Fuel Prices High in Bangladesh
Bengal Liberty, নয়ন বিশ্বাস রকি, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সমাজসেবক ও মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের কর্মী:
বিশ্বজুড়ে ইরান(Fuel Prices High in Bangladesh) যুদ্ধের দামামা বাজছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের দাম এখন নিম্নমুখী। এমনকি সৌদি আরামকোর প্রোপেন-বিউটেনের সিপি (Contract Price) মে মাসের তুলনায় জুনে অনেকটাই কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই পতনের প্রভাবে দেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৯৪০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা কমে ১,৮৮৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্তরের এই স্বস্তির চিত্রের মধ্যেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ চিত্র পুরোপুরি উল্টো। দেশে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৩ মাসের মাথায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে বর্তমান সরকার কৌশলে জনগণের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে তীব্র অভিযোগ উঠেছে।

৩ মাসে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধি: জনগণের ঘাড়ে বাড়তি বোঝা (Fuel Prices High in Bangladesh)
ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৩ মাসের মধ্যে বর্তমান সরকার দফায় দফায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। একদিকে যখন মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা জনগণ, অন্যদিকে তখন সরকারের মন্ত্রীরা এই সংকট নিয়ে অসংলগ্ন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে চলেছেন। জনকল্যাণের কোনো লক্ষণ না দেখিয়ে কেবল জনগণের ওপর কর ও দামের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে দুর্নীতির পাহাড় ও ১৬.৬৮% মূল্যবৃদ্ধি
বিদ্যুৎ খাতে চলমান দুর্নীতির পাহাড় আড়াল করতেই কি এই মূল্যবৃদ্ধি?
১ জুন থেকে খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬.৬৮% বাড়িয়েছে বিইআরসি (বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন)। কোনো কোনো স্ল্যাবে এই বৃদ্ধির হার ১৯.৯৪% পর্যন্ত ঠেকেছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতেও খুচরা বিদ্যুতের দাম গড়ে ৮.৫% (ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা) বাড়ানো হয়েছিল। ফলে আগে যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ৮ টাকা ২৫ পয়সা, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা ৯৫ পয়সায়।

এই বৃদ্ধির কোপ পড়েছে উৎপাদনশীল খাতেও। সেচ কাজে বিদ্যুতের দাম ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৮২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ২৫ পয়সা করা হয়েছে। একই সাথে উচ্চ চাপ শিল্পে বিদ্যুতের দাম ৯ টাকা ৯০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা।
জ্বালানি তেলের বাজারে লুটপাট ও জনগণের চোখে ধুলো (Fuel Prices High in Bangladesh):
১ জুন দ্বিতীয় দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে জনগণের চোখে ধুলো দেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। নতুন মূল্য তালিকায় কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোলের দাম ১৩৫ টাকা থেকে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে অকটেনের দামও নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি লিটার ১৪০ টাকা। তবে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এর আগে গত ১৯ এপ্রিলও তেলের দাম ১০-১৫% বাড়ানো হয়েছিল, যার ফলে পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে একলাফে ১৩৫ টাকা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির পতন, দেশে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি (Fuel Prices High in Bangladesh):
আন্তর্জাতিক বাজারে যখন লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস (এলএনজি)-এর দাম কমছে, ঠিক তখনই দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের দাম ইউনিটপ্রতি আরও ৭৫ পয়সা বাড়িয়েছে সরকার। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক বাজার নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ঢাকতেই জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টায় ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং: রাজপথে গণবিক্ষোভ
দাম বাড়লেও দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহের অবস্থা শোচনীয়। বর্তমানে দেশের বহু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রাম ও মফস্বলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না। এই চরম সংকটেও সরকার নীরব ও নিস্পৃহ ভূমিকা পালন করছে।

সরকারের এই ব্যর্থতার বিরুদ্ধে দেশের সাধারণ মানুষ এখন রাজপথে নেমে এসেছে। ঢাকার রাজপথ এখন স্লোগানে স্লোগানে কম্পিত: “তেলের দাম বাড়লো কেন, जवाब চাই জবাব চাই!”, “জ্বালানি খাতে অনিয়ম, জবাব চাই জবাব চাই!”। সাধারণ মানুষ এখন ক্ষোভের সাথে স্মরণ করছে শেখ হাসিনার শাসন আমলের কথা, যখন জ্বালানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ছিল এবং তা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ভেতরে ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের সীমার বাইরে চলে গেলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
তিন আমলের দামের তুলনামূলক বিশ্লেষণ (Fuel Prices High in Bangladesh):
যদি আমরা তিন আমলের দামের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে শেখ হাসিনা সরকারের শেষ সময়ে অর্থাৎ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ডিজেল ও কেরোসিন ছিল ১০৯ টাকা, পেট্রোল ১২৫ টাকা এবং অকটেন ছিল ১৩০ টাকা লিটার। আর খুচরা বিদ্যুতের গড় দাম ছিল ইউনিটপ্রতি ৮ টাকা ২৫ পয়সা। ২০২৪ সালের মার্চেও এই দাম প্রায় একই স্তরে বজায় ছিল।
পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর আগস্ট ২০২৪-এ জ্বালানির দাম কিছুটা কমিয়ে ডিজেল ও কেরোসিন ১০৪ টাকা, পেট্রোল ১২০ টাকা এবং অকটেন ১২৪ টাকা নির্ধারণ করে। একই সাথে তারা নির্বাহী আদেশে গণশুনানি ছাড়া দাম বাড়ানোর অনৈতিক বিধানটি বাতিল করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেই জুন ২০২৬-এ এসে সেই গণশুনানিকে তোয়াক্কা না করে আবারও নির্বাহী আদেশে দফায় দফায় দাম বাড়াতে শুরু করেছে। যার ফলে পেট্রোল ও অকটেন এখন একলাফে ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। আর ১২ কেজি এলপিজির দাম, যা গত ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ ১,৩৫৬ টাকা ছিল, তা মে মাসে ১,৯৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠার পর জুনে সামান্য কমে ১,৮৮৫ টাকা হয়েছে, যা শেখ হাসিনার আমলের ১,২৮৪ টাকার চেয়ে অনেক বেশি।
অর্থনৈতিক মন্দার মাঝে উৎপাদন খরচের ধাক্কা (Fuel Prices High in Bangladesh)
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর সভাপতি জানিয়েছেন, বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্প কারখানায় উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় ১০% বেড়ে যাবে। উচ্চ ব্যাংক সুদহার, তীব্র গ্যাস সংকট এবং মজুরি বৃদ্ধির এই ক্রান্তিকালে নতুন এই বোঝা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে।
একই সুর বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)-এর কণ্ঠেও। তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করে এভাবে দাম বাড়ানো কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। কৃষি, শিল্প ও পরিবহন—সব খাতে খরচ বাড়ায় দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি এখন ৯.০৪%-এ গিয়ে ঠেকেছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে।

ভর্তুকির নামে লুটপাট ও নীতিগত ব্যর্থতা (Fuel Prices High in Bangladesh)
সরকার অজুহাত দিচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধের কারণে আমদানি খরচ বেড়েছে এবং মার্চ-জুন মেয়대에 শুধু জ্বালানি ও এলএনজিতে ৩১,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি লাগবে (দৈনিক প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা)। অথচ পাওয়ার ডিভিশন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের নামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৫৯,১৪৫ কোটি টাকা ভর্তুকি দাবি করে বসে আছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতে, জ্বালানি খাতের মূল সমস্যা দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং কুইক রেন্টালের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’। এসব প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের কোনো সমাধান না করে সরকার সমস্ত দায় ও ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে দেশের সাধারণ ও ক্ষুদ্র ভোক্তাদের ঘাড়ে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে? জনগণের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি (Fuel Prices High in Bangladesh)
জ্বালানি খাতের এই চরম অব্যবস্থাপনা এবং ডলার সংকটের দায় জনগণের কাঁধে চাপানোর জন্য ‘ইরান যুদ্ধ’ কেবলই একটি উছিলা ও অজুহাত মাত্র। দেশের মানুষের স্পষ্ট প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে বাংলাদেশে বাড়ে কেন? ৩ মাসে ২ বার জ্বালানি ও ১ বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কার স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে? ১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং দিয়েও কেন বাড়তি বিল দিতে হবে?
জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সরকার যদি অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তবে দেশে বেকারত্ব ও তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা ধেয়ে আসবে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। দেশের মানুষ এই অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে মুক্তি চায়।
চারদিকে এখন ভিন্ন সুরের স্লোগান ও প্রতিবাদের আওয়াজ উঠছে। সরকার যদি এখনই এই গণআওয়াজে কর্ণপাত না করে, তবে অচিরেই তারা সর্বস্তরের জনগণের সমর্থন হারাবে এবং রাজপথের আন্দোলন আরও বেগবান হবে। সামনের দিনগুলোতে জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বুঝিয়ে দেবে।
আরও পড়ুন:
কেমন চলছে দেশ? গণতন্ত্রই পারে বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে

