের ফুটবলপ্রেমীরা। তাঁদের কাছে মেসিকে চোখের সামনে দেখা যেন এক পরম প্রাপ্তি।
আর এই আবেগ ও ভালোবাসাকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করেছিলেন পূর্বতন রাজ্য সরকারের কিছু মন্ত্রী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি। সাধারণ মানুষের আবেগ নিয়ে খেলা সেই ব্যক্তিদের বাংলার মানুষ ইতিমধ্যেই ভোটবাক্সে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শতদ্রু দত্তের কঠোর পরিশ্রম ও খেলার প্রতি ভালোবাসার কারণেই তিনি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টকে নিজের পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন।
মেসির আগেও কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদিনহো ও আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে তিনি ভারতে এনেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় তিনি পরিকল্পনা করেছিলেন ‘দ্য গোট ইন্ডিয়া ট্যুর’-এর। কলকাতা, হায়দরাবাদ, মুম্বই ও নয়াদিল্লি— ভারতের এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে মেসির উপস্থিতির পাশাপাশি থাকার কথা ছিল লুইস সুয়ারেজ ও রদ্রিগো দি পলের।

অভিশপ্ত ১৩ ডিসেম্বর(Lionel Messi Statue)
সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। তার আগে বিধাননগরের প্রাক্তন বিধায়ক এবং বর্তমানে কারাবন্দি সুজিত বসুর উদ্যোগে লিওনেল মেসির একটি ৭০ ফুট (২১ মিটার) উঁচু মূর্তি তৈরি করা হয়। লোহা ও ফাইবারগ্লাস দিয়ে নির্মিত এই বিশাল কাঠামোটিতে মেসিকে বিশ্বকাপ হাতে তুলে ধরতে দেখা যায়। লেক টাউনের শ্রীভূমি স্পোর্টিং ক্লাব এটি স্থাপন করেছিল।
এর কিছুক্ষণ পরেই সল্টলেক স্টেডিয়ামে (বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন) লিওনেল মেসির আগমন ঘটে। সেখানে এক রাজকীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। কয়েক হাজার টাকা খরচ করে দূরদূরান্ত থেকে মেসি-সমর্থকেরা গ্যালারি ভরিয়ে তুলেছিলেন। বাড়তি পাওনা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিং খান শাহরুখ খান, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী।
কিন্তু হঠাৎ করেই অরূপ বিশ্বাস মেসির সঙ্গে ছবি তুলতে মঞ্চে চলে আসেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভাইয়ের স্ত্রী তথা কাউন্সিলর জুহি বিশ্বাস, কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি, তাঁর সন্তান এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই ও তাঁর পরিবার।

সেখান থেকেই বিশৃঙ্খলার শুরু। মেসিকে ঘিরে চারদিকে শুধু মানুষের ভিড় জমে যায়। অরূপ বিশ্বাস মেসির কাঁধে ও পিঠে হাত দেওয়ার মতো অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটানোর পরেই দি পলের হাতে চোট লাগে। কার্যত সেখানেই অনুষ্ঠানের ছন্দপতন ঘটে।
মেসি ওই পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু সতীর্থ চোট পাওয়ার পর ক্ষুব্ধ হয়ে ফুটবলাররা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান। এই দৃশ্য দেখে উপস্থিত জনতা প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। স্টেডিয়ামের চেয়ার ভাঙচুর করা হয়; এমনকি কেউ কেউ মাঠের র্যাম্প পেরিয়ে খেলোয়াড়দের সাজঘর (ড্রেসিংরুম) পর্যন্ত পৌঁছে যান। একজন মন্ত্রীর চরম গাফিলতির কারণে চার বছরের কঠোর পরিশ্রম এক মুহূর্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
ভারতের অন্য কোনো শহরে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি; সেখানে অত্যন্ত সুন্দরভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু কলকাতার বুকে এমন কলঙ্কজনক ঘটনার পর পুলিশ কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও ইভেন্ট সংগঠক শতদ্রু দত্তকে দিনের পর দিন গ্রেফতার করে রাখে। শেষমেশ আদালত থেকে জামিনে মুক্তির পর একাধিক সাক্ষাৎকারে অরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন তিনি।

শতদ্রু দত্তের অভিযোগ(Lionel Messi Statue)
“প্রথম কথা, অনুষ্ঠানসূচি বা শো-ফ্লোতে অরূপ বিশ্বাসের কোনো নাম ছিল না। শো-ফ্লোতে আমন্ত্রিত ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়, শাহরুখ খান, মেসি ও তাঁর সতীর্থরা।
হঠাৎ করে স্টেডিয়ামে ঢুকে দেখি প্রচুর পুলিশ ও ইউটিউবার। আমি পুরোপুরি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তারপর অরূপবাবু এলেন। তিনি প্রথমেই মেসির কাঁধে ও পিঠে হাত দিলেন, যা লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতিতে ‘ব্যাড টাচ’ বা আপত্তিকর স্পর্শ হিসেবে গণ্য করা হয়।
আমি বারবার মাইক্রোফোনে বলেছিলাম, ‘আপনারা মাঠ থেকে বেরিয়ে যান।’ কিন্তু উনি আমার একটি কথাও শোনেননি। ওনার মাথায় তখন চলছিল সামনের নির্বাচনের প্রচারের কৌশল। ওই একটা লোক আমার স্বপ্নের শো-ফ্লোটা নষ্ট করে দিল। তারপর বাকিটা তো সবাই জানে কী হয়েছিল।”
সেই বিপজ্জনক মূর্তি(Lionel Messi Statue)
মেসির ‘গোট ট্যুর’ শেষ হওয়ার পর তাঁর এই মূর্তিটি নিয়ে নতুন বিতর্ক শুরু হয়। দেখা যায়, বিশাল মূর্তিটি হাওয়ায় বিপজ্জনকভাবে দুলছে। এই ছবি সামনে আসতেই স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে প্রবল উদ্বেগের সৃষ্টি হয়।
কলকাতার লেক টাউনে (ভিআইপি রোড) অবস্থিত এই মূর্তিটি ভেঙে পড়লে বড়সড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। ভয়াবহ বিপদ এড়াতে মূর্তিটিকে চারদিক থেকে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তবুও বৃষ্টি ও ঝড়ের দাপটে সেটি দুলতে থাকে। ফুটবল মাঠে সের্হিও রামোসও হয়তো মেসিকে এতটা কড়া পাহারায় রাখতে পারেননি, যতটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল তাঁর মূর্তিকে।

সমস্যাটা কোথায় ছিল(Lionel Messi Statue)
জানা গেছে, কলকাতার লেক টাউনের ৭০ ফুট উঁচু লিওনেল মেসির মূর্তিটি গণপূর্ত বিভাগ (পিডব্লিউডি) ভেঙে সরিয়ে ফেলেছে। এর মূল কারণ ছিল মারাত্মক কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা। ভিত্তির বোল্টগুলো আলগা হয়ে যাওয়ায় বিশাল ফাইবারগ্লাসের কাঠামোটি বাতাসে বিপজ্জনকভাবে দুলছিল।
প্রবল ঝড়ের সময় মূর্তিটি দৃশ্যত দুলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর পূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা পরিদর্শন করে এটিকে জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেন।
হাইড্রোলিক ক্রেন ব্যবহার করে মূর্তিটি নিরাপদে নামিয়ে ফেলা হয়েছে এবং বর্তমানে এটি পূর্ত বিভাগের হেফাজতে রয়েছে। কর্তৃপক্ষ এটিকে কোনো নতুন স্থানে, যেমন— ইকো পার্ক বা রবীন্দ্র সরোবরের মতো সম্ভাব্য জায়গায় স্থানান্তরের কথা বিবেচনা করছে।
উদ্বোধনের পর থেকেই (যেখানে মেসি ভার্চুয়ালি অংশ নিয়েছিলেন) এই স্মারকটি সমালোচনার মুখে পড়ে। ভক্তদের অভিযোগ ছিল, মূর্তিটি দেখতে মোটেও এই ফুটবল আইকনের মতো হয়নি। পাশাপাশি, সরকারি জমিতে পূর্ত বিভাগের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই এটি স্থাপন করা হয়েছিল বলে বিতর্ক তৈরি হয়।
শেষমেশ দীর্ঘ টালবাহানার পর অবশেষে কলকাতাবাসীকে স্বস্তি দিয়ে সরানো হলো মেসির ৭০ ফুট উঁচু মূর্তিটি। আর এতেই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন সাধারণ মানুষ। মূর্তিকে কেন্দ্র করে নিজেদের ক্ষোভও উগরে দিয়েছেন অনেকে।

জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া(Lionel Messi Statue)
“এমন বিপজ্জনক মূর্তি নির্মাণ না করে এই টাকাটা গরিব মানুষের কল্যাণে লাগানো যেত। সুজিত বসু দুর্নীতির দায়ে জেলে গেছেন, এই মূর্তি নিয়েও দুর্নীতি হয়েছে। মূর্তিটি সরানো হয়েছে বলে আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।”
লিওনেল মেসির এই মূর্তি-কাণ্ডের পর অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে উত্তম কুমারের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দেয়া নেয়া’-র সেই গান— “দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা”। কলকাতায় ফের কি কখনো মেসির আগমন ঘটবে? সেটাই এখন দেখার বিষয়।

