Bengal Liberty : মেলাবেন তিনি, মেলাবেন! যে তৃণমূল একদিন বাংলার রাজনীতি থেকে বামফ্রন্টকে কার্যত নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল, যে তৃণমূলের হাত ধরে একের পর এক বাম নেতার দলবদল বামেদের সংগঠনকে দুর্বল করেছে, আজ সেই তৃণমূলের সঙ্গেই কি সুর মেলাতে চাইছে সিপিএম? মার্কসবাদী আদর্শ, রাজনৈতিক নীতি আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াইয়ের কথা বলা বামেদের কাছে কি এখন শাসকবিরোধী ঐক্যই বড় হয়ে উঠছে? মহাসপ্তমীর সকালে যাদবপুরে তৃণমূলের কুণাল ঘোষকে বামেদের বুকস্টলে দেখা যেতেই এই প্রশ্নগুলো আরও জোরালো হয়েছে। শুধু যাওয়াই নয়, মার্কসবাদী সাহিত্যের বইও কিনেছেন কুণাল। আর তাঁর মন্তব্য, ‘কখনও কখনও রং আলাদা হলেও একই মঞ্চে থাকতে হয়।’ কিন্তু কেন? কিসের স্বার্থে? তাহলে কি রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে আদর্শের প্রশ্নেও আপস করতে প্রস্তুত দুই শিবির?
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারকে সরিয়ে বাংলার ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। পরিবর্তনের রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল বামেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্য ভেঙে দেওয়া। পরবর্তী বছরগুলিতে একাধিক বাম নেতা তৃণমূলে যোগ দেন। রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা সিপিএম নেতা আবদুর রেজ্জাক মোল্লা, যিনি ২০১৪ সালে তৃণমূলে যোগ দেন। একে একে শওকত মোল্লা, প্রতিকুর রহমান এভাবেই দলবদল করিয়ে সংগঠনগত দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক ময়দানে থেকে সিপিআইএমকে কার্যত মুছে ফেলেছে তৃণমূল, সেই তৃণমূলের নেতা কুণাল ঘোষ এখন একই মাঠে সহযোগী হিসেবে খেলতে চাইছে।
অন্যদিকে যে তৃণমূলের গায়ে চুরি, দুর্নীতির কালো দাগ এখনও উজ্জ্বল সেই তৃণমূলকে সিপিআইএম আর বিরোধী নয়, সমর্থক হিসেবে দেখছে। সেই দলের নেতার সঙ্গে একই পরিসরে দাঁড়ানো কি নিছক সৌজন্য, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত?
আরও খবর
প্রশ্ন আরও গভীর। যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যে দলের একাধিক নেতা-মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি তদন্ত করেছে, সেই দলের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়ানোর কথা বললে সিপিএমের আদর্শগত অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়? অভিযোগ আর প্রমাণিত অপরাধ এক নয়, কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক রাজনৈতিক লড়াইয়ের দাবি করা একটি দলের কাছে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া কি সম্ভব? মার্কসবাদী রাজনীতি কি শুধুই পুঁজিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতায় সীমাবদ্ধ, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধেও একই রকম আপসহীন থাকা তার দায়িত্ব?

বিশেষ করে সিপিএমের তরুণ প্রজন্মের নেতারা, যাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চে তৃণমূলের দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে সরব হন, তাঁরা কি এই অবস্থানের ব্যাখ্যা দেবেন? যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে বাম সমর্থকদের উপর অত্যাচার, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া এবং ক্ষমতায় থাকা কালীন বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার অভিযোগ উঠছে, সেই তৃণমূলের নেতার সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? প্রতিবাদের স্বার্থে সাময়িক ঐক্য আর রাজনৈতিক জোট, দুটো কি এক?
যাদবপুরে বামেদের বুকস্টল ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই কুণাল ঘোষের উপস্থিতি এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। বামেদের অভিযোগ, বিভিন্ন জায়গায় তাদের বুকস্টল করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। শনিবার রাতে যাদবপুরে বামেদের বুকস্টল ঘিরে বিজেপি সরকারের পদক্ষেপ এবং বুলডোজার পাঠানোর অভিযোগও তুলেছে বাম শিবির। এই পরিস্থিতিতে কুণালের উপস্থিতি এবং তাঁর ‘একই মঞ্চে থাকার’ মন্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক আলোচনার নতুন উপাদান।
তবে কুণাল নিজেও দাবি করেছেন, মার্কসবাদী সাহিত্যের প্রতি তাঁর আগ্রহ দীর্ঘদিনের। শুধু কি সাহিত্যের প্রতি টানের জন্যই যাওয়া? তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন থাকছেই।
তৃণমূলের সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার যুক্তি কী? রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচাতে গিয়ে আদর্শের সঙ্গে আপস করছে কি সিপিএম? নাকি নির্দিষ্ট ইস্যুতে বিরোধী ঐক্য গড়ার কৌশল হিসেবেই এই অবস্থান? উত্তর দিতে হবে বাম নেতৃত্বকেই। কারণ, রাজনীতিতে রং বদলানো সহজ, কিন্তু আদর্শের প্রশ্নে আপসের ব্যাখ্যা দেওয়ার দায়িত্ব দলের।


