Cuba Fuel Crisis
Bengal Liberty
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নীতির কারণে(Cuba Fuel Crisis) বারবার চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে ক্যারিবিয়ান সাগরের প্রধান দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা। চলতি বছরে এ নিয়ে মোট চারবার দেশটিতে ভয়াবহ ব্ল্যাকআউটের ঘটনা ঘটল। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দ্বিতীয়বারের মতো পুরোপুরি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে কিউবা। একদিকে তীব্র জ্বালানি সংকট, তার ওপর এই বিদ্যুৎ বিপর্যয়—সব মিলিয়ে সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে পুরো দ্বীপরাষ্ট্রটি অন্ধকারে তলিয়ে যায়।

কেন বা কিসের কারণে বারংবার এই বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিচ্ছে, তা অবশ্য দেশটির সরকারের পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে খবর, বিদ্যুৎ পরিবহণের তারগুলো দিন দিন পুরোনো ও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কিউবার সাধারণ নাগরিক। পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। এই অন্ধকারের মধ্যেই তীব্র জ্বালানি সংকট সেখানকার মানুষের জীবনকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
আমেরিকা-কিউবা স্নায়ুযুদ্ধ(Cuba Fuel Crisis)
কিউবায় বিদ্যুৎ বিপর্যয় অবশ্য নতুন কিছু নয়; দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামো দিন দিন আরও জরাজীর্ণ হয়ে পড়ছে। এই ব্যবস্থার একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছিল ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের আমলে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের এক ভয়াবহ যুদ্ধের এক মাস আগে, গত জানুয়ারি মাস থেকে কিউবার সব ধরনের তেল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।

আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যে কিউবা আগে থেকেই রয়েছে। ১৯৬০-এর দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের উপকূল থেকে মাত্র ১৪০ কিলোমিটার (বা ৯০ মাইল) দূরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটির সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য প্রায় বন্ধ করে রেখেছে ওয়াশিংটন। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ট্রাম্প এই কমিউনিস্ট-শাসিত দেশটিতে সরকার পরিবর্তনের (রেজিম চেঞ্জ) চেষ্টা জোরদার করেছেন। অবশ্য সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই হাভানা সরকারের বিরুদ্ধে ভিন্নমত সহিংসভাবে দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছেন।
গত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ও কিউবা সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে এক সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন ট্রাম্প। ওই অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে আটক করে নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। মাদক ও অস্ত্রসংক্রান্ত অভিযোগে তিনি এখনো সেখানেই কারাবন্দী রয়েছেন। মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরপরই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলা আর কিউবায় কোনো তেল বা অর্থ পাঠাতে পারবে না।
এরপর থেকেই ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সংবাদ সম্মেলনে কিউবাকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘অস্বাভাবিক ও মারাত্মক হুমকি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ওই আদেশের অংশ হিসেবে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যেসব দেশ কিউবাকে জ্বালানি সরবরাহ করবে, তাদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ করা হবে। এরপর থেকেই তীব্র জ্বালানি সংকটে জ্বলছে এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। সর্বশেষ গত মার্চ মাসে রাশিয়ার একটি তেলের ট্যাঙ্কার কিউবায় পৌঁছেছিল, কিন্তু তারপর থেকে আর কোনো পরাশক্তি বা বড় দেশের তরফ থেকে কোনো সহযোগিতা আসেনি। মূলত আমেরিকা ও কিউবার এই সংঘাত আজকের নয়, দশকের পর দশক ধরে চলছে এই না-শেষ-হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ।
আমেরিকা ও কিউবার সম্পর্কের টানাপোড়েন(Cuba Fuel Crisis)
বিশ্বের মানচিত্রে নিজেদের ‘সুপারপাওয়ার’ বা পরম শক্তি বলে দাবি করা আমেরিকা এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত কিউবার মধ্যে সম্পর্কের এই টানাপোড়েন দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে। আমেরিকা ও কিউবার সম্পর্কের ইতিহাস স্প্যানিশ শাসন, মার্কিন আধিপত্য, ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ১৯৫৯ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং স্নায়ুযুদ্ধের দ্বন্দ্ব দ্বারা চিহ্নিত।

১৮৯৮ সালে স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর কিউবা স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেলেও, দেশটি কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মার্কিন আধিপত্য ও প্ল্যাট সংশোধনী: স্বাধীনতার শর্ত হিসেবে কিউবাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্ল্যাট সংশোধনী’ মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। এর মাধ্যমে আমেরিকা কিউবার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার পায় এবং গুয়ান্তানামো বে-তে নৌঘাঁটি স্থাপন করে।
কিউবার বিপ্লব(Cuba Fuel Crisis)
দুর্নীতিগ্রস্ত মার্কিন-সমর্থিত একনায়ক ফুলগেন্সিও বাতিস্তাকে উৎখাত করে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট সরকার ক্ষমতায় আসে। নতুন সরকার মার্কিন মালিকানাধীন সম্পত্তি ও বিভিন্ন শিল্প জাতীয়করণ করে।
স্নায়ুযুদ্ধ ও ক্ষেপণাস্ত্র সংকট(Cuba Fuel Crisis)
কাস্ত্রো সরকারের সঙ্গে আমেরিকার তীব্র বৈরিতা শুরু হয়। ১৯৬১ সালে মার্কিন মদদপুষ্ট ‘বে অব পিগস’ আক্রমণ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করলে বিশ্ব পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়, যা ‘কিউবান মিসাইল ক্রাইসিস’ বা ক্ষেপণাস্ত্র সংকট নামে পরিচিত।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা(Cuba Fuel Crisis)
১৯৬০-এর দশক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর কঠোর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা আজও বিদ্যমান।
বর্তমান সম্পর্ক ১২৮ বছর অতিক্রম করে গেলেও দুই দেশের সম্পর্কের আকাশ থেকে এখনো সংকটের মেঘ কাটেনি। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে কিছুটা বরফ গললেও, পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আবার আগের মতোই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মার্কিন প্রশাসনগুলো পুনরায় কড়াকড়ি ও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় আধুনিক সময়েও দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রয়েছে।

