Slogan of Bangladesh
Bengal Liberty, প্রাইমা হোসেন, বিশিষ্ট সমাজসেবিকা, সংগঠক ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী:
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান রণধ্বনি ছিল ‘জয় বাংলা’ (Slogan of Bangladesh)। যে স্লোগান বুকে ধারণ করে ৩০ লাখ শহীদ জীবন উৎসর্গ করেছেন, আজ সেই স্লোগান উচ্চারণ করাই যেন বাংলাদেশে অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে! রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ‘জয় বাংলা’ বলার দায়ে নাগরিকদের গ্রেপ্তার ও মিথ্যা মামলা দেওয়া হচ্ছে।

নাবালক শিশু গ্রেপ্তার: মানবাধিকারের নির্মম লঙ্ঘন (Slogan of Bangladesh)
সাম্প্রতিক সময়ে নোয়াখালীর সুধারাম থানায় ছয়জন নাবালক শিশুকে ‘ছাত্রলীগ ট্যাগ’ দিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলার অপরাধে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘটনা দেখে প্রশ্ন জাগে—দেশে আইনের শাসন বলতে কি আদৌ কিছু অবশিষ্ট আছে? ‘শিশু আইন ২০১৩’ অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কাউকে রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার বা রিমান্ডে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। তাছাড়া, ‘জয় বাংলা’ বলা কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। ফলে, এই শিশুদের গ্রেপ্তার শুধু দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থীই নয়, বরং জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

এই লেখার মাধ্যমে আমি বিশ্বের সকল মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানাই—বাংলাদেশে আইনের শাসনের নামে যে অপশাসন ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতি চলছে, তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
রাষ্ট্রযন্ত্র যখন দলীয় লাঠিয়াল (Slogan of Bangladesh)
বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে একদিকে যেমন নানা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে, অন্যদিকে তেমনি রাষ্ট্রীয় যন্ত্র ব্যবহার করে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের ওপর দমন, পীড়ন ও জুলুম অব্যাহত রাখা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে জেলগেট থেকে অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে—এটাই কি বর্তমান প্রশাসনের ‘সুশাসন’?

গণতন্ত্রের মূল কথাই হলো ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন। যখন বিরোধী দল ও মতকে দমন করাই রাষ্ট্রের একমাত্র হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে দেশে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রকে এভাবে দলীয়করণ করলে রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যকার পার্থক্য মুছে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো রাষ্ট্র কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তোলে।
পুলিশ কার? জনগণের না দলের? (Slogan of Bangladesh)
রাষ্ট্রের জনগণকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার পরিণতি কখনো শুভ হয় না। মনে রাখতে হবে, পুলিশের বেতন হয় জনগণের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্টার্জিত ট্যাক্সের টাকায়। বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, পুলিশ কোনো রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল হবে না; বরং তারা হবে জনগণের বন্ধু এবং জানমালের প্রকৃত রক্ষক।

বিচার বিভাগ আজ জিম্মি (Slogan of Bangladesh)
বিচার বিভাগ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। অথচ সেই বিচার বিভাগই আজ রাষ্ট্রের কাছে অসহায় ও জিম্মি হয়ে পড়েছে। আদালতে তারিখের পর তারিখ পার হলেও বিচার মিলছে না। জামিন পাওয়া একজন নাগরিকের আইনি ও নৈতিক অধিকার, অথচ রাজনৈতিক কারণে সাধারণ মানুষকে সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না; অভিযোগ রয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে সেখানে প্রতিনিয়ত বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে এবং একজন বন্দির প্রাপ্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও রাষ্ট্র নিশ্চিত করছে না। উপরন্তু, মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

অর্থনীতি ভঙ্গুর, মানুষ দিশেহারা (Slogan of Bangladesh)
রাজনৈতিক দমন-পীড়নের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও আজ চরমভাবে ভঙ্গুর। সব ক্ষেত্রে মানুষের দুর্দশা ও ভোগান্তি প্রকট রূপ ধারণ করেছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, হত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে জনজীবন অতিষ্ঠ। গণমাধ্যমকে এক প্রকার জিম্মি করে রাখা হয়েছে, যেখানে মানবাধিকারের ন্যূনতম বালাই নেই।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে—এমন নির্বিচার শিশু গ্রেপ্তার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির চরম লঙ্ঘন। এর ফলে জিএসপি প্লাস (GSP+) সুবিধাসহ বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মারাত্মক হুমকিতে পড়তে পারে।

এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে এবং একটি স্থিতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনে দেশবাসী আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বের কোনো বিকল্প দেখছে না।
দমন করে ইতিহাস থমকে দেওয়া যায় না (Slogan of Bangladesh)
বর্তমান সরকারের কাছে প্রশ্ন—এভাবে দমন-নিপীড়ন চালিয়ে কতদিন টিকে থাকা যায়? দেশের সাধারণ জনগণ আজ এই অন্যায়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আন্দোলনকে যত বেশি দমন করার চেষ্টা করা হয়, তা তত বেশি বেগবান হয়। জনসমর্থন বাড়ে এবং শান্ত প্রতিবাদ একসময় জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
‘জয় বাংলা’ স্লোগান কোনো নির্দিষ্ট দলের সম্পত্তি নয়; এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসের সাথে মিশে আছে। একে অপরাধীকাণ করা মানে দেশের সংবিধানের মূলনীতি ও ইতিহাসকেই অস্বীকার করা।
যদি দেশে অবিলম্বে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে এই জাতির ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকারের দিকে যাবে। দেশের মানুষের মূল প্রত্যাশা হলো—অর্থনৈতিক মুক্তি, বাকস্বাধীনতা এবং একটি স্বস্তিময় জীবন।
তাই এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং যে বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন লাখো শহীদ।
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধের অজুহাতে জ্বালানির দাম, জনগণের পকেট কাটার কৌশল?

