Lyari Operation 2012
Lyari Operation 2012

Lyari Operation 2012 : ২০১২-এর লিয়ারি অপারেশন: করাচির ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়

Bengal Liberty, সিদ্ধার্থ দে:

করাচির লিয়ারি এলাকাটি মূলত তার নিজস্ব সংস্কৃতি, ফুটবল প্রেম এবং রাজনৈতিক গুরুত্বের জন্য পরিচিত। কিন্তু ২০১২ সালের সেই উত্তাল সময়ে এই ঘিঞ্জি জনপদটি এক ভয়াবহ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল (Lyari Operation 2012)। এই সংঘাতটি ছিল মূলত রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং লিয়ারির প্রভাবশালী গ্যাংস্টারদের মধ্যে এক সরাসরি যুদ্ধ, যা আট দিন ধরে চলেছিল (Lyari Operation 2012)।

সংঘাতের সূত্রপাত: একটি মৃত্যু এবং আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ (Lyari Operation 2012)

এই নির্দিষ্ট ঘটনার মূলে ছিল অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডি (CID) পুলিশের একটি বিতর্কিত অভিযান। পুলিশের হাতে লিয়ারি ভিত্তিক নিষিদ্ধ সংগঠন ‘পিপলস আমন কমিটি’র (PAC) এক প্রভাবশালী কর্মী সাকিব পাঠান নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডটি মুহূর্তের মধ্যে দাবানলের মতো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আমন কমিটির দাবি ছিল, এটি কোনো এনকাউন্টার নয়; বরং ঠান্ডা মাথায় করা একটি “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড”।
সাকিব পাঠানের মৃত্যুর প্রতিবাদে লিয়ারির হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তাদের দাবি ছিল, এই “ভুয়া” অপারেশনে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অল্প সময়ের মধ্যেই এক সশস্ত্র বিদ্রোহের রূপ নেয়।

Lyari Operation 2012
Lyari Operation 2012

রণাঙ্গন যখন লিয়ারি (Lyari Operation 2012)

বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনে লিয়ারির লি মার্কেট, চিল চক, টাঙ্গা স্ট্যান্ড এবং বাগদাদির মতো জনবহুল এলাকাগুলো এক দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত হয়। সিআইডির তৎকালীন এসএসপি চৌধুরী আসলাম, যিনি অপরাধীদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনি নিজেই এই অভিযানের ফ্রন্টলাইন থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন।
পুলিশের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ শুরু হয়। শুধু সাধারণ পিস্তল নয়, অপরাধীরা পুলিশের সাঁজোয়া যান (APC) লক্ষ্য করে রকেট চালিত গ্রেনেড (RPG) এবং হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ছিল। সরু গলি এবং উঁচু উঁচু দালানগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা পুলিশের ওপর স্নাইপার হামলা চালাতে থাকে।

Lyari Operation 2012
Lyari Operation 2012

সংবাদমাধ্যমের ওপর বর্বরোচিত হামলা (Lyari Operation 2012)

লিয়ারির এই যুদ্ধে শুধু পুলিশ বা রাজনৈতিক কর্মীরাই লক্ষ্যবস্তু হননি, বরং পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদমাধ্যমও ভয়াবহ হামলার শিকার হয়। যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করতে আসা বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ওপর সরাসরি গুলি চালানো হয়েছিল। অপরাধীদের লক্ষ্য ছিল যাতে তাদের কর্মকাণ্ডের লাইভ ফুটেজ বাইরে না যেতে পারে।
একাধিক সংবাদমাধ্যমের গাড়ি (DSNG Vans) লক্ষ্য করে হ্যান্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। অনেক সাংবাদিক এবং ক্যামেরাম্যান ক্রসফায়ারের মধ্যে পড়ে গুরুতর আহত হন। পুলিশের পক্ষ থেকেও সাংবাদিকদের নিরাপদ রাখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না; ফলে লিয়ারি সেই সময় সাংবাদিকদের জন্য পৃথিবীর অন্যতম বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হয়েছিল। তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করার এই চেষ্টা সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল।

Lyari Operation 2012
Lyari Operation 2012

হতাহত ও রাজনৈতিক প্রভাব (Lyari Operation 2012)

এই সংঘর্ষে অন্তত সাতজন প্রাণ হারান এবং ২০ জনেরও বেশি আহত হন। নিহতদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (PPP) স্থানীয় নেতা হাসান বালুচ। তিনি যখন তার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতির খোঁজ নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। লিয়ারি ঐতিহাসিকভাবেই পিপিপি-র শক্ত ঘাঁটি ছিল, কিন্তু হাসান বালুচের মৃত্যু এবং এই কঠোর পুলিশি অভিযান দলটির সাথে স্থানীয় জনগণের একটি বড় দূরত্ব তৈরি করে দেয়।
নিহতদের তালিকায় আরও ছিলেন আমন কমিটির সদস্য আলী। সংঘর্ষে পাঁচজন পুলিশ সদস্যও গুরুতর আহত হন, যা প্রমাণ করে যে অপরাধীদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার ছিল।

Lyari Operation 2012
Lyari Operation 2012

গেরিলা যুদ্ধ ও অবরুদ্ধ জীবন (Lyari Operation 2012)

লিয়ারির সেই আট দিনের যুদ্ধ কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছিল না; এটি ছিল এক পূর্ণাঙ্গ গেরিলা যুদ্ধ। পুলিশ যখন সাঁজোয়া যান নিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করত, তখন অপরাধীরা ভবনগুলোর ছাদ থেকে গ্রেনেড ছুড়ে রাস্তা অবরুদ্ধ করে দিত। ধোঁয়া আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল করাচির আকাশ।
এদিকে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। টানা কয়েক দিনের কারফিউ (Curfew) এবং অঘোষিত যুদ্ধের কারণে লিয়ারির কয়েক লাখ মানুষ কার্যত গৃহবন্দি হয়ে পড়েন। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, খাবার এবং পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। শত শত পরিবার প্রাণ বাঁচাতে তাদের দীর্ঘদিনের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে।

Lyari Operation 2012
Lyari Operation 2012

চৌধুরী আসলামের ভূমিকা এবং চ্যালেঞ্জ (Lyari Operation 2012)

এসএসপি চৌধুরী আসলাম এই অপারেশনে তার হার না মানা মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি নিজে ড্রিল মেশিন দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে পুলিশ বাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে গ্যাংস্টারদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পুলিশ প্রশাসনকে বারবার রণকৌশল বদলাতে হচ্ছিল। পুলিশের সাঁজোয়া যানগুলোও বারবার রকেট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল, যা পাকিস্তান পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছিল।

ফলাফল (Lyari Operation 2012)

২০১২ সালের সেই লিয়ারি অপারেশন শেষ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমের ওপর হামলা এবং সাধারণ মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতির ফলে সরকার ও রাজনৈতিক চাপে পুলিশকে শেষ পর্যন্ত তাদের ভারী সরঞ্জাম সরিয়ে পিছু হটতে হয়েছিল। এটি লিয়ারির গ্যাংস্টারদের জন্য এক সাময়িক বিজয় বলে মনে করা হলেও, করাচির সাধারণ মানুষের জন্য তা দীর্ঘমেয়াদী আতঙ্ক বয়ে এনেছিল।


এই ঘটনাটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং রাজনীতির সাথে অপরাধ জগতের যে গভীর যোগসূত্র, তাকে আরও একবার জনসমক্ষে উন্মোচিত করে দেয়। লিয়ারির সেই রক্তাক্ত স্মৃতি এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের চেষ্টা আজও করাচির ইতিহাসে এক কালো দাগ হিসেবে রয়ে গেছে।

আরও পড়ুন :

Women Empowerment in Bangladesh: ঘরের শ্রম থেকে বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব, বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত গড়ছে নারীসমাজ

Bengal liberty
Bengal liberty

Bengal Liberty is a platform dedicated to guerrilla, unfiltered, and independent journalism. Through YouTube, its official website, and various social media channels, Bengal Liberty seeks to present citizen journalism to the public with integrity and transparency. Editor: Bittu Roy Chowdhury